অস্ট্রেলিয়াকে উড়িয়ে ফাইনালে ইংল্যান্ড

অস্ট্রেলিয়ার ম্যাক্সওয়েলকে প্যাভিলিয়নে পাঠিয়ে অধিনায়ক মরগান ও স্টোকসের সঙ্গে উদযাপনে আর্চার -এএফপি

  সঞ্জয় সাহা পিয়াল বার্মিংহাম থেকে

স্মার্টফোন আর আইপ্যাডে জীবন সমর্পণের পরও ভূতপ্রেত বিশ্বাস করে ব্রিটিশরা! সংস্কারের সঙ্গে কুসংস্কারটাও মেনে চলে তারা। হয়তো সে কারণেই এবারের বিশ্বকাপ জার্সিটাও বানিয়েছিল তারা সেই বিরানব্বই বিশ্বকাপের আদলে- আকাশির ওপর গাঢ় নীলের স্ট্রাইপ। সেবারই শেষবারের মতো বিশ্বমঞ্চের ফাইনাল খেলেছিল ইংলিশরা। সেই একই জার্সি গায়ে জড়িয়ে সাতাশ বছর পর ফের বিশ্বকাপের ফাইনালে ব্রিটিশ সিংহরা এবং চল্লিশ বছর পর সেই লর্ডসের বারান্দায় ফের বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার সুযোগ। ইতিহাস আর ঐতিহ্যকে এমনিতেই যত্নভরে লালন করে ইংরেজরা, সেখানে গতকাল এজবাস্টনে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াকে ৮ উইকেটে হারিয়ে শুধু স্মৃতির পুরনো বারান্দাতেই নয়, ক্রিকেট বিশ্বকে নতুন একটি বার্তাও দিলেন ইয়ন মরগানরা। ১৪ জুলাই, লর্ডসের বারান্দায় হয় স্বাগতিক ইংল্যান্ড, না হয় নিউজিল্যান্ড- নতুন কোনো চ্যাম্পিয়নকেই বরণ করে নিতে হবে।

১৯৭৯, ১৯৮৭, ১৯৯২-এর পর ২০১৯। চার-চারবার, বিশ্বমঞ্চের ফাইনালে খেলার গৌরব এখন ইংলিশদের। আগের তিনবারই ফাইনালে শূন্য হাতে থাকতে হয়েছে যাদের, এবার কি পারবে তারা শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরতে? কুসংস্কারে বিশ্বাস রাখলে বলতে হয়, গত দু'বার কিন্তু স্বাগতিকরাই চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, তাহলে এবার ইংল্যান্ড কেন নয়? জয়ের জন্য প্রচণ্ড একটা তাড়না আছে এই দলটির, ক্ষিপ্রতা আছে বোলিংয়ের, ব্যাটিংয়েও রয়েছে আত্মবিশ্বাসে চওড়া উইলোগুলো। ভেতরে ভেতরে ইংল্যান্ড যে এতটা গোছানো ছিল, তা যেন কাল মাঠে নামার আগে টেরই পায়নি অসিরা।

চোয়াল থেকে মাথাজুড়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা অ্যালেক্স ক্যারির, আর্চারের একের পর এক বাউন্সারে ঘায়েল অসি ব্যাটসম্যানরা, ক্রিস ওকসের গতির কাছে আত্মসমর্পণ ওয়ার্নার আর হ্যান্ডসকম্বের, ১৪ রানে ৩ উইকেট নেই অস্ট্রেলিয়ার- মাঠে না থাকলেও এই দৃশ্য নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও বসে দেখছেন গ্লেন ম্যাকগ্রা। ইংলিশ পেসারদের আগুনে পোড়া অস্ট্রেলিয়ার এই গ্রিলড টপঅর্ডার দেখে তিনি কী ভাবছেন? রাগে নিশ্চয়ই টুইটারে দু'কথা লিখেছেন! টুইটারে ঢুঁ মেরে অবশ্য ম্যাকগ্রাকে নিশ্চুপই পাওয়া গেল। হয়তো হতাশ তিনি, একসময় যে অস্ত্র দিয়ে অসিরা ক্রমাগত ইংলিশদের ঘায়েল করত, এখন সেই 'পেস গান' অস্ত্র ইংলিশদের হাতে; যা দিয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়াকে মাত্র ২২৩ রানে অলআউট করে দিয়েছে ইংল্যান্ড। ম্যাচের আগের দিন ইংলিশ অধিনায়ক ঘোষণা দিয়েই বলেছিলেন, তারা চারশ' রান তাড়া করতেও প্রস্তুত, সেই তাদের সামনে মামুলি এই ২২৩! জেসন রয় আর জনি বেয়ারস্টো- দুই ওপেনারের উইকেট দিয়েই ওই রান তাড়া করে নেয় ইংলিশরা। তাও আবার ৮৫ রানে থাকা জেসন রয়ের আউট রিভিউ হাতে না থাকার কারণে জলাঞ্জলি দিতে হয়। বেয়ারস্টো ৩৪ রানের এলবিডব্লিউটাই ছিল শুধু অসি বোলারদের কৃতিত্বে। বাকি দুই ব্যাটসম্যান জো রুট ৪৯ আর মরগান ৪৫ রানে অপরাজিত থেকে ১০৭ বল হাতে রেখেই বার্মিংহাম থেকে লন্ডনের পথে পা বাড়ান। নির্ভার এই ব্যাটিংয়ের পেছনে অবশ্য ছিল ক্ষুরধার ইংলিশ বোলিং। আর্চার, ওকস আর উডস পেসারত্রয়ীর সঙ্গে আদিল রশিদের গুগলি- বিশ্বকাপেও রীতিমতো অ্যাশেজের উত্তাপই ফিরিয়ে এনেছে ইংল্যান্ড। স্টিভেন স্মিথ একার চেষ্টায় কিছু করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ৮৫ রানের মাথায় আউট হতে হয় তাকে।

এদিন এজবাস্টনে শুরু থেকেই কলার উঁচিয়ে দাপটের সঙ্গে খেলেছে ইংল্যান্ড। অথচ প্রথম পর্বে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হারার পর কেভিন পিটারসেনের মতো সাবেকদের মুখ থেকে 'ইংল্যান্ড ভীতু ভীতু খেলেছে' অপবাদ শুনতে হয়েছে। গতকাল যেন ছিল সেই অপবাদ মিথ্যা প্রমাণের দিন। জোফরা আর্চারের প্রথম বলেই অসি অধিনায়ক অ্যারন ফিঞ্চ এলবিডব্লিউ, রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি। এজবাস্টনে নতুন পিচে শুরুর দিকে কিছুটা সুইং পাচ্ছিলেন ইংলিশ পেসাররা, যে কারণে স্লিপ নিয়েই ওয়ার্নারকে বোলিং শুরু করেন ক্রিস ওকস। হাতে হাতে ফল, অফস্টাম্পের বাইরে লাফিয়ে ওঠা বলটা ওয়ার্নার বেয়ারস্টোর হাতে তুলে দেন। বিশ্বকাপের তিন সেঞ্চুরিয়ান এদিন ৯ রানে আউট। কিছুক্ষণ বাদে সেই ওকসের বলেই বোল্ড হ্যান্ডসকম্ব। ব্যাপারগুলো এত দ্রুত ঘটে যায় যে, মাঠে আসা ইংলিশ কট্টর সমর্থকগোষ্ঠী 'বার্মি আর্মি'র দল হাতে হার্ড ড্রিঙ্কস নেওয়ার আগেই অস্ট্রেলিয়ার তিন উইকেট হাওয়া। বল হাতে তখন যেন গোলা-কামান দাগাচ্ছেন আর্চার। বাইশ বছরের এই পেসার একসময় ক্যারিবীয় অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে খেলেছেন, এখন তিনিই কি-না ইংলিশদের সব।

ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৫০ আর সর্বনিম্ন ১৩০ কিলোমিটার গতিতে বোলিং করে যান তিনি! তার কিছু বল কিপিং গ্লাভসেও আটকানো কষ্ট হচ্ছিল তখন। তার তেমনই এক বাউন্সারে ইনিংসের অষ্টম ওভারের শেষ বলে হেলমেটের নিচের অংশটি ভেঙে চোয়ালে আঘাত করে অসি ব্যাটসম্যান অ্যালেক্স ক্যারির। মাথা ঘুরিয়ে নেওয়ার সময় পাননি তিনি। হেলমেটটি খুলে স্টাম্পের ওপর পড়তে যাওয়ার মুখে ওই অবস্থায় সেটা হাত দিয়ে লুফে নেন ক্যারি। তার চোয়ালে রক্ত দেখে ইংলিশ ফিল্ডাররা এগিয়ে এলেও বুনো বার্মি আর্মির দল গান বেঁধে ফেলে...। চোয়ালে ব্যান্ডেজ বেঁধেই এরপর স্মিথের সঙ্গে ১০৩ রানের জুটি গড়েন ক্যারি। ইনিংসের ২৮তম ওভারটি পর্যন্ত মনেই হচ্ছিল না, সকালের প্রথম কুড়ি মিনিট কী বীভৎস গেছে অসিদের। স্মিথের অভিজ্ঞ হাতের সিঙ্গেলস আর ডাবলসের সঙ্গে ক্যারির কিছু চোখধাঁধানো বাউন্ডারি। একসময় যখন মনে হচ্ছিল, শুরুর ধাক্কা সামলে নিয়েছে অসিরা, তখন ইংলিশ অধিনায়ক ইয়ন মরগান তার থলে থেকে লেগস্পিন অস্ত্রটি বের করে আনেন। আদিল রশিদকে দিয়েই এরপর অস্ট্রেলিয়া ব্যাটিং লাইনআপের মাঝের অংশটা ভেঙে ফেলেন। লেগ স্টাম্পের ওপর পর বল ফ্লিক করতে গিয়ে ডিপ মিড উইকেটে ক্যাচ দিয়ে বসেন। শেষ হয় তার ৯৪ মিনিট ধরে চালানো ৪৬ রানের সংগ্রামী ইনিংসটি। ওই ওভারেই আদিল রশিদের গুগলিতে শূন্য রানে এলবিডব্লিউ হয়ে যান স্টয়নিস।

অসিদের ভরসা হয়ে তখনও ক্রিজে থিতু হয়ে ছিলেন স্মিথ; ম্যাক্সওয়েলকে সঙ্গে নিয়ে ৩৯ রানের একটা জুটিও হয়েছিল। কিন্তু ফের সেই আর্চার, ইংলিশদের ক্যারিবীয় স্পিডগান। দ্বিতীয় স্পেলে তাকে ফিরিয়ে আনতেই ম্যাক্সওয়েল নেই। এবারে গতি নয়, কিছুটা স্লোয়ারে বোকা বানিয়েছিলেন আর্চার ২২ রানে থাকা ম্যাক্সওয়েলকে। এভাবে ৪৫তম ওভারে এসে স্মিথ দলকে ২০০ পার করিয়েছিলেন। হাতে তখনও তিনটি উইকেট ছিল। হয়তো স্মিথ শেষ পর্যন্ত টিকে গেলে স্কোরটাও বড় হতে পারত, তার নিজেরও এই বিশ্বকাপে প্রথম সেঞ্চুরি হতে পারত। কিন্তু এদিন এজবাস্টনের সব কিছুই যেন ইংলিশদের জন্যই সাজানো ছিল। তাই স্মিথকে ৮৫ রানের মাথায় রানআউট হতে হয় এবং অস্ট্রেলিয়াকেও ৪৯ ওভারের মধ্যেই অলআউট হতে হয়! ড্রেসিংরুমের বারান্দায় বসে নখ কাটতে থাকা অসিদের ব্যাটিং কোচ রিকি পন্টিংকে তখন সত্যিই খুব করুণ দেখাচ্ছিল! তিন-তিনবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য তিনি, সেই তাকেই কি-না চোখের সামনে অস্ট্রেলিয়ার এই হতশ্রী দেখতে হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার সাম্রাজ্য পতনটা তার চোখের সামনেই দেখতে হলো। দেখতে হলো ক্রিকেট বিশ্বের এক নতুন শক্তির উত্থান।।


মন্তব্য