সংবাদ সম্মেলন

ধর্ষণ রোধে পুরুষদের সোচ্চার হতে হবে :প্রধানমন্ত্রী

উন্নয়ন চাইলে গ্যাসের বর্ধিত দাম মেনে নিতে হবে ষ রোহিঙ্গাদের ফেরাতে চীনের আশ্বাস পেয়েছি ষ চাকরির বয়স ৩৫ না করার পক্ষে যুক্তি

প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০১৯

ধর্ষণ রোধে পুরুষদের সোচ্চার হতে হবে :প্রধানমন্ত্রী

সোমবার গণভবনে চীন সফর-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা- সমকাল

  সমকাল প্রতিবেদক

নারী ও শিশু ধর্ষণের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এ ধরনের জঘন্য নোংরা কাজ যারা করে, তারা মানুষ নয়। ধর্ষণ রোধে যা যা করার দরকার কিংবা আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দরকার হলে সরকার তা-ই করবে। ধর্ষণ প্রতিরোধে নারীরা এগিয়ে এসেছেন। এ বিষয়ে পুরুষদেরও সোচ্চার হতে হবে।

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন,  দেশকে এগিয়ে নিতে ও জিডিপি বাড়াতেই গ্যাসের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। দেশের উন্নতি চাইলে আন্দোলন না করে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি মেনে নিতেই হবে। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে চীন সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছে। রোহিঙ্গারা যে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সমস্যা, সেটি চীনও উপলব্ধি করতে পেরেছে। এ কারণে তাদের যতটুকু করার প্রয়োজন, ততটুকু করবে বলে আশ্বাস দিয়েছে।

দৃঢ়কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশ কারও মুখাপেক্ষী ও পরনির্ভরশীল হয়ে থাকবে না। কোন দেশের সঙ্গে কোন দেশের মনোমালিন্য, কে কী করল না করল সেগুলোও দেখবে না। বাংলাদেশ নিজের ওপর নির্ভরশীল হয়েই উন্নয়নকে এগিয়ে নেবে। গতকাল সোমবার গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সদ্যসমাপ্ত চীন সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে প্রধানমন্ত্রী এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন। তবে সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তরে সেখানে দেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতিই প্রাধান্য পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে কখনও গুরুগম্ভীর ও কখনও হাস্যরসাত্মক ভাষায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। এ সময় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, আওয়ামী লীগসহ সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।

সম্প্রতি নারী-শিশু ধর্ষণের ভয়াবহতা বেড়ে যাওয়া-সংক্রান্ত সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্ভাগ্য হচ্ছে ধর্ষণ সব সময় সব দেশেই আছে। তবে এখন মেয়েরা সাহস করে কথা বলে। একটা সময় সামাজিক লজ্জার কারণে বলতে পারত না। এ প্রসঙ্গে সম্প্রতি রাজধানীর ওয়ারীতে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হওয়া শিশু সায়মার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, অপরাধীকে পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার করেছে এবং সে ধর্ষণের কথা স্বীকারও করেছে। এ ধরনের ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে।

ধর্ষণ রোধে পুরুষদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ধর্ষণ তো তারাই করে। পুরুষ সমাজেরও একটা আওয়াজ তোলা উচিত, কিছু করা উচিত। খালি নারীরাই চিৎকার করে যাবে নাকি? নির্যাতনকারীর স্বজাতি পুরুষদেরও এ ব্যাপারে সোচ্চার হওয়া উচিত।

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি ইস্যুতে আন্দোলন প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, দেশের মানুষের আগে ঠিক করতে হবে, তাদের গ্যাসের প্রয়োজন আছে কি-না। দেশের উন্নতি করতে চাইলে জ্বালানি দরকার। ২০০৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জিডিপি কতটুকু বেড়েছে? আর এখন জিডিপি ৮ দশমিক ১ শতাংশ। এটাকে দুই ডিজিটে নিয়ে যাওয়া হবে। দেশের উন্নতির কারণ হচ্ছে, সরকার জ্বালানি খাতে মনোযোগ দিয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পেরেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেও গ্যাস আমদানি করতে হচ্ছে। এলএনজি আমদানির জন্য খরচ বেশি পড়ছে। কিন্তু শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, সার উৎপাদন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দিতে হলে সরকারকে এলএনজি আমদানি করতেই হবে। প্রতি ঘনমিটার এলএনজি আমদানিতে খরচ পড়ে ৬১ টাকা ১২ পয়সা। কিন্তু সেটা বিক্রি করা হচ্ছে ৯ টাকা ৮০ পয়সায়। এ জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

ভারতে গ্যাসের দাম কমানোর প্রসঙ্গ উঠলে দু'দেশের দামের তুলনামূলক পরিসংখ্যান তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আন্দোলনে একটা মজার বিষয় আছে, বাম আর ডান মিলে এক সুর, ভালো। এখন লোডশেডিং নেই, সবাই বেশ আরাম-আয়েশে আছে বলেই ভুলে গেছে অতীতের কথা। ১০ বছর আগে কী অবস্থা ছিল? আর আন্দোলন যেহেতু হচ্ছে, তাহলে একটা কাজ করি, যে দামে কিনব, সেই দামে বেচব। ৯ টাকার বদলে ৬১ টাকা দরে বেচব!

গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে বাম জোটের হরতালে উষ্ফ্মা প্রকাশ করে তিনি বলেন, গ্যাসের সব ট্যাক্স মাফ করে দেওয়া হয়েছে। মানুষের কাছে যাতে সহজলভ্য হয়, সেই ব্যবস্থাও করা হয়েছে। তারপরও তারা হরতাল ডাকেন, আন্দোলন করেন! খুব ভালো, বহুদিন পর হরতাল পেলাম তো, পরিবেশের জন্য ভালো, ধন্যবাদ।

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, গ্যাস বিক্রির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন বলেই ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসতে পারেননি তিনি। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া সেবার গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দিয়ে ক্ষমতায় আসেন। বিএনপি সরকারের সময় ২০০৪-০৫ সালে ভারত পাইপলাইনের মাধ্যমে মিয়ানমার থেকে গ্যাস নেওয়ার সুযোগ চাইলে খালেদা জিয়া সেটা মানেননি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আমি থাকলে কী করতাম? পাইপলাইনে গ্যাস নিতে দিতামই, আমি আমার ভাগটাও রেখে দিতাম এবং বলতাম যে, আমাকে দিয়ে তারপর নিতে হবে। তখন যদি মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আনতে পারতাম আর অর্থনৈতিক কাজে লাগাতে পারতাম, তাহলে আমাদের এখন এলএনজি আমদানি না করলেও চলত। দেশের কতগুলো বিষয়ে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব বা সরকার যদি ভুল করে, তার খেসারত জনগণকে দিতে হয়।'

শেখ হাসিনা বলেন, চীন সফরকালে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং দেশটি এ সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। এটা ঠিক, চীন মিয়ানমারের সঙ্গে সব সময় আছে। তবে এই যে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আছে এবং এটা যে বাংলাদেশের জন্য বিরাট সমস্যা, এ কথা তো তারা নিজেরা উপলব্ধি করতে পারছে। সে জন্যই তারা মনে করছে, এ বিষয়টার দ্রুত সমাধান হওয়া উচিত।

রাখাইন রাজ্যকে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করা নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসম্যান ব্রাডলি শারম্যানর প্রস্তাবের সমালোচনা করেন শেখ হাসিনা। তিনি ওই প্রস্তাবকে অত্যন্ত গর্হিত ও অন্যায় কাজ বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, রাখাইনকে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশ মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। এখন মিয়ানমার যেন তাদের নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে নেয়, এ বিষয়ে সবাইকে উদ্যোগ নিতে হবে।

তিনি বলেন, 'আমার যে সীমানা আছে, এক লাখ ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের যে দেশটা আছে, আমরা তাতেই খুশি। অন্যের জমি নিয়ে আসা বা অন্যের কোনো প্রদেশ আমাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়া, এটা আমরা সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করি। এটা আমরা কখনই নেব না। প্রতিটি দেশের মতো মিয়ানমারও তার সার্বভৌমত্ব নিয়ে থাকবে। সেখানে বাংলাদেশের সঙ্গে রাখাইন জুড়ে দিতে চায় কেন?'

তিনি বলেন, ওই কংগ্রেসম্যান কি তাদের অতীত ভুলে গেছেন? তাদের যখন গৃহযুদ্ধ লেগেই থাকত, সেই অতীত তো তাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়। আর রাখাইন রাজ্যে প্রতিনিয়ত সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। তা আমরা জেনেবুঝে ওই ধরনের একটা গোলমেলে জিনিস দেশের সঙ্গে যুক্ত করব কেন? এটা আমরা কখনই করব না; বরং মিয়ানমার যেন তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিয়ে যায়, এই কংগ্রেসম্যানের সেটাই করা উচিত। এভাবে একটা দেশের ভেতর গোলমাল পাকানো কোনোমতেই ঠিক নয়।

সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছর করার দাবি নাকচ করে দিয়ে গত তিনটি বিসিএস পরীক্ষায় পাসের তুলনামূলক পরিসংখ্যান তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিসিএসের তথ্য বলছে, বেশি বয়সী শিক্ষার্থীদের নিয়োগ পরীক্ষায় পাসের হার কম। তারা এ নিয়ে আন্দোলন করছে, করুক। কিন্তু কারও প্ররোচনায় আন্দোলন করে থাকলে কিংবা আন্দোলনের পেছনে কোনো ইন্ধন থাকলে সেটাও দেখা হবে।

আরেক প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা জানান, ২০২০ সালে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী উপলক্ষে সরকার ও আওয়ামী লীগ ব্যাপক কর্মসূচি নিয়েছে। বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশ দলের সাফল্য-ব্যর্থতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ বরং বিশ্বকাপে ভালো পারফর্ম করেছে। অতীতে বিশ্বকাপজয়ী এবং অনেক দিন ধরে খেলছে এমন নামিদামি দলকেও সাহসের সঙ্গে মোকাবেলা করে ভালো খেলেছে। বাংলাদেশ দলের সাকিব আল হাসান ও মোস্তাফিজুর রহমান নাম করেছে। তবে সব সময় ভাগ্য সহায় থাকবে, তা তো নয়। আমি আমার ছেলেদের উৎসাহিত করি। তারা ভালো খেলেছে। আমার ছেলেদের তো আমি খারাপ বলতে পারব না। ৩৮৪ রান চেজ করে ৩৩৩ রান করাটাও কিন্তু কম কথা নয়।


মন্তব্য