ছুটির ঘণ্টা

প্রকাশ : ১০ আগষ্ট ২০১৯

ছুটির ঘণ্টা

   ড. প্রতিভা রানী কর্মকার

আমাদের এই সুখ-দুঃখের সংসারে 'ছুটি' একটি অতি পরিচিত শব্দ। মানুষ মাত্রই 'ছুটি' পেতে পছন্দ করে। ছুটিতে আপনজনের সঙ্গে সময় কাটানো, গল্প করা, মনের জমানো ব্যথা ভাগাভাগি করার কোনো তুলনা হয় না। শুধু মানুষ নয়, প্রাণিকুলের মধ্যেও রয়েছে ছুটির আবেদন। যদিও হয়তো তারা বুঝতে পারে না 'ছুটি কী' কিন্তু অবসর পেলেই গুটিসুটি মেরে বা চোখ বন্ধ করে ঘুমায় বা স্থির হয়ে বসে থাকে। মনে হয় যেন রাজ্যের শান্তি ওদের মনে! ছুটির মাঝে কোনো পবিত্র উৎসব ছুটির আনন্দ বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। আর তাই ছুটির শুরু, ছুটি কাটানোর সময় বা ছুটির শেষ মুহূর্তটুকু যেন সবাই মিলে হাসি-আনন্দ আর নিরাপত্তায় কাটাতে পারি এবং সে জন্য কী কী প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন সেটাই আজকের সংক্ষিপ্ত আলোচ্য বিষয়।

বর্তমান সময়ে শহরের প্রতিদিনের কর্মব্যস্ত জীবন ছেড়ে গ্রামের দিকে বা আরেক শহরের দিকে যারা ছুটছেন তাদের শারীরিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ভ্রমণ শুরু করা দরকার। অনেকেই একদিনের ছুটিতে গাড়ির ছাদে বা ঝুলে অনিরাপদ ভ্রমণের সময় প্রাণ হারান। ছুটি তখন তাকে আপনজনের থেকে চিরতরে দূরে নিয়ে যায়। আর তাই আপনজনেরও বিবেচনা করা উচিত দূরে অবস্থান করা মানেই দূরে থাকা নয়। নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা গাড়ির চালক, ভ্রমণকারী, হেলপার, টিকিটদাতা সবাইকে মনে রাখতে হবে। যদিওবা যেতে হয় মনের টানে অথবা বিশেষ কোনো প্রয়োজনে- সঙ্গে রাখুন কাটা, আগুনে পোড়া, পানিতে ডুবে যাওয়া ইত্যাদির প্রাথমিক চিকিৎসার উপকরণগুলো, শিশুসহ সবার জন্য স্যালাইন, ওষুধ বা নিরাপদ শুকনো খাবার আর মনে রাখুন ছুটির আনন্দ। কারণ আনন্দ আমাদের জীবনে একটি অদৃশ্য মহৌষধ, যা মাঝেমধ্যে আমাদের দ্রুত সুস্থতা এনে দিতে পারে, যেখানে আতঙ্ক শুধুই অসুস্থ করে দিতে পারে। আর তাই আনন্দে আর কর্মমুখরতায় কাটান সময়, আতঙ্কে নয়।

এই নগরে আমরা যারা প্রয়োজনে, আরামে কিংবা অপ্রয়োজনে বসবাস করি এবং উচ্চ অট্টালিকা গড়ি তারা যেন নিজেদের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শহরটাকে ভালোবেসে ছুটির সময় নিজ নিজ ভবনের আশপাশটা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করি, প্রতিবেশীদের সঙ্গে দু-দণ্ড সুখ-দুঃখের কথা বলি- কেননা এগুলো আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়, পরিবেশকে করে বসবাসযোগ্য, যা ছুটির আনন্দও বাড়িয়ে দিতে পারে বহুগুণ। যেমন একই ছাদের নিচে বসবাস করেও আমরা ১০ জন মিলে ছাদের ওপরে বা আঙিনার ধারে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা পরিস্কার করতে পারি না; কারণ আমরা ভাবি, 'এটা ওর কাজ, আমি করব কেন?' কিন্তু সমাজ ও পরিবেশ কারও একার নয়- আপনার, আমার ও আমাদের। এখানে 'তাদের' বা 'ওনাদের' বলে চুপচাপ বসে না থেকে ছুটিকে বা কর্মদিবসের কোনো অবসরকে আসুন কাজে লাগাই।

ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ছুটি প্রচণ্ড উপভোগ্য। কিন্তু এটা ভুলে গেলে চলবে না ছুটি কিন্তু প্রস্তুতিরও সময়। যাদের ছুটির পর পরীক্ষা তারা অবশ্যই 'পড়াশোনা'কে ছুটি বলবে না। সোনার বাংলার সোনার ছেলেমেয়েদের এই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। প্রতিটি দিনকে কাজে লাগাতে হবে। তাই ছুটিতে আনন্দের পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ডও চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে, গ্রামের মানুষদের বিভিন্ন রোগব্যাধির প্রতিরোধ ও প্রতিকার, অশিক্ষা, কুসংস্কার, সামাজিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশের যত্ন ইত্যাদি সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। সবাই মিলে ভালো থাকলে তবেই না 'ছুটির' মজা। আসুন সবাই মিলে ছুটিকে উপভোগ্য করে তুলি।

পরিচালক ও সহযোগী অধ্যাপক আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা


মন্তব্য