ভারতীয় গরুর ভাঙা হাট

প্রকাশ : ১১ আগষ্ট ২০১৯

   শেখ রোকন

মাত্র কয়েক বছর আগেও ভারতীয় গরু ছাড়া বাংলাদেশে কোরবানি পশুর হাট ভাবাও যেত না। কিন্তু কয়েক বছর ধরে কোরবানি পশুর হাটে ভারতীয় গরুর উপস্থিতি ক্রমেই কমছে। খোদ রাজধানীতেও আগে কোরবানি ঈদের আগে আগে রাজপথে ও গলিতে দীর্ঘপথের ভ্রমণক্লান্ত উঁচু শিং ও লম্বা পায়ের উত্তর ভারতীয় গরু দেখেই চেনা যেত। এখন গরুগুলো দেখলেই বোঝা যায়, এগুলো পদ্মা-যমুনা-মেঘনার জলহাওয়ায় বেড়ে ওঠা দেশি গরু। বিষয়টি পরিসংখ্যান দিয়েও বোঝা যায়। ২০১৩ সালে 'বৈধ পথে' বা করিডোরের মাধ্যমে কমবেশি ২৩ লাখ ভারতীয় গরু বাংলাদেশে এসেছিল। এ বছর সেটা এক লাখ ছাড়াবে না। মাত্র ছয় বছরেই ভারতীয় গরুর আমদানি মোটাদাগে ৯৫ শতাংশ কমেছে!

ভারতীয় গরু আমদানির বদলে আমাদের যে নিজস্ব উৎপাদনে মনোযোগ দেওয়া উচিত- ব্যক্তিগতভাবে এ বিষয়ে আমি প্রায় প্রতিবছরই লিখেছি। মনে আছে, নয়াদিল্লিতে নরেন্দ্র মোদির সরকার প্রথমবার ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশ সীমান্তজুড়ে বৈধ-অবৈধপথে গরু 'রফতানি' বন্ধ করেছিল। বহু যুগ ধরে চলে আসা এই 'নির্ভরতা' হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খানিকটা বিপাক তৈরি হয়েছিল, স্বীকার করতে হবে। কিন্তু বিষয়টি যে বাংলাদেশের জন্য 'শাপে বর' হিসেবে প্রতিষ্ঠার 'সুবর্ণ সুযোগ' নিয়ে এসেছে, সেটা সমকালেই লিখেছিলাম। বলেছিলাম, এতে করে দেশি গরু খামারের বিকাশ হবে। ভারতীয় দৈনিক হিন্দুস্তান টাইমস তখন আমার বক্তব্য প্রকাশ করেছিল- বিএসএফ নয়, বরং বিজিবিরই উচিত ভারতীয় গরুর 'অনুপ্রবেশ' রোধে সীমান্ত সিল করে দেওয়া।

আরও একটি বিষয়। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে যেসব রক্তপাত ঘটে থাকে, আমরা স্বীকার করি বা না করি- এর একটি বড় অংশ ঘটে আসলে গরু চোরাচালানের জন্য। তাই বলেছিলাম- "দেশের আমিষের চাহিদা মেটাতে গিয়ে এভাবে বাংলাদেশিদের 'ট্রিগারহ্যাপি' বিএসএফের সামনে ঠেলে দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত? আর একটি দেশ দশকের পর দশক তার গোমাংসের চাহিদার জন্য প্রতিবেশী একটি দেশের মেজাজ-মর্জির ওপর নির্ভর করে থাকবে, এটা না মর্যাদাকর, না বাস্তবসম্মত।" (দেখিই না ভারতীয় গরু ছাড়া চলে কি-না!, সমকাল, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬)। স্বীকার করতে হবে, সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যাও গত কয়েক বছরে কমেছে। আমার ধারণা, এর পেছনে গরু চোরাচালান কমে যাওয়ার অবদান অনেকখানি।

ভারতীয় গরুর আমদানি কমে যাওয়ার আরও নানা সুফল এখন স্পষ্ট। কোরবানির পশুতে আমরা ইতিমধ্যেই স্বয়ংসম্পূর্ণ। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবার কোরবানি পশুর চাহিদা নির্ধারণ করেছে এক কোটি ১১ লাখ। এর মধ্যে গরু ছাড়াও মহিষ, ছাগল ও ভেড়া রয়েছে। অধিদপ্তরের হিসাবেই কোরবানির জন্য খামারিরা এক কোটি ১৭ লাখ পশু লালন করছেন। ব্যক্তি পর্যায়ে বসতবাড়িতে লালিত পশু যোগ করলে এই সংখ্যা আরও বাড়বে। গরু খামারির সংখ্যাও স্বভাবতই বাড়ছে। গত বছর যেখানে অধিদপ্তরের আওতায় নিবন্ধিত খামারির সংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে চার লাখ। এবার সেটা পৌনে ছয় লাখে পৌঁছেছে। সামনের দিনগুলোতে আরও বাড়বে। তার মানে আরও কর্মসংস্থান। আমাদের নদনদীর 'পরিত্যক্ত' চরাঞ্চলও 'উৎপাদনমূলক' হয়ে উঠছে গরুর খামারের বদৌলতে। বিবিসি রিপোর্ট করছে, ভারতীয় গরুর আমদানি কমায় 'ট্রান্সবাউন্ডারি অ্যানিমেল ডিজিজ' খুরা রোগ, অ্যানথ্রাক্সের প্রকোপও কমেছে।

গত কয়েক বছর দেখা যেত ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে ভারতীয় গরুর উপস্থিতি কমলেও সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর হাটে তুলনামূলক বেশি উঠত। বিশেষত উত্তরবঙ্গীয় জেলাগুলোতে। এ বছর দেখছি, রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের সীমান্তে বিজিবি '১৪৪ ধারা' জারি করেছে। তারপরও কিছু গরু সীমান্তবর্তী হাটগুলোতে উঠবে না, এমন নয়। কিন্তু আগের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করলে সেই সংখ্যা ধর্তব্য নয়। বিজিবি হাইকমান্ড যদি কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে, তাহলে ভারতীয় গরুর সীমান্ত অতিক্রম শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব। অন্য সম্ভাবনার কথাও বলি, দেশি গরুর উৎপাদন যখন আরও বাড়বে, তখন স্বভাবতই দামও কমে আসবে। আর সীমান্ত পার হয়ে আসা গরুর তুলনায় দেশে উৎপাদিত গরুর দাম যদি কমে যায়, তখন বাজারের নিয়মেই ভারতীয় গরুর ভাঙা হাট আরও ভেঙে যাবে।

skrokon@gmail.com


মন্তব্য

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ