ওআইসির সিদ্ধান্তের সুফল ঘরে তুলতে হবে

পর্যটন

প্রকাশ : ১০ আগষ্ট ২০১৯

ওআইসির সিদ্ধান্তের সুফল ঘরে তুলতে হবে

  ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের জন্য সুখবর বয়ে এনেছে ওআইসি পর্যটন সম্মেলন। ২০১৮ সালের ওআইসির আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ঢাকাকে ওআইসি পর্যটন শহর-২০১৯ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ঢাকার ৪০০ বছরের ইসলামিক ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতি সারাবিশ্বের মানুষের কাছে তুলে ধরতে যা অনন্য ভূমিকা পালন করবে। এর ফলে ঢাকা তথা সারাদেশ সমগ্র বিশ্ব ও মুসলিম দুনিয়ায় নতুন করে পরিচিতি লাভ করবে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বে মুসলিম পর্যটকের সংখ্যা বেড়ে চলছে। ২০১৫ সালে মুসলিম পর্যটকের সংখ্যা ছিল ১১৭ মিলিয়ন, যা ২০২০ সালে ১৮০ মিলিয়নে পৌঁছাবে। এ চাহিদার কথা মাথায় রেখে ২০১৪ সালে ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর পর্যটনবিষয়ক মন্ত্রীদের এক সম্মেলনে ২০১৫ সাল থেকে মুসলিম দেশগুলোর বিভিন্ন শহরকে ওআইসি পর্যটন শহর হিসেবে ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালে ঢাকাকে ওআইসি পর্যটন শহর হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

আমরা জানি, ভবিষ্যতে বিশ্বের পর্যটকদের কাছে অন্যতম পছন্দের গন্তব্য হবে এশিয়া মহাদেশ। ওআইসির এমন ঘোষণার ফলে বাংলাদেশ তার একটা বড় অংশীদার হতে পারে এখন। এ জন্য ওআইসির ১৩০ কোটি টাকা আর্থিক সহায়তার আওতায় ইসলামী ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফলে ঐতিহ্যবাহী মসজিদগুলোর সংস্কার ও সজ্জিতকরণ সম্ভব হবে। এতে ওআইসি সদস্যভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে এবং পারস্পরিক সম্পর্কোন্নয়ন ঘটবে। ঢাকার পর্যটনগত ধর্মীয় গুরুত্ব বাড়বে, বাড়বে ঢাকা ভ্রমণের আগ্রহ। অন্যদিকে ওআইসির অঙ্গসংগঠন ইসলামিক এডুকেশনাল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড কালচারাল অর্গানাইজেশন ২০১২ সালের জন্য ঢাকাকে ইসলামী সংস্কৃতির এশীয় অঞ্চলের রাজধানী ঘোষণা করে বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব ও ঢাকার মর্যাদা তৈরি করেছে।

রাজধানী ঢাকায় রয়েছে অসংখ্য মুসলিম ঐতিহ্য। যাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে পর্যটন শিল্প। তা ছাড়া মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম জমায়েত, যা বিশ্ব ইজতেমা নামে পরিচিত, তা অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশে। এই জমায়েতকে উপলক্ষ করে বাংলাদেশে বিভিন্ন দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ভ্রমণে আগ্রহী করে তোলা যেতে পারে।

প্রসঙ্গত, অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যাও বেড়েছে বাংলাদেশে। এখন প্রতিবছর ৫০ থেকে ৬০ লাখ দেশীয় পর্যটক ঘুরতে যান। পাঁচ বছর আগে এ সংখ্যা ছিল ২৫ থেকে ৩০ লাখ। বিদেশি পর্যটক নির্ভরতা ছাড়াও দেশীয় পর্যটকের নিরাপত্তা, যোগাযোগ সুবিধা, আকর্ষণীয় অফার এবং পর্যটন ব্যয়সীমার মধ্যে থাকলে দেশের মানুষ আগ্রহ নিয়ে দেশ ঘুরে দেখতে চাইবে। এক হিসাবে বলা হয়, ১৬ কোটির বেশি মানুষের বাংলাদেশ গড়ে প্রতিবছরে ১০ ভাগও যদি দেশ ঘুরে দেখে তাহলে বিশাল অঙ্কের অর্থনৈতিক তৎপরতা সৃষ্টি হবে। দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন ঘটছে পর্যটন শিল্প বিকাশের ফলে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের ১ দশমিক ৪১ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে পর্যটন খাতে। এই শিল্পের মাধ্যমে দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ৫৬ শতাংশ বা মূল্য সংযোজন হচ্ছে ১৬ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা। বাংলাদেশকে বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল কয়েকটি পর্যটন কেন্দ্রের মধ্যে গণ্য করা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের পর্যটন শিল্প বিকাশের যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকলেও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় আমরা এই শিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সফল হতে পারিনি।

বাংলাদেশ বর্তমানে এ খাত থেকে যেখানে প্রায় ৭৬.১৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বার্ষিক আয় করে, সেখানে সার্কভুক্ত অন্য দেশগুলোর পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়- ভারতে পর্যটন খাত থেকে আয়ের পরিমাণ ১০,৭২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, মালদ্বীপে ৬০২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, শ্রীলংকায় ৩৮৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, পাকিস্তানে ২৭৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং নেপালে এর পরিমাণ ১৯৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে যুগে যুগে বহু পরিব্রাজক এবং ভ্রমণকারী মুগ্ধ হয়েছেন। স্বাভাবিকভাবে সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন-সম্ভাবনা অপরিসীম। আমাদের রয়েছে সুবিশাল সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, অরণ্যঘেরা জলপ্রপাত, প্রত্নতত্ত্বের প্রাচুর্য, ঐতিহাসিক নিদর্শনসহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থান, যা পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমৃদ্ধ ইতিহাস, বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি আমাদের দেশকে পরিণত করেছে একটি বহুমাত্রিক আকর্ষণ সমৃদ্ধ অনন্য পর্যটন গন্তব্যে, যা বাংলাদেশকে গড়ে তুলেছে পর্যটকদের জন্য তীর্থস্থান হিসেবে।

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বিভিন্ন বিভাগ ও দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতা। পর্যটনের বিকাশের জন্য এসব বিভাগের মধ্যে সঠিক সমন্বয় সাধন করতে হবে। তা ছাড়া বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে সঠিক পরিকল্পনা নিতে হবে। আর সারাবিশ্বের মানুষের কাছে আমাদের পর্যটনের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরতে আমাদের সাহায্য নিতে হবে তথ্যপ্রযুক্তির। ওয়েবসাইটগুলোকে আমরা এখনও পর্যটকবান্ধব করে গড়ে তুলতে পারিনি। এসব ওয়েবসাইটকে আরও তথ্যবহুল করে গড়ে তুলতে হবে, যাতে করে একটি স্থান থেকে দেশি-বিদেশি সব পর্যটক প্রয়োজনীয় সবরকম তথ্য পেতে পারেন। তা ছাড়া বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হলো প্রচারণার এক অনন্য মাধ্যম। বিশেষ করে ফেসবুক, টুইটার, ফ্লিকারসহ অন্যান্য মাধ্যম আমাদের পর্যটনের প্রচারণায় বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে।

বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও পরিসংখ্যান বলছে, ২০৫০ সাল নাগাদ এশিয়া হবে পর্যটকদের অন্যতম গন্তব্য। তাই আমাদের লক্ষ্য ও কর্মপরিকল্পনা ঠিক করা উচিত কীভাবে আমরা নিজেদের প্রস্তুত করব ভবিষ্যতের জন্য। পর্যটনের যে বিপুল সম্ভাবনা এ অঞ্চলকে ঘিরে তৈরি হয়েছে, তার থেকে কীভাবে আমরা

লাভবান হবো, তা ঠিক করার এখনই উপযুক্ত সময়। পাশাপাশি ওআইসির মাধ্যমে আমাদের সামনে যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে একধাপ এগিয়ে যেতেই পারি।

চেয়ারম্যান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য