আদালতে খালেদা জিয়ার প্রশ্ন, শেখ হাসিনাকেও কেন হাজির করা হচ্ছে না

হাসপাতাল থেকে ফের কারাগারে স্থানান্তর

প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০১৮

আদালতে খালেদা জিয়ার প্রশ্ন, শেখ হাসিনাকেও কেন হাজির করা হচ্ছে না

বৃহস্পতিবার হাসপাতাল থেকে কারাগারে নেওয়ার পথে খালেদা জিয়া - সমকাল

  সমকাল প্রতিবেদক

নাইকো দুর্নীতি মামলার আসামি খালেদা জিয়া বলেছেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও নাইকো দুর্নীতি মামলায় আসামি ছিলেন। তাকেও আদালতে হাজির করা উচিত। তিনি বলেন, 'আমি শুধু ধারাবাহিকতা রক্ষায় চুক্তিতে স্বাক্ষর করি। তাহলে এখন শুধু আমার একার বিচার হচ্ছে কেন? শেখ হাসিনাকেও কেন আদালতে আনা হচ্ছে না?'

গতকাল বৃহস্পতিবার পুরান ঢাকার পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থাপিত অস্থায়ী বিশেষ জজ আদালতে এই মামলার শুনানি চলাকালে তিনি এসব কথা বলেন। এদিন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে নাইকো দুর্নীতি মামলায় অভিযোগ গঠনের দিন ধার্য ছিল।

ঢাকার নবম বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মাহমুদুল কবির আগামী বুধবার এই মামলার পরবর্তী তারিখ ধার্য করেন।

আদেশের পর খালেদা জিয়াকে নাজিমুদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এখন থেকে তিনি সেখানেই থাকবেন। এর আগে চিকিৎসার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে এক মাস অবস্থান করেন খালেদা জিয়া।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা ৪০ মিনিটে খালেদা জিয়াকে হুইলচেয়ারে করে বিএসএমএমইউ থেকে ঢাকার পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে আসা হয়। এর পর তাকে ঢাকার নবম বিশেষ জজ আদালতে হাজির করা হয়। বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ জানায়, খালেদা জিয়া বর্তমানে অনেকটা সুস্থ। তার শারীরিক অবস্থা এখন স্থিতিশীল। তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। তবে আদালতে এসে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করার পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, তিনি এখনও 'দারুণ অসুস্থ'। রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত তাকে জেলখানায় আনা হয়েছে।

গতকাল সকালেই খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র একটি গাড়িতে করে হাসপাতাল থেকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয় বলে একজন কারা কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

বিএসএমএমইউর পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহ আল হারুন সাংবাদিকদের বলেন, এক মাস চিকিৎসা শেষে খালেদা জিয়াকে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। শারীরিক অবস্থা যথেষ্ট স্থিতিশীল হওয়ায় মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। কারা কর্তৃপক্ষ চিকিৎসার জন্য তাকে আবারও হাসপাতালে আনার প্রয়োজন মনে করলে কিংবা কারাগারে গিয়ে চিকিৎসা সহায়তা দেওয়ার কথা বললে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে চিকিৎসার জন্য গত ৬ অক্টোবর খালেদা জিয়াকে কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে নেওয়া হয়।

খালেদা জিয়ার মন্তব্য খণ্ডন বিচারকের :বুধবার আইন মন্ত্রণালয় নাইকো দুর্নীতি মামলার বিচার কার্যক্রম স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। ওই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ঢাকার পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রশাসনিক ভবনের ৭ নম্বর কক্ষে অস্থায়ী আদালত হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

গতকাল সকাল ১১টা ৪৮ মিনিটে মামলার কার্যক্রম শুরু হলে প্রথমে দুদকের প্রসিকিউটর মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, এ মামলায় উচ্চ আদালতের কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তাই আমরা চার্জ শুনানি শুরু করতে পারি। এর পর খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, মামলায় মওদুদ আহমদের পক্ষে চার্জ শুনানি চলমান আছে। তিনি হাইকোর্টে রিভিশন করেছেন। আমাদের চার্জ শুনানি মওদুদ আহমদের শুনানি শেষ হওয়ার পর হবে। আমরা আজ মুলতবি চেয়েছি। এরপর মওদুদ আহমদ বলেন, আমার রিভিশন মামলা এখনও বিচারাধীন। কোনো আদেশ পাইনি। তাই আমিও মুলতবি চাচ্ছি।

জবাবে কাজল বলেন, ২০০৮ সালের ৫ মে থেকে এ মামলায় চার্জ শুনানি শুরু হয়। আজও শেষ হয়নি। মওদুদ আহমদের জন্যই শুনানি ঝুলে আছে। এ মামলায় এ পর্যন্ত এজাহার, চার্জশিট, প্রসিডিংসহ অনেক বিষয়ই তারা চ্যালেঞ্জ করেছেন। কিন্তু কোনো আদেশ আনতে পারেননি। তাই এখন আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই।

এর পর মওদুদ আহমদ আদালতের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, এখানে তো মামলার বিচারকাজ চলার মতো পরিবেশ নেই। বসার জায়গা নেই। ওয়াশরুম নেই। এরপর বিচারক বলেন, যেহেতু উচ্চ আদালতের কোনো স্থগিতাদেশ নেই, তাই সময়ের আবেদন নামঞ্জুর করা হলো। চার্জ শুনানি শুরু করুন। এরপর মওদুদ আহমদ বলেন, বেশি সময় থাকতে পারব না। সুপ্রিম কোর্টে মামলা রেখে এসেছি। জবাবে বিচারক বলেন, আপনি যত দেরি করবেন, আপনার নেত্রীকেও তত সময় বসে থাকতে হবে। আপনি বিলম্ব করলে তার কষ্ট হবে। তাই আপনি যত তাড়াতাড়ি শেষ করবেন, খালেদা জিয়া তত তাড়াতাড়ি যেতে পারবেন। তার তত কষ্ট কম হবে। এরপর মওদুদ আহমদ বলেন, জানলাম, আজই তাকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ করে এখানে আনা হয়েছে। চিকিৎসার জন্য তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়নি।

শুনানির একপর্যায়ে খালেদা জিয়া বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও নাইকো দুর্নীতি মামলায় আসামি ছিলেন। কাজেই তাকেও এখানে হাজির করা উচিত। একজনকে সেভ করার জন্য আরেকজনকে বলি দেবেন, এটা ঠিক না। এ সময় বিচারক বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই মামলার আসামি নন। কাজেই তাকে এখানে হাজির করার কোনো প্রশ্ন ওঠে না।

শুনানির সময় মামলার অপর আসামিদের মধ্যে গিয়াসউদ্দিন আল মামুন, সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এ কে এম মোশাররফ হোসেন, ঢাকা ক্লাবের সাবেক সভাপতি সেলিম ভূঁইয়া ও সাবেক সিনিয়র সহকারী সচিব সি এম ইউছুফ হোসাইন উপস্থিত ছিলেন। জামিনে থাকা অপর আসামি জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব খন্দকার শহীদুল ইসলাম অনুপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া এই মামলার আসামি নাইকোর দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট কাশেম শরীফ, তখনকার প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও বাপেক্সের সাবেক মহাব্যবস্থাপক মীর ময়নুল হক পলাতক রয়েছেন।

কানাডার কোম্পানি নাইকোর সঙ্গে অস্বচ্ছ চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতিসাধন ও দুর্নীতির অভিযোগে খালেদা জিয়াসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে দুদকের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ মাহবুবুল আলম ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে তেজগাঁও থানায় মামলাটি দায়ের করেন। ২০০৮ সালের মে মাসে এ মামলায় খালেদা জিয়াসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে দুদক। অভিযোগপত্রে প্রায় ১৩ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়।

জয়নুলের প্রতিবাদ :আদালতকে অবহিত না করেই খালেদা জিয়াকে হাসপাতাল থেকে কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় আদালত অবমাননা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। গতকাল সমিতি ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন।





মন্তব্য যোগ করুণ