সমাজসচেতন কথাশিল্পী নাজমা জেসমিন চৌধুরী

স্মরণ

প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সমাজসচেতন কথাশিল্পী নাজমা জেসমিন চৌধুরী

  নাসির উদ্দীন ইউসুফ

নাজমা জেসমিন চৌধুরীর প্রয়াণের দুই যুগেরও অধিককাল অতিক্রান্ত হলো। ২৯ বছর আগে ১৯৮৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর একজন সমগ্র মানুষ, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার এবং শিশুতোষ নাট্যকার-লেখক আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। ২৯ বছর অতিক্রান্ত হলো; কিন্তু তাঁর জায়গায় তো কেউ দাঁড়াল না। তাঁর অভাব থেকেই গেল। নাজমা আপার সঙ্গে আমার পরিচয় গত শতকের সাতের দশকের গোড়ায়। আমাদের সবার শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর স্ত্রী হিসেবে। সদাহাস্য, বিনয়ী মানুষ। আমরা তখন ছুটছি তীব্রগতিতে সদ্য স্বাধীন দেশে। জীর্ণ-পুরনোকে ছুড়ে ফেলে নতুন কিছু সৃষ্টির লক্ষ্যে। ভুল হচ্ছে, তবু নতুন কিছু করা চাই। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, শিল্পকলা সর্বক্ষেত্রে এক নবউত্থানের সম্ভাবনা। কিন্তু রাজনীতি হঠাৎ ভয়াবহ সংকটে নিপতিত হলো। একদিকে উগ্র জাতীয়তাবাদ, অন্যদিকে তথাকথিত কিছু বাম সংগঠনের হঠকারী তৎপরতায় দেশে সংঘাতময় পরিস্থিতি। এর মধ্যে '৭৫-এর মধ্য আগস্টে সংঘটিত রক্তাক্ত অধ্যায় এবং সামরিক শাসন দেশকে হঠাৎ মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক আদর্শ থেকে বিচ্যুত করল। তারপরও নাটক-কবিতা-চিত্রকলা-উপন্যাস অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে শিল্পকলা '৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাওয়া গণমানুষের রায় এবং স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা অব্যাহত রাখল। এই যাত্রাপথে আমরা আবার সাক্ষাৎ পেলাম নাজমা জেসমিন চৌধুরীর। অন্য এক নাজমা আপা। সংগঠক ও সৃষ্টিশীল একজন মানুষ। তিনিও আমাদের মতো ভাঙাগড়ার মানুষ।

১৯৭৬ সালে ঢাকা থিয়েটার সিদ্ধান্ত নেয় শিশু-কিশোরদের নাট্যদল গড়ার। মুস্তাফা মজিদকে দায়িত্ব দেওয়া হলো। প্রয়াত বেগম মমতাজ হোসেনসহ কয়েকজন তরুণকে সঙ্গে নিয়ে মুস্তাফা মজিদ নাট্যদল 'ঢাকা শিশুনাট্যম' সংগঠিত করে নাটক মঞ্চায়ন শুরু করলেন। কবি হাবিবুর রহমান রচিত 'আলোর ফুল' এবং 'মায়াকানন' নাটক দুটির মঞ্চায়নের পর অরুণ চৌধুরীর নাট্যরূপে সুকুমার রায়ের হযবরল তৃতীয় প্রযোজনা। নাজমা আপা হযবরল নাটক দেখতে এসে আমাদের নাট্য আন্দোলনে জড়িয়ে গেলেন। যদিও এর মধ্যে নাজমা আপা বাংলাদেশ টেলিভিশন আয়োজিত জাতীয়ভিত্তিক নাট্যরচনা প্রতিযোগিতায় তাঁর রচিত নাটক প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। কিন্তু টেলিভিশন নয়, মঞ্চই হচ্ছে নাটকের মূল ভূমি- এ ধারণা তাঁর বিশ্বাসের অন্তর্গত। তাই তিনি মঞ্চের জন্যই প্রথম নাটক লিখলেন ১৯৭৮ সালে 'আলোটা জ্বালো'; মঞ্চায়ন করল ঢাকা শিশুনাট্যম। নির্দেশনায় ছিলেন মুস্তাফা মজিদ। ১৯৭৮ সালেই তিনি সংগঠিত করলেন ঢাকা লিটল থিয়েটার। মযহারুল ইসলাম বাবলা ও মোরশেদুল ইসলাম ঢাকা লিটল থিয়েটার সংগঠনে বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন। তবে দলের প্রাণ ছিলেন নাজমা জেসমিন চৌধুরী। ঢাকা থিয়েটারের নামের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে এবং একটি সাংগঠনিক সম্পর্ক বজায় রাখতে তিনি এ নামটি বেছে নিলেন। ঢাকা লিটল থিয়েটারে যে নাজমা আপাকে পেলাম, তিনি এক ভিন্ন মানুষ। শিক্ষক নন, বন্ধু সবার, বন্ধু ছোট-বড় সবারই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের আবাসে নাজমা আপার বাসার বসার ঘরটি ছিল বেশ বড়। বারান্দা ও শোয়ার ঘরও বড়। আমাদের লিটল থিয়েটারের মহড়া শুরু হতো তাঁর বসার ঘরে এবং ক্রমশ তা ছড়িয়ে পড়ত বারান্দা হয়ে শোয়ার ঘর পর্যন্ত। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যার নীরবে বাসা থেকে বের হয়ে বাইরে হাঁটতে চলে যেতেন; যেন আমাদের অসুবিধা না হয়। নাজমা আপা মহড়ায় অংশ নিচ্ছেন নাট্যকার হিসেবে, আবার এক ফাঁকে দৌড়ে রান্নাঘরে ঢুকে চা-নাশতা বানাতেন। শিশু-কিশোরদের জন্য আলাদা খাওয়া। সব এক হাতে করতেন। কখনও বিরক্ত হতে দেখিনি। উপরন্তু দেখেছি তাঁর প্রচণ্ড উৎসাহ-উদ্দীপনা! ঢাকা লিটল থিয়েটারের প্রথম নাটক কী হবে, কে লিখবেন? সবাই বললাম, 'নাজমা আপা, আপনি লিখুন।' তিনি স্বভাবসিদ্ধ বিনয়ের সঙ্গে বললেন, 'আমি পারব?' সবার চাপাচাপিতে রাজি হলেন। রবীন্দ্রনাথের 'তাসের দেশ' ছোটদের জন্য রূপান্তরের কাজে হাত দিলেন। নাট্য প্রয়োগ নিয়ে তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ হয়েছে। প্রায়ই বসেছি তাঁর সঙ্গে। কারিগরি দিকগুলো বুঝে তিনি নাটক লেখার পক্ষপাতী। তাই প্রায়ই আলোচনা হতো।

'তাসের দেশ' রূপান্তর ছাড়াও শিশুদের জন্য নাটক লিখেছেন বেশ ক'টি। ছোটদের জন্য গল্পও লিখেছেন, 'বাড়ি থেকে পালিয়ে', 'জিতল কারা', 'ভয়ের আড়ালে'। শিশুতোষ লেখার পাশাপাশি বড়দের জন্য লিখেছেন উপন্যাস- 'সামনে সময়', 'ঘরের ছায়া', 'লোকে বলে' এবং বেশ ক'টি ছোটগল্প। গবেষণা ও প্রবন্ধ 'বাংলা উপন্যাস ও রাজনীতি' গ্রন্থটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। সাহিত্যে সামাজিকতা (বাংলা একাডেমি)। সম্পাদিত গ্রন্থ, মোহাম্মদ মোর্তজা রচনাবলী (বাংলা একাডেমি)। নাজমা জেসমিন চৌধুরীর লেখা ঋজু কাঠামোর গল্প-উপন্যাসের প্রধান সব চরিত্র নারী ও প্রতিবাদী। বাস্তবতার গভীরে আরেক বাস্তবতা আবিস্কার করেন নাজমা জেসমিন চৌধুরী এবং তাঁর প্রতিবাদী চরিত্রগুলো আত্মসমর্পণ করে না। আশাবাদী হয়ে জেগে থাকে দিনবদলের প্রত্যাশায়। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে নিম্নবিত্ত মানুষের জীবন তাঁর সৃষ্টিশীল মুখরতায় বাগ্ধময় হয়ে ওঠে, জ্বলে ওঠে। আবার উচ্চবিত্ত মানুষের, তথাকথিত শিক্ষিত মানুষের সমাজের গভীরে ঢুকে তিনি বের করে আনেন এমন মানুষদের, যাদের আসল চেহারা দেখে আমরা চমকে উঠি। নাজমা জেসমিন চৌধুরীর মৃত্যুর পর প্রকাশিত গল্প 'তোমাকে অভিনন্দন দীপা' পড়ে চমকে উঠতে হয়। দীর্ঘ ৩০ বছর সংসার করা শিক্ষিত গৃহিণী সালমা যখন তার মেয়েকে ধনী নিপীড়ক স্বামীর কাছে ফিরে যেতে বারণ করে, এমনকি ৩০ বছরের সঙ্গী স্বামী ওয়াহেদ আলীর শয্যায় বসে স্বামী পরিত্যাগী নারী অধিকারে নিবেদিত দীপাকে গভীর রাতে অভিনন্দন জানায়, তখন আমাদের জানা হয়ে যায়, এ অন্য এক লেখক, অন্য এক নাজমা জেসমিন চৌধুরী। তিনি শিশুতোষ লেখক বা একজন ঔপন্যাসিকই নন, তিনি একজন মুক্ত ও স্বাধীন বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার দৃঢ়প্রত্যয়ী রাজনীতিসচেতন কথাশিল্পী। না, শুধু এ গল্পেই নয়, তাঁর বিভিন্ন গল্প, উপন্যাস, নাটকে মুক্তির কথা এসেছে ঘুরেফিরে। এ জায়গায় নাজমা জেসমিন চৌধুরী অন্যদের থেকে আলাদা। তিনি শিশুদের গড়তে চেয়েছিলেন এক নতুন সমাজ গড়ার মানুষ হিসেবে। শিশুদের জন্য লিখেছেন তিনি বিরামহীন। সংগঠিত করেছেন শিশু-কিশোরদের মঞ্চনাটক। ব্যক্তিগতভাবে আমাকে ভীষণ স্নেহ এবং পছন্দ করতেন। আমাকে একদিন বলেছিলেন, 'বাচ্চু তুমি যত বড় নাট্য নির্দেশক হও না কেন, আমার কাছে তোমার সবচেয়ে বড় পরিচয় তুমি একজন মুক্তিযোদ্ধা।' শুনে আমি চমকে উঠেছি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর চেতনার গভীরতায় বিস্মিত হয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস জুড়ে নানা জায়গা বদল করে স্যারকে আগলে রেখেছিলেন তিনিই। তাই আমাদের শ্রদ্ধেয় স্যারকে ঘাতক আলবদর বাহিনীর শিকারে পরিণত হতে হয়নি। জেনারেল টিক্কা খানের তালিকায় দেশের খ্যাতিমান বিশিষ্টজনের সঙ্গে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর নামও অন্তর্ভুক্ত ছিল। একমাত্র নাজমা আপার অসামান্য সতর্কতার কারণে স্যারকে আমরা অক্ষত পেয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি নিয়ে অনেক বড় কাজ করবেন। এ নিয়ে অনেক আলাপ-আলোচনাও করেছিলেন। কিন্তু সময় পেলেন না। ঘাতক ব্যাধি তাঁকে অকালে কেড়ে নিল। এ রকম বিশাল মাপের সৃজনশীল সমাজসচেতন মানুষের সংখ্যা আমাদের সমাজে বড়ই দুর্লভ। তাঁর অভাব আর কেউ পূরণ করতে পারল না। এটা তো হতাশাজনকই বটে।

নাজমা জেসমিন চৌধুরীর অকাল প্রয়াণ আমাদের বঞ্চিত করেছে একজন কথাশিল্পীর কালোত্তীর্ণ সাহিত্য থেকে। সমাজ বঞ্চিত হয়েছে একজন সমাজসচেতন, রাজনীতিসচেতন শিল্পীর পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ও সৃষ্টি থেকে। যে সৃষ্টি রাষ্ট্রকে করবে পূর্ণাঙ্গ, সমাজ হবে শোষণমুক্ত। আমার এ ছোট্ট লেখাটি পড়ার সময় অনেকে ভাবতে পারেন, নাজমা জেসমিন চৌধুরীকে নিয়ে লেখার সময় আমি এত ঘটনা, নাটক বা সংগঠনের উল্লেখ কেন করেছি। ব্যক্তি নাজমা জেসমিন চৌধুরীকে নিয়ে লিখলেই তো হতো। না, হতো না। নাজমা জেসমিন চৌধুরীকে শুধু এক ব্যক্তির পরিমাপে দেখলে চলবে না। তাঁকে দেখতে হবে সমষ্টির আঙ্গিকে। ব্যক্তিকে তিনি কখনও সমষ্টি থেকে আলাদা করেননি এবং সমষ্টির বাইরে ব্যক্তিকে বিশ্বাসও করতেন না। তাঁর জীবনাচরণ, সাংগঠনিক ক্রিয়া, নাটক ও সাহিত্য রচনায় সমষ্টির মুক্তির মধ্যে ব্যক্তিমুক্তির প্রয়াস প্রবলভাবে লক্ষণীয়। আর তাই তাঁকে বোঝার জন্য তাঁর সময় ও কর্মকে জানতে হবে। বুঝতে হবে সমাজ-বাস্তবতা এবং বিপরীত বাস্তবতার জমিতে দাঁড়িয়ে স্বপ্নের গান, যা তিনি রচনা করেছিলেন। এটুকু বোঝার জন্য আমার এ অসম্পূর্ণ রচনা।

নাট্যজন-চলচ্চিত্রকার


মন্তব্য

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ