অনুসরণীয় আদর্শ মুহাম্মদ (সা.)

প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০১৮

অনুসরণীয় আদর্শ মুহাম্মদ (সা.)

  মুফতী মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিল

মুহাম্মদ (সা.) নিজের জীবনে যে জীবনদর্শন, পরিধি ও সীমা নির্দিষ্ট করেছেন, তা মহান আলল্গাহতায়ালারই অনুমোদিত জীবন বিধান। নিজের শৈশব থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ৬৩ বছরের প্রত্যক্ষ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেকে আদর্শ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে রত রেখে নিজের জীবদ্দশাতেই একটি ধ্বংসস্তূপ থেকে, একটি পূতিগন্ধময় অন্ধকার আঁস্তাকুড় থেকে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও মানবিক মূল্যবোধকে তুলে এনে এক সুষম, অনুসরণযোগ্য, সার্বজনীন কল্যাণকর সভ্যতা গড়ে তুলেছিলেন- মানবাধিকার, মানুষের মর্যাদা ও আলল্গাহতায়ালার আনুগত্যই ছিল যার ভিত্তি।

এ প্রশ্নের জবাব খোদ কোরআনে খুব সুষ্ঠুভাবেই দেওয়া হয়েছে। 'আমি আমার রাসুলগণকে কেবল এ উদ্দেশ্যে পাঠিয়েছি এবং তাদের ওপর কিতাব ও মানদণ্ড নাজিল করেছি, যাতে মানবজাতি ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় (আল হাদিদ :২৫)।

কথাটা একেবারে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলে দেওয়া হয়েছে। ইসলামের দাওয়াতের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো মানবজীবনকে ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে গড়ে তোলা এবং সমাজ ব্যবস্থায় কার্যকরভাবে ভারসাম্য ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা করা। একই উদ্দেশ্যে লোহার অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করার ইঙ্গিত আয়াতের পরবর্তী অংশে রয়েছে। অর্থাৎ ইসলামী বিধিব্যবস্থার বাস্তবায়ন, সংরক্ষণ ও বিকাশ সাধনের জন্য সামরিক শক্তিও অনিবার্য। স্বয়ং মুহাম্মদ (সা.) নবী হিসেবে আবির্ভাবের উদ্দেশ্য আরও স্পষ্ট ভাষায় একাধিকবার বলা হয়েছে। যেমন-'তিনিই আলল্গাহ, যিনি স্বীয় রাসুলকে হেদায়েত ও সত্য দ্বীন সহকারে পাঠিয়েছেন, যাতে তিনি এই সত্য দ্বীনকে অন্য সব ধর্মমত ও জীবন ব্যবস্থার ওপর বিজয়ী করে দিতে পারেন। চাই তা মোশরেকদের কাছে যতই অপছন্দনীয় হোক না কেন' (আস সফ :৯)।

রাসুল (সা.) প্রাথমিক স্তরেই বনু হাশেম গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের একটি বৈঠক আহ্বান করেন নিজের দাওয়াত পেশ করার জন্য। সেখানে তিনি সংক্ষেপে বলেন, এই দাওয়াত দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ের কল্যাণ নিশ্চিত করবে। এর অনেক দিন পরে এক কুরাইশ প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনা করার সময় তিনি ওই বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে বলেন : 'আমি যে দাওয়াত পেশ করছি তা যদি তোমরা গ্রহণ করে নাও, তাহলে তাতে তোমাদের দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ের কল্যাণ নিহিত রয়েছে' (ইবনু হিশাম, ১/৩১৬)।

'দুনিয়ার কল্যাণ' এই সহজ-সরল শব্দ দুটিকে কোনো আংশিক কল্যাণের অর্থে গ্রহণ করা একেবারেই অযৌক্তিক। আংশিক কল্যাণ তো প্রত্যেক দাওয়াতেই থাকে। প্রত্যেকটি খারাপ ব্যবস্থায়ও কিছু না কিছু ভালো জিনিস থাকে। আসলে দুনিয়ার কল্যাণের অর্থ হলো দুনিয়ার জীবনটা সর্বাঙ্গীণ সুন্দর হওয়া। সমাজ ব্যবস্থাটা নিস্কলুষ ও নিখুঁত হওয়া। ন্যায়বিচারের স্থায়ী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং পবিত্র ও নির্মল জীবনের অধিকারী হওয়া।

কুরাইশদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যাওয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে আরও একবার রাসুলের (সা.) সঙ্গে তাদের আলাপ-আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এবারও তিনি বলেন :'একটিমাত্র কথা যদি তোমরা আমাকে দাও, তবে তা দ্বারা তোমরা সমগ্র আরব জাতির ওপর আধিপত্য লাভ করবে এবং যত অনারব জাতি পৃথিবীতে আছে, তারা সব তোমাদের বশ্যতা স্বীকার করবে' (ইবনু হিশাম, ১/৩১৬)।

রাসুলের (সা.) নেতৃত্বে আন্দোলন চলাকালে আরব ও অনারবদের ওপর কর্তৃত্ব লাভের বিষয়টি এত খ্যাতি লাভ করে যে, ওটা যেন ইসলামী আন্দোলনের স্লোগানে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। শিশুরা পর্যন্ত ওটা বলাবলি করত। বিরোধীরা এটাকে একটা উপহাসের ব্যাপার হিসেবে গ্রহণ করেছিল। দাস ও দরিদ্র শ্রেণির যেসব যুবক ইসলাম গ্রহণ করত এবং কুরাইশদের অত্যাচার-নির্যাতনে পিষ্ট হতো, তাদের দেখলেই কুরাইশরা তাদের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে বলত :'এই হুজুরদের কথা কী আর বলব, এরা নাকি আরব-আজমের শাসক হবেন!'

একবার যখন মুসলমানরা প্রচণ্ড সহিংসতা ও নির্যাতনের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছিল, তখন রাসুলের (সা.) সঙ্গীরা তার কাছে তাদের দুঃখের কাহিনী বর্ণনা করলেন এবং ওই অবস্থা থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য দোয়া চাইলেন। রাসুল (সা.) প্রথমে তাদের বোঝালেন, আলল্গাহর দ্বীনকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামে পদে পদে কঠিন বাধার সম্মুখীন হতে হয়। অতীতে যারা এ দায়িত্ব পালন করেছে, তাদের অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করতে হয়েছে। অতঃপর পূর্ণ নিশ্চয়তার সঙ্গে তাদের সুসংবাদ শোনালেন, 'আলল্গাহর কসম, এ কাজে আলল্গাহ একদিন অবশ্যই চূড়ান্ত সাফল্য দান করবেন।' অতঃপর এই সাফল্যের বর্ণনা দিয়ে বলেন :'এক ব্যক্তি সম্পূর্ণ একাকী সানা থেকে হাযরামাউত পর্যন্ত সফর করবে অথচ আলল্গাহ ছাড়া আর কারও ভয়ে সে ভীত থাকবে না' (ইবনু হিশাম, ১/৩১৪)।

একবার রাসুল (সা.) বলেছিলেন, এমন একটা যুগ প্রায় আসন্ন, যখন লোকেরা নিরাপত্তা রক্ষী ছাড়াই মক্কায় যাতায়াত করবে (সীরাতুন্নবী, ২/৩)। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে যেরূপ পরিস্কার ও উজ্জ্বল ধারণা এখানে ব্যক্ত করা হয়েছে, তা সত্যিই অতুলনীয়।

চাচা আবু তালেবের ওপর রাসুলের (সা.) সাফল্য ও সমর্থন পরিত্যাগ করার জন্য যখন চাপ সৃষ্টি করা হলো, তখন তিনি রাসুলকে (সা.) বললেন, আমার জন্য সমস্যার সৃষ্টি করো না। এই সময়ে রাসুল (সা.) যে জবাব দেন, তা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। তিনি বলেছিলেন, 'ওরা যদি আমার ডান হাতে সূর্য আর বাম হাতে চাঁদ এনে দেয়, তবুও আমি আমার এ লক্ষ্য পরিত্যাগ করব না।' তার জবাবের শেষ কথাটা ছিল এই- 'হয় আলল্গাহ আমার এই লক্ষ্যকে বিজয়ী করবেন, নচেৎ এ কাজ করতে করতেই আমি মৃত্যুবরণ করব' (ইবনু হিশাম, ১/২৭৮)।

মানবতার মুক্তিদূত নবীর (সা.) জীবনে এই অর্জন, এই স্পষ্ট সর্বজনগ্রাহ্য কল্যাণকর জীবন বিধান বিশ্বের অনেক গবেষক, সাহিত্যিক, দার্শনিক ও বিজ্ঞ ব্যক্তিদের দ্বারা শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি পেয়েছে। মাইকেল হার্ট 'দ্য হানড্রেড' গ্রন্থে একশ' ব্যক্তির শ্রেষ্ঠত্বের ক্রমবিন্যাস করেছেন। তালিকার প্রথমেই (১ নম্বরে) মুহাম্মদকে (সা.) নির্দি্বধায় দাঁড় করিয়ে তিনি লিখেছেন : মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন সমাজ সংস্কার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ।

প্রভাষক (আরবি বিভাগ), চাটখিল কামিল (এমএ) মাদ্রাসা, চাটখিল, নোয়াখালী
ibrahim010187@gmail.com


মন্তব্য যোগ করুণ