ঈদুল আজহার তাৎপর্য ও করণীয়

ধর্ম

প্রকাশ : ১১ আগষ্ট ২০১৯

ঈদুল আজহার তাৎপর্য ও করণীয়

  মাহমুদ আহমদ

কোরবানির গুরুত্ব সীমাহীন। কারণ মুমিনের জীবনের একমাত্র আরাধনা মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা। আর প্রকৃত কোরবানি তাকে অত্যন্ত দ্রুত আল্লাহর নৈকট্যে ভূষিত করে। আমরা বাঙালি কোরবানির ঈদ বলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। কোরবানি শব্দের অর্থ নৈকট্য, ত্যাগ, উৎসর্গ। অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যেই এ কোরবানি। কোরবানির ঈদ পালনের মাধ্যমে বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা আল্লাহর প্রিয় বান্দা ও নবী হজরত ইবরাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইলের (আ.) অতুলনীয় আনুগত্য এবং মহান ত্যাগের পুণ্যময় স্মৃতি বহন করে। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মুসলিম উম্মাহ প্রতি বছর পশু কোরবানি করে থাকে। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে নির্দেশ দিচ্ছেন, 'অতএব আপনি আপনার পালনকর্তার উদ্দেশে নামাজ পড়ুন এবং কোরবানি করুন' (সুরা কাউসার, আয়াত ২)।

কোরবানি একটি প্রতীকী ব্যাপার। এখানে পশু কোরবানির মাধ্যমে মুসলমানরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জানমাল থেকে শুরু করে সবকিছুই কোরবানি করতে প্রস্তুত। হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তার পুরো পরিবারের নজিরবিহীন কোরবানির ইতিহাস মানুষকে যে ত্যাগের শিক্ষা দেয়, তাতে উদ্বুদ্ধ হয়ে একজন মুমিন তার সবকিছুই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করতে সদাপ্রস্তুত। হজরত ইবরাহিম (আ.) ও প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.) এবং মা হাজেরার আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশগুলো আল্লাহতায়ালা হজের অংশ হিসেবে গণ্য করেছেন। আল্লাহতায়ালা হজরত ইবরাহিমকে (আ.) স্বপ্নে দেখালেন, তিনি তার পুত্রকে জবাই করছেন (সুরা সাফ)। যেভাবে 'কোরবানি' কবিতায় কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন :"এই দিনই 'মিনা' ময়দানে, পুত্র-স্নেহের গর্দানে, ছুরি হেনে খুন ক্ষরিয়ে নে, রেখেছে আব্বা ইব্রাহিম সে আপনা রুদ্র পণ! ছি ছি! কেঁপো না ক্ষুুদ্র মন! আজ জল্লাদ নয়, প্রহদ্মাদ-সম মোল্লা খুন-বদন! ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্বোধন।" পিতা ইবরাহিম স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে গেলে আল্লাহ বললেন, হে ইবরাহিম, তুমি তোমার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছ। আমি তোমাকে নিজ পুত্রকে আমার পথে উৎসর্গ করতে বলেছি; হত্যা করতে নয়। তোমার পুত্র সারাজীন লোকদের বোঝাবে আল্লাহ- এক-অদ্বিতীয়। আসলে আল্লাহ মানুষের অন্তর দেখেন, কে কোন উদ্দেশ্যে কোরবানি করছে তা তিনি ভালো করেই জানেন। মূলত মানুষের মধ্যে লোভ-লালসা দূর করে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে সব পশুত্বকে বিসর্জনের শিক্ষাই হলো কোরবানির শিক্ষা। তাই কোরবানির অন্যতম ধর্মীয় উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানুষের মধ্যে পশুত্বকে হত্যা করে মনুষ্যত্বকে জাগিয়ে তোলা।

কাজী নজরুল ইসলাম তার এক কবিতায় বিষয়টি এভাবে তুলে ধরেছেন- 'মনের পশুরে কর জবাই/ পশুরাও বাঁচে বাঁচে সবাই।' এই পশু কোরবানি সম্পূর্ণ রূপক। আল্লাহর পথে ত্যাগই ঈদের আসল শিক্ষা। আল্লাহর নামে পশু কোরবানি করে তা মানুষের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার মানে দান নয়, তা ত্যাগ। তাই তো কবি নজরুল 'ঈদজ্জোহা' কবিতায় লিখেছেন, 'চাহি নাকো দুম্বা-উট, কতটুকু দান? ও দান ঝুট। চাই কোরবানি, চাই না দান।'

আত্মত্যাগের মহিমায় উদ্বুদ্ধ হয়ে যারা আল্লাহর নামে কোরবানি করে তাদের জন্য সীমাহীন সওয়াবের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। মহানবী (সা.) বিভিন্ন সময় কোরবানির বিষয়ে তার উম্মতকে নসিহত করেছেন। কারও হৃদয়ে যদি এমন ধারণার উদ্রেক হয়, প্রতি বছরই তো কোরবানি দিয়ে যাচ্ছি; এবার না হয় দিলাম না- এমন চিন্তাভাবনা মোটেও ঠিক না। কেননা, কোরবানি শুধু একবারের জন্য নয় বরং তা সারা জীবনের জন্য। মহানবী (সা.) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি সামর্থ্য লাভ করে অথচ কোরবানির আয়োজন করেনি, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছে না আসে' (ইবনে মাজাহ)। হজরত ইবনে উমর (রা.) বলেন, মহানবী (সা.) মদিনায় ১০ বছর অবস্থান করেছেন এবং বরাবর কোরবানি করেছেন (তিরমিজি)। মহানবী (সা.) বলেছেন, কোরবানির দিনে কোরবানি করাই সবচেয়ে বড় ইবাদত। কোরবানির জন্তুর শরীরের প্রতিটি পশমের বিনিময়ে কোরবানিদাতাকে একটি সওয়াব দান করা হবে। কোরবানির পশুর রক্ত জবাই করার সময় মাটিতে পড়ার আগেই তা আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যায় (মেশকাত)। কোরবানির বিনিময়ে সওয়াব পেতে হলে অবশ্যই কোরবানিটা হতে হবে একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশে। আর প্রকৃত কোরবানি হলো নিজ আত্মার কলুষতাকে জবাই করা, আত্মার আমিত্বকে জবাই করা, অহঙ্কারকে জবাই করা।

ইসলামী গবেষক
masumon83@yahoo.com


মন্তব্য

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ