খেলাপি ঋণের অর্ধেকই পাঁচ ব্যাংকে

   ওবায়দুল্লাহ রনি

খেলাপি ঋণ কমানোর তোড়জোড়ের মধ্যে এর পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। গত ডিসেম্বরের তুলনায় মার্চে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা বেড়ে এক লাখ ১০ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা হয়েছে। বিপুল পরিমাণের এ খেলাপি ঋণের অর্ধেকই রয়েছে পাঁচ ব্যাংকে। আর দশ ব্যাংকে রয়েছে ৬৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এ সময়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের খেলাপি ঋণ বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। এ ছাড়া জনতা, ন্যাশনাল ও আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংকে বেড়েছে ব্যাপক হারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মার্চ-ভিত্তিক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

খেলাপি ঋণ এক টাকাও বাড়বে না- অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের ঘোষণা সত্ত্বেও গত মার্চ প্রান্তিক শেষে রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে। বেশি বেড়েছে এমন সাতটি ব্যাংককে নিয়ে মঙ্গলবার জরুরি বৈঠক করে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৈঠকে রাষ্ট্রীয় মালিকানার সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী এবং বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ও আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংককে ডাকা হয়। বৈঠক থেকে এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমাতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণ এবং কমানোর উপায় বের করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি আন্তঃবিভাগীয় কমিটি গঠন করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধিতে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পড়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ তিন হাজার ৩১৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৬ হাজার ৯১৬ কোটি টাকা হয়েছে। মোট ঋণে খেলাপি ঋণের অংশ ৪ দশমিক ৩০ শতাংশ থেকে উঠেছে ৮ দশমিক ৮৩ শতাংশে। তিন মাসে বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। এতে করে খেলাপি ঋণের দিক দিয়ে চতুর্থ অবস্থানে উঠে এসেছে ইসলামী ব্যাংকের নাম। আগে খেলাপি ঋণ বেশি থাকা পাঁচ ব্যাংকের তালিকার সব ক'টি ছিল রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যাংক।

মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ সবচেয়ে বেশি রয়েছে রাষ্ট্রীয় মালিকানার জনতা ব্যাংকে। ক্রিসেন্ট ও অ্যাননটেক্স গ্রুপসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় আলোচিত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ঠেকেছে ২১ হাজার ৪১১ কোটি টাকায়। ব্যাংকটির মোট ঋণের যা ৪৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ। তিন মাস আগে খেলাপি ঋণ ছিল ১৭ হাজার ২২৫ কোটি টাকা। আর এক বছর আগে ছিল ৮ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১২ হাজার ৬১ কোটি টাকা থেকে সামান্য বেড়ে ১২ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা হয়েছে। ঋণের নামে অর্থ লুট করায় আরেক আলোচিত বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৮ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৮ হাজার ৮০৪ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের দিক দিয়ে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক। গত ডিসেম্বরে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ৫ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে মার্চে ৬ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা হয়েছে।

রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ চার হাজার ৪৩০ কোটি টাকা থেকে কমে হয়েছে চার হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণ ব্যাপক বৃদ্ধির তালিকায় রয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক। গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির মাত্র ২ হাজার ২১০ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি ছিল। মার্চ শেষে তা বেড়ে তিন হাজার ৭৪৭ কোটি টাকা হয়েছে। কৃষি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আগের মতোই তিন হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা রয়েছে। ঋণ কেলেঙ্কারির কারণে চাপে থাকা ফারমার্স থেকে রূপান্তরিত পদ্মা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ তিন হাজার ১৮৪ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে তিন হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণ বিবেচনায় ১০ নম্বরে রয়েছে ইউসিবিএল। মার্চ শেষে ব্যাংকটির ২ হাজার ২৭ কোটি টাকার ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। গত ডিসেম্বরে ছিল এক হাজার ৯০৫ কোটি টাকা। শীর্ষ ১০ ব্যাংকের তালিকায় না থাকলেও খারাপ অবস্থায় পড়েছে আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ এক হাজার ২৬৯ কোটি টাকা থেকে বেড়ে মার্চে এক হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা হয়েছে।

ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, ব্যাপক অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতাসহ নানা কারণে ধারাবাহিকভাবে খেলাপি ঋণ বাড়ছে বলে মনে করেন বিশিষ্টজনরা। এর আগে বিশেষ সুবিধায় ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন করা হলেও সেসব ঋণের বেশিরভাগই আবার খেলাপি হয়ে পড়েছে। এরকম পরিস্থিতিতেও ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে নানা সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।


মন্তব্য