সংসদে প্রধানমন্ত্রী

জনগণের কথা ভেবেই গ্যাসের দাম কম বাড়ানো হয়েছে

প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০১৯

জনগণের কথা ভেবেই গ্যাসের দাম কম বাড়ানো হয়েছে

বৃহস্পতিবার সংসদে সমাপনী বক্তৃতা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা - পিআইডি

   সমকাল প্রতিবেদক

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ করতে না পারলে উৎপাদন বন্ধ হবে, রফতানি কমে যাবে, দেশে হাহাকার সৃষ্টি হবে। যারা এ নিয়ে আন্দোলন বা সমালোচনা করেন তারা কি এমন পরিস্থিতি চান? তিনি বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের পুরো খরচই নেওয়া উচিত। কিন্তু সরকার তা নিচ্ছে না। জনগণের স্বার্থে গ্যাস ও বিদ্যুতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এলএনজি আমদানি খুব ব্যয়সাপেক্ষ। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) মূল্যায়ন করে দেখেছে বর্ধিত ব্যয় নির্বাহের জন্য অন্তত ৭৫ শতাংশ দাম বৃদ্ধি করা প্রয়োজন ছিল। সেখানে আমরা কতটুকু দাম বৃদ্ধি করেছি? গ্রাহকদের আর্থিক চাপের বিষয় বিবেচনা করে কমিশন মাত্র ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ দাম বৃদ্ধি করেছে। তবে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প গ্রাহকদের জন্য দাম বৃদ্ধি করা হয়নি।

গতকাল বৃহস্পতিবার একাদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর সমাপনী ভাষণের পর রাষ্ট্রপতির আদেশ পাঠ করে সংসদ অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন স্পিকার।

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা এলএনজি আমদানি করছি গ্যাসের চাহিদা মেটানোর জন্য। দেশে শিল্পায়ন হচ্ছে, শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে গ্যাসের চাহিদাও বাড়ছে। সেই পরিমাণ গ্যাস আমাদের দেশে নেই। আমরা গ্যাসের কূপ খনন করছি। গ্যাসের জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে, যেটুকু পাওয়া যাচ্ছে উত্তোলন করা হচ্ছে।

সংসদ নেতা বলেন, আমরা বিশাল সমুদ্রসীমা অর্জন করেছি। সেখানেও গ্যাস উত্তোলনের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছি। গ্যাসের দাম নিয়ে কথা আসছে যে, দাম না বাড়ালেও চলত। কিন্তু দাম বাড়ানোর প্রয়োজনটা কেন ছিল? গ্যাসের বর্ধিত ব্যয় নির্বাহের জন্য পেট্রোবাংলা ও বিভিন্ন কোম্পানি গ্যাসের দাম ১০২ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছিল।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণপরিবহনের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সিএনজি খাতে শুধু প্রতি ঘনমিটারে ৩ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকদের অভিযোগের ভিত্তিতে এখন থেকে মিনিমাম চার্জ প্রত্যাহার করা হয়েছে। সব শিল্প গ্রাহককে ইবিসি মিটার দেওয়া হবে। যাতে গ্যাস কে কত ব্যবহার করে সেটা যেন নির্দিষ্ট থাকে। যাতে বিল পরিশোধ সহজ হয়। গ্রাহকদের আর্থিক চাপ যেন বেশি না পড়ে, সেজন্য গ্যাসে প্রতি বছর সাত হাজার ৯৯০ কোটি টাকা আর্থিক সহায়তা কিংবা ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে।

শেখ হাসিনা বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল থেকে ২ হাজার ৪২০ কোটি টাকা দেওয়া হবে। তিনি বলেন, আমরা যদি সব খরচ ধরি তাতে এলএনজি আমদানির খরচ পড়ে সম্পূরক শুল্ক্কসহ প্রতি ঘনমিটার ৬১ দশমিক ১২ টাকা। আমরা নিচ্ছি মাত্র ৯ দশমিক ৮০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি ঘনমিটারে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে ৫১ দশমিক ৩২ টাকা। আর সম্পূরক শুল্ক্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের কারণে সরকারের ৯ হাজার ২০০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় বন্ধ হয়ে গেছে। এটি বন্ধ না হলে দেশের আরও উন্নতি করতে পারতাম।

২০০০ ও ২০০১ সালে গ্যাস বিক্রির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিল ক্লিনটন বাংলাদেশে এসে ভারতের কাছে গ্যাস বিক্রির জন্য চাপ দেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারও খালেদা জিয়া ও আমার সঙ্গে দেখা করে একই চাপ দেন। আমি তাদের স্পষ্ট করে জানাই, আগে আমাদের কত গ্যাস রয়েছে, দেশের চাহিদা মিটিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ৫০ বছরের গ্যাস রিজার্ভ রেখে যদি উদ্বৃত্ত থাকে তবেই আমি গ্যাস বিক্রি করতে রাজি।

তিনি বলেন, খালেদা জিয়া গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দিয়ে ক্ষমতায় আসেন। নির্বাচনে আমরা বেশি ভোট পেলেও ক্ষমতায় যেতে পারিনি। কারণ, আমি রাজনীতি করি দেশ ও দেশের মানুষের জন্য। দেশের সম্পদ বিক্রি করে ক্ষমতায় যেতে হবে সেই রাজনীতি আমি করি না। তিনি বলেন, জ্বালানি ছাড়া দেশের উন্নয়ন হয় না।

ভারতের চেয়ে বাংলাদেশে গ্যাসের মূল্য বেশি এমন অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে দু'দেশের তুলনামূলক মূল্যের চিত্র সংসদে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, ভারতসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের তুলনায় বাংলাদেশে গ্যাসের দাম কম। বাংলাদেশে গৃহস্থালি খাতে যেখানে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ১২ টাকা ৬০ পয়সা, সেখানে ভারতের দাম ৩০ থেকে ৩৭ রুপি। শিল্পে বাংলাদেশে ১০ টাকা ৭০ পয়সা, ভারতে ৪০ থেকে ৪২ রুপি, সিএনজি খাতে বাংলাদেশে ৪৩ টাকা, ভারতে ৪৪ থেকে ৫৩ রুপি এবং বাণিজ্যিক খাতে বাংলাদেশে ২৩ টাকা, সেখানে ভারতে ৫৮ থেকে ৬৫ রুপি। তাহলে ভারত থেকে আমাদের দেশে গ্যাসের দাম বেশি হলো কীভাবে?

শেখ হাসিনা বলেন, দেশ ও মানুষের জন্যই তার রাজনীতি। কারও কাছে মুচলেকা দিয়ে ক্ষমতার রাজনীতি করেন না তিনি। দেশের সম্পদ বিক্রি করে ক্ষমতায় আসতে হবে সেই রাজনীতিও করেন না। তার জীবনের প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে দেশের উন্নতি ও মানুষের কল্যাণ। দেশের মানুষকে সুন্দর জীবন দেওয়ার লক্ষ্যেই কাজ করছেন তিনি।

সম্প্রতি সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধি ও শিশুদের ওপর পাশবিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে আবারও কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রয়োজনে বিদ্যমান আইনকে আরও কঠোর করা হবে। জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর কেউ সাহস না পায়। এ ব্যাপারে গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করে তিনি বলেন, ধর্ষকদের চেহারা যেন বারবার দেখানো ও প্রকাশ করা হয়। যাতে এই জঘন্য অপরাধীরা লজ্জা পায়। পুরুষ সমাজকেও ধর্ষকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সংসদ নেতা বলেন, নারীরা কেন একা প্রতিবাদ করবে? এ বিষয়ে পুরুষদেরও সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে গত এক দশকে বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসোপানে যাত্রা শুরু করেছে। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, দেশকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাব। দেশের যে অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে, তা আরও এগিয়ে নিয়ে যাব। দেশকে আরও সমৃদ্ধিশালী করব। ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী, ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী আমরা পালন করব ভিক্ষুকমুক্ত, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসেবে। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে উন্নত সমৃদ্ধিশালী দেশ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় আসে, তখনই দেশের উন্নয়ন হয়। সারা বিশ্বেই এখন বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল। দেশকে আরও উন্নত করতে হলে দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। এবারের বাজেটে আমরা প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ২ ভাগে উন্নীত করতে পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। কারণ, আমরা দেশকে উন্নয়নের পথে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।

সংসদ নেতা বলেন, শুধু বাংলাদেশে নয়, আন্তর্জাতিক বিশ্বেও আজ প্রমাণিত বাংলাদেশ দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা এখন বিশাল বাজেট নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করছি। বাজেটে বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ মাত্র শূন্য দশমিক ৮ ভাগ। আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি মানুষের কল্যাণের জন্য। ভিক্ষা চেয়ে নয়, দেশের নিজস্ব সম্পদ দিয়ে আমরা এগিয়ে যাব। কারণ আমাদের দেশের সম্পদ জনগণ আর দেশের মাটি হচ্ছে উর্বর। আমরা যে দেশের উন্নতি করতে পারি তা আজ প্রমাণিত। আগামী এক বছরে দেশের মাথাপিছু আয় দুই হাজার ডলারে উন্নীত করতে পারব বলে আমরা আশাবাদী।

দেশের উন্নয়ন ও সফলতার বিবরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, মূল্যস্ম্ফীতি আমরা ৪ দশমিক ৯ ভাগে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছি। সবার জন্য খাদ্য নিরাপত্তা আমরা নিশ্চিত করেছি, দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। দেশের মানুষের পুষ্টিও নিশ্চিত করেছি বলেই পুরুষের গড় আয়ু ৭২ দশমিক ৮ ভাগ এবং নারীর ৭৩ বছরে উন্নীত হয়েছে। খাদ্যে ভেজালের কথা বলা হয়, অথচ মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে। রফতানি আয় অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

তিনি বলেন, আমাদের সরকার প্রতিটি গ্রামকে শহরে পরিণত করতে চায়। আকাশ, রেল, নৌপথ, সড়কপথ- সবক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে তা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। গত ১০ বছরে আমরা ১০ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দিয়েছি। নার্সদের শিক্ষার মানও বৃদ্ধি করেছি।

সাম্প্রতিক সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়া প্রসঙ্গে সংসদ নেতা বলেন, ডেঙ্গু রোগটা বেড়ে গেছে। সমস্যা হচ্ছে ডেঙ্গু মশাটা অ্যারিস্টোক্রেট হয়ে গেছে। এরা পচা ডোবা-নর্দমায় নয়, একটু ভদ্র এলাকায় বাস করে। বাসা-বাড়ির স্বচ্ছ পানিতে এরা বংশবিস্তার করে। তাই এ ব্যাপারে দেশের মানুষকে সচেতন ও সতর্ক থাকতে হবে, বাসা-বাড়ির আশপাশে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। তবে ডেঙ্গুর চিকিৎসা আগের থেকে এখন অনেক সহজ হয়েছে, চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।




মন্তব্য