ঢাকা যখন 'বসবাস অযোগ্য'

প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ঢাকা যখন 'বসবাস অযোগ্য'

  লাভা মাহমুদা

এ বছরও সবচেয়ে অযোগ্য শহরের তালিকায় তৃতীয় হয়েছে ঢাকা। যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত বাণিজ্যবিষয়ক প্রভাবশালী সাময়িকী 'দ্য ইকোনমিস্ট'-এর গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) 'নিরাপদ শহর সূচক-২০১৯'-এর ১৪০টি দেশের শহরের তালিকায় ঢাকা শহরের অবস্থান ১৩৮তম। ঢাকার চেয়ে খারাপ অবস্থা কেবল যুদ্ধবিধ্বস্ত শহর সিরিয়ার দামেস্ক ও নাইজেরিয়ার লাগোস। গত বছর ঢাকার অবস্থান ছিল ১৩৯। স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা, অবকাঠামো- এমন ছয়টি বিষয় আমলে নিয়ে শহরগুলোর যোগ্যতা পরিমাপ করা হয়েছে। এই বিষয়গুলোর ভেতরে আছে জলবায়ু ও তাপমাত্রা, সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিবন্ধকতা, দুর্নীতির মাত্রা, খেলাধুলার সুযোগ, খাদ্য ও পানীয় দ্রব্যের সহজলভ্যতা, ভোগ্যপণ্য, সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা, গৃহায়ন, জ্বালানি, পানি, টেলিকমিউনিকেশন ইত্যাদি। আমরা যারা এ শহরে বাস করি, তারা জানি প্রতিমুহূর্তে কত রকমের প্রতিবন্ধকতার শিকার হই, কত রকমের হেনস্তা হই! পদে পদে যন্ত্রণা ভোগ করি। মেজাজ বিগড়ে যায়। শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত ট্রাফিক জ্যামের কারণে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারি না। প্রায়ই কাজের জায়গায় পৌঁছাতে দেরি হয়ে যায়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই সময় মূল্যহীন। ডাক্তারের চেম্বারের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। সরকারি অফিসে কাজে গেলে এই টেবিল সেই টেবিল ঘুরতে ঘুরতে কী কাজের জন্য মানুষ সেখানে যায়, সেটাই ভুলতে বসে। বায়ুদূষণের কারণে অক্সিজেনের সঙ্গে সিসা, সিএফসির মতো উপাদান মানুষের শরীরে যাচ্ছে। একটু বৃষ্টিতে পানি জমে রাস্তাঘাট টইটম্বুর হয়ে যায়; অন্যান্য বাহনের সঙ্গে চলে নৌকাও। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে এই শহরে। এখন এখানে শীতকাল আসে শুধু ঋতুর হিসেবে। প্রায় পুরোটা বছরই প্রচণ্ড গরম থাকে। গরম ও আর্দ্রতার পরিমাণ এত বেশি যে, মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে। সেদিন খুব দূরে নয়, যেদিন শীতের হিমেল পরশ অনুভব করার জন্য আমাদের হিমালয়ে যেতে হবে। সামাজিক প্রতিবন্ধকতা এই শহরে ব্যাপক। চলাচল, কর্ম ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত মানুষ হেনস্তার শিকার হয়। বিশেষ করে নারীদের জন্য এ শহর একেবারেই অনিরাপদ। যৌন নিপীড়ন, নির্যাতন, ইভ টিজিংয়ের মতো বিষয় এখানে নিত্যদিনের। গৃহায়ন, পানি, জ্বালানির মতো বিষয় প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। সড়ক পরিবহনে মারাত্মক নৈরাজ্য। সবকিছু মিলে সত্যিই ঢাকা বসবাসের এক অযোগ্য শহর। ১৩৪ বর্গমাইল আয়তনের ঢাকায় মোট জনসংখ্যা প্রায় এক কোটি ৭০ লাখ। প্রতি বর্গমাইলে এক লাখ ১৫ হাজার লোকের বাস এবং প্রতিদিন যোগ হচ্ছে ১,৫০০ মানুষ। এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে জনঘনত্বপূর্ণ নগরী। অতিরিক্ত মানুষের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে প্রতিটি ক্ষেত্রেই। আর দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে নগরজীবন। তালিকার প্রথমে থাকা ভিয়েনা, মেলবোর্ন, সিডনির মতো শহরের দেশগুলোকে কখনোই আমাদের মতো পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয় না। সব প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে এ মহানগরী ক্লান্ত, পর্যুদস্ত। ভাবার সময় পার হয়ে গেছে। সরকারকে অবশ্যই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ শহরকে বাঁচাতে হলে বিকেন্দ্রীকরণের কোনো বিকল্প নেই। মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো প্রকল্পগুলো মানুষের চলাচলে স্বাচ্ছন্দ্য আনবে। ঢাকাকে বাঁচানো এক বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা এই প্রিয় শহরকে মরে যেতে দিতে পারি না। কোনোদিনও চাই না হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো কিংবা পেট্রা, মাচুপিচু, পম্পেই নগরীর মতো ধ্বংস হোক ঢাকা। বাসযোগ্য নগরীর তালিকায় প্রথম-দ্বিতীয় নিয়ে মাথাব্যথা নেই। চাই শুধু প্রাণভরে মুক্ত বায়ুতে শ্বাস নিতে; যানজটহীন, জলজটহীন রাস্তা, সুশৃঙ্খল যাতায়াত ব্যবস্থা। চাই নিরাপদে চলতে; জীবনের নিরাপত্তা, নিশ্চয়তা। চারশ' বছরের পুরনো এই শহর আমার অতি আপন, হৃদয়ের অংশ। এর অলিগলিতে আমি প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পাই। বাঁচুক প্রিয় এই শহর; মাথা তুলে দাঁড়াক সল্ফ্ভ্রমের সঙ্গে।

হশিক্ষক


মন্তব্য