জনশুমারির প্রস্তাবিত ব্যয় নিয়ে আপত্তি

   মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন

দেশের প্রকৃত জনসংখ্যা কত, তা জানতে ১০ বছর পরপর আদমশুমারি বা জনশুমারি করা হয়। ২০১১ সালের পর বাংলাদেশের ২০২১ সালে জনশুমারি ও গৃহগণনা হবে। লোকগণনা কার্যক্রম পরিচালনা করতে এরই মধ্যে প্রকল্প নিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। ২০১১ সালের শুমারিতে ২৩৭ কোটি টাকা ব্যয় হলেও এবারের শুমারি প্রকল্পে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করেছে বিবিএস। গতবারের চেয়ে এই ব্যয় প্রস্তাব প্রায় ১৫ গুণ বেশি।

বিশাল এই ব্যয় প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। কমিশন বলছে, আগের শুমারি থেকে প্রস্তাবিত জনশুমারির ব্যয় অনেক গুণ বেড়ে যাচ্ছে। তাই এর যৌক্তিক কারণ ও প্রকৃত প্রয়োজন পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কোনো অবস্থাতেই অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় ধরা যাবে না।

প্রকল্প প্রস্তাব নিয়ে এরই মধ্যে দুটি প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত প্রথম পিইসি সভায় প্রকল্পটির ব্যয় পর্যালোচনায় যুক্তিযুক্তকরণ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির পর্যালোচনার পর দ্বিতীয় পিইসি সভা সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়। ব্যয় যৌক্তিকীকরণ কমিটির পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অনেক অংশে দ্বিগুণের বেশিও ব্যয় ধরা হয়েছে। পরে কমিশনের আপত্তির মুখে কিছু ক্ষেত্রে ব্যয় কমানোর বিষয়ে একমত হন বিবিএসের কর্মকর্তারা। যাচাই-বাছাইয়ের কাজ এখনও চলছে। ফলে সম্ভাব্য ব্যয় আরও কমবে বলে জানান পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা।

জনশুমারি প্রকল্পের পরিচালক জাহিদুল হক সরদার সমকালকে বলেন, ১০ বছর পর জনশুমারি হচ্ছে। এ সময়ের মধ্যে ব্যয় বৃদ্ধি স্বাভাবিক। এ ছাড়া এবারের শুমারিতে সুপারভাইজার ও গণনাকারীর সংখ্যা বেড়েছে, যা ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তবে প্রকল্প প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করছে পরিকল্পনা কমিশন। ফলে প্রস্তাবিত ব্যয় আরও কমবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্য আবুল কালাম আজাদ সমকালকে বলেন, প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী বিভিন্ন খাতে এবার ব্যয় বেড়েছে। ভাতা ও সম্মানী বেড়েছে। গণনাকারীদের মোটরসাইক এবং উপজেলা পর্যায়ে গাড়ি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া এবারের শুমারিতে স্যাটেলাইটের সহায়তায় দেশের প্রতিটি খানার ছবি তোলা হবে। এ কারণে এত বেশি ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এত ব্যয় থাকবে না। কারণ, পরিকল্পনা কমিশন অনেক লম্বা সময় নিয়ে ব্যয় পর্যালোচনা করছে। অপ্রয়োজনীয় বা অযৌক্তিক ব্যয় বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান আছে।

২০২১ সালের আদমশুমারিতে ই-মেইল, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, টেলিফোন এবং পিক অ্যান্ড ড্রপ পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করা হবে। অভিজ্ঞতা অর্জনে বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য সাত কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণের এ ব্যয়ের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। টেলিফোন, ফ্যাক্স ও ইন্টারনেট খাতে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ১৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এ বিষয়ে আপত্তি জানালে পিইসি সভায় বিবিএসের প্রতিনিধি এক কোটি টাকা ব্যয় কমানোর প্রস্তাব দেন।

বিজ্ঞাপন খাতে ৭৩ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত কমিশনের আপত্তির কারণে ব্যয় ৪০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনার পুনঃপ্রস্তাব করেছে বিবিএস। দেশের অভ্যন্তরে ভ্রমণ খরচের জন্য ৪২ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হলেও সভায় তা ২০ কোটি টাকা করা হয়।

ম্যাপিং খাতে ৫৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ প্রস্তাবের বিষয়ে বিবিএস জানায়, স্যাটেলাইট ছবি কেনায় ৪০ কোটি টাকা, প্রক্রিয়াকরণে আট কোটি এবং ম্যাপ কাজে পাঁচ কোটি টাকা বরাদ্দ বিভাজন করা হয়েছে। পিইসি সভায় এ খাতে ব্যয় যৌক্তিকভাবে কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ বিষয়ে ব্যয় যুক্তিযুক্তকরণ কমিটির পর্যালোচনার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান।

প্রকল্প প্রস্তাবে গণনাকাজে ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ১৪১ কোটি টাকা। এ খাতে ২০১১ সালের শুমারিতে অনেক কম টাকা ব্যয় হয়েছে। প্রকল্প প্রস্তাবে আগের শুমারির তুলনামূলক চিত্র উপস্থাপন করতে বলেছে কমিশন। প্রকল্পে ব্যবহূত গাড়ি, তেল, লুব্রিকেন্ট এবং গ্যাস-জ্বালানি খাত, আপ্যায়ন খাত, গাড়ি কেনাসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় যৌক্তিকীকরণ করা হবে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা।


মন্তব্য