আদিবাসী ভাষা ও বাংলাদেশ

প্রকাশ : ০৯ আগষ্ট ২০১৯

আদিবাসী ভাষা ও বাংলাদেশ

  সোহেল হাজং

আন্তর্জাতিকভাবে পালিত এ দিবসটির জন্য প্রতিবছরই একটি করে থিম বা প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করে দেয় জাতিসংঘ। জাতিসংঘের মহাসচিব প্রতিবারই এ দিবস ও প্রতিপাদ্য বিষয়ের ওপর বাণী দিয়ে থাকেন। জাতিসংঘ এবার আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করেছে 'ইন্ডিজেনাস ল্যাঙ্গুয়েজ' বা 'আদিবাসী ভাষা'। শুধু তাই নয়, ২০১৯ সালকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ 'আদিবাসীদের মাতৃভাষার আন্তর্জাতিক বর্ষ' ঘোষণা করেছে। বিশ্বের ৯০টি দেশের ৪০ কোটির অধিক আদিবাসী জনগণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য এ প্রতিপাদ্য বিষয়টির তাৎপর্য ব্যাপক।

বাংলাদেশে বসবাসকারী ৩০ লক্ষাধিক আদিবাসী জনগণ প্রতিবছরই এ দিবসটি পালন করে আসছে। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম জাতীয়ভাবে ঢাকায় এ দিবসটি উদযাপন করে থাকে। অন্যান্য সংগঠনও ঢাকা ও আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে দিবসটি উদযাপন করে। এ দিবসের মূল সুরের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করেছে, 'আদিবাসী ভাষা চর্চা ও সংরক্ষণে এগিয়ে আসুন'।

বাংলাদেশে ৫৪টির অধিক আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী রয়েছে। যারা ভিন্ন ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ধারণ করে চলে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট নৃভাষা বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার মাধ্যমে বাংলাদেশে ৪১টি ভাষার সন্ধান পেয়েছে। তারা বলেছে, সমীক্ষায় পাওয়া ভাষাগুলোর মধ্যে ১৪টি ভাষা বিপন্ন। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম মনে করে, বাংলাদেশে আদিবাসীদের বিপন্ন ভাষার সংখ্যা আরও বেশি।

আদিবাসীদের বর্তমান বাস্তবতায় এবারের মূল সুর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা আদিবাসীদের বঞ্চনার মাত্রা মাতৃভাষার বিপন্নতা থেকে শুরু করে ভূমি অধিকার, এমনকি বেঁচে থাকার অধিকার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পেরোলেও দেশের ৩০ লক্ষাধিক আদিবাসী জনগণ মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত রয়েছে। সম্পূর্ণ এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে আদিবাসী ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনধারাকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ক্রমাগতভাবে আদিবাসীদের ভূমি অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আদিবাসীদের মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা তো দূরের কথা, এখন আত্মপরিচয়, মাতৃভাষা ও নিজস্ব সংস্কৃতি নিয়ে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে। তারপরও আদিবাসী জনগণ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে।

আদিবাসী জাতিগুলোর জীবনধারা, মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার, আদিবাসী জাতিগুলোর ভাষা ও সংস্কৃতি তথা আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার সম্পর্কে সদস্য রাষ্ট্র, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, নাগরিক সমাজ, মিডিয়া, সংখ্যাগরিষ্ঠ অ-আদিবাসী জনগণ ও সংশ্নিষ্ট সবাইকে সচেতন করে তোলা এবং আদিবাসীদের অধিকারের প্রতি সমর্থন বৃদ্ধি করাই হলো আদিবাসী দিবস উদযাপনের মূল লক্ষ্য। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, আমাদের দেশে এই কাজগুলো বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব যেমন রয়েছে আবার রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটি উদযাপনেও কোনো উদ্যোগ লক্ষ্য করছি না। বরং 'আদিবাসী' শব্দ ব্যবহার এবং আদিবাসী দিবস অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণে সরকারি কর্মকর্তাদের নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি বিষয় আদিবাসীদের প্রতি সরকারের আন্তরিকতার জায়গাটি প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। আদিবাসী শব্দ ব্যবহারে ও আদিবাসী দিবস উদযাপনে কোনো অনীহা প্রকাশ না করে সরকারকে আরও সহযোগী হওয়া উচিত।

এবারের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়ে যেহেতু আদিবাসী ভাষা চর্চা ও সংরক্ষণের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে; তাই দেশের আদিবাসীদের মাতৃভাষা সংরক্ষণ ও বিকাশের মধ্য দিয়ে আদিবাসীদের আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা পালন করতে হবে। দেশের সরকারিভাবে মাত্র পাঁচটি আদিবাসী ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে, যা একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ; কিন্তু আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর মধ্য থেকে শিক্ষক নিয়োগ এবং যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাবে এটি ঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। তাছাড়া আদিবাসীদের সব অঞ্চলে এবং বাকি অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর জন্য এ শিক্ষাব্যবস্থা এখনও চালু হয়নি। এ বিষয়ে সরকারকে আরও এগিয়ে আসতে হবে। এসডিজি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আদিবাসী জনগণ এবং আদিবাসী সংগঠনগুলোর অর্থপূর্ণ অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

আদিবাসী ভাষার সঙ্গে আদিবাসীদের সংস্কৃতি, জীবন ব্যবস্থা ও আদিবাসী অধিকারের বিষয়টি সংশ্নিষ্ট। আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদানসহ আদিবাসীদের মাতৃভাষা সংরক্ষণ ও বিকাশের লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ে একটি আদিবাসী ভাষা ও সংস্কৃতি একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা উচিত। যেসব অঞ্চলে আদিবাসীরা বসবাস করে, সেসব অঞ্চলে তাদের ভাষা চর্চা ও উন্নয়নের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আদিবাসী সাংস্কৃতিক একাডেমিগুলো যাতে আদিবাসী ভাষা চর্চা, সংরক্ষণ ও বিকাশের জন্য কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে, তার জন্য বাজেট বরাদ্দসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি; আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে আদিবাসী ভাষা সংরক্ষণ ও বিকাশের লক্ষ্যে একটি সেল বা বিভাগ স্থাপন করা এবং আদিবাসী যোগ্য ও দক্ষ লোকের সমন্বয়ে একটি পরিচালনা পরিষদ গঠন করা যেতে পারে। আদিবাসী ভাষা সংরক্ষণ ও বিকাশে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে; এ পর্যন্ত মাত্র পাঁচটি আদিবাসী ভাষায় প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়েছে; কিন্তু কোথাও পৃথকভাবে আদিবাসী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। অবিলম্বে বিশেষ ব্যবস্থায় আদিবাসী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া উচিত। আরও পর্যায়ক্রমে অন্যান্য আদিবাসী ভাষায় প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষা চালুর ব্যবস্থা করতে হবে; শিক্ষার অধিকার মৌলিক মানবাধিকার। আদিবাসীদের শিক্ষা বিস্তারে সুস্পষ্ট উল্লেখসহ বিশেষ বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে। শিক্ষানীতির সুফল যাতে আদিবাসীরা ভোগ করতে পারে, তার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

কেন্দ্রীয় সদস্য, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম


মন্তব্য