সিকিম, কাশ্মীর এবং ইন্দিরা ও আবদুল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎকারের স্মৃতি

  হাসান শাহরিয়ার

সিকিমকে ভারতের অঙ্গরাজ্যে পরিণত করা আর ভারতশাসিত কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন ও 'বিশেষ অধিকার' বিলুপ্ত করে কেন্দ্রীয় শাসন জারির দৃশ্যপট অনেকটা একই রকম। সিকিমে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার পর 'রাজার নিরাপত্তা'র অজুহাত দেখিয়ে ভারত সামরিক অভিযান চালিয়েছিল। কাশ্মীরে নতুন করে ৩৫ হাজার সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। জম্মু, কাশ্মীর ও লাদাখে গিজগিজ করছে ভারতীয় সৈন্য। কোনো একটি অঞ্চলে এত অধিক সেনা মোতায়েনের ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিল। মনে হয়, গোটা কাশ্মীরই বুঝি-বা একটি গ্যারিসন। 'নিরাপত্তা জোরদার' করার অজুহাতে কাশ্মীরি নেতাদের গ্রেফতার করে জারি করা হয়েছে ১৪৪ ধারা, নিষিদ্ধ করা হয়েছে সভা-সমাবেশ। সিকিম দখল করতে ভারতীয় সেনারা রাজপ্রাসাদের সামনে গুলি চালিয়েছিল এবং অর্ধঘণ্টার অপারেশনে ২৪৩ জন প্রহরী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। এর পরই রাজপ্রাসাদের শীর্ষে শোভা পায় ভারতের পতাকা। ভারত বহির্বিশ্বের সঙ্গে সিকিমের সব রকমের যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়ে তৎকালীন দূত বিএস দাসকে সিকিমের প্রধান প্রশাসক নিয়োগ করে। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা 'র'-এর প্রাক্তন পরিচালক অশোক রায়না তার 'ইনসাইড স্টোরি অব ইন্ডিয়াস সিক্রেট সার্ভিস' শীর্ষক গ্রন্থে বলেছেন, ভারত ১৯৭১ সালেই সিকিম দখল করতে চেয়েছিল। সেই লক্ষ্যে সিকিমে আন্দোলন, হত্যা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করা হয়। চীন সীমান্তে নেপাল, সিকিম ও ভুটান- এই তিন রাষ্ট্রের স্বাধীন ভারত কৌশলগত কারণে নিরাপদ মনে করেনি। সাংবাদিক সুধীর শর্মা প্রধানমন্ত্রী কাজি লেন্দুপ দর্জির উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, 'সিকিম মিশন'-এর প্রধান চালিকাশক্তি ছিল 'র'।

ব্রিটিশ আমলে সিকিম ছিল একটি আশ্রিত রাজ্য। ইন্দিরা সরকার সিকিমকে ভারতে অঙ্গীভূত করার লক্ষ্যে লোকসভায় একটি বিল উত্থাপন করে ১৯৭৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। বিলটি ৩১০-৭ ভোটে পাস হয়। এর দেড় মাস পর দৈনিক ইত্তেফাকের পক্ষ থেকে নয়াদিল্লিতে আমি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। তাকে বলেছিলাম, 'আপনি তো স্বাধীন রাজ্য সিকিম দখল করে নিয়েছেন।' একটু খেপে গিয়ে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, 'কে বলে?' বললাম, 'সারাবিশ্ব।' তিনি বললেন, 'না, শুধু সেই আমেরিকান মহিলা (চোগিয়ালের স্ত্রী) তা বলে বেড়াচ্ছে।' অবশেষে সংবিধান সংশোধন করে ১৯৭৫ সালের মে মাসে সিকিমকে ভারতের একটি অঙ্গরাজ্যে রূপান্তরিত করা হয়।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত কাশ্মীর ছিল হিমালয় পর্বত ও পীর পাঞ্জাল পাহাড়ের মধ্যবর্তী একটি উপত্যকা। কাশ্মীরের প্রথম মুসলমান শাসক ছিলেন শাহ মীর (১৩৩৯)। পরবর্তী পাঁচশ' বছর মুসলমানরা কাশ্মীর শাসন করে। ১৮২০ সালে শিখ রাজা রঞ্জিৎ সিং কাশ্মীর দখল করে তাকে তার রাজ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করেন। তিনি গোলাব সিং দোগরাকে জায়গির হিসেবে জম্মু প্রদান করেন। গোলাব সিং ছিলেন অত্যন্ত চতুর প্রকৃতির লোক। তিনিই জম্মু ও কাশ্মীরের সর্বশেষ মহারাজা হরি সিংয়ের পূর্বপুরুষ। রঞ্জিৎ সিংয়ের মৃত্যুর পর প্রকাশ্যে শিখদের সঙ্গে থাকলেও গোপনে তার আনুগত্য ছিল ইংরেজদের প্রতি। তার কারসাজি ধরা পড়ে গেলে শিখ দরবার তাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করে। যা হোক, প্রথম ইংরেজ-শিখ যুদ্ধে শিখরা পরাজিত হলে জম্মুর হিন্দু শাসক গোলাব সিং দোগরা ১৮৪৬ সালে পুরস্কার হিসেবে লাভ করেন জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য। অবশ্য এ জন্য তিনি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ৭৫ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। তার উত্তরসূরিরা ছিলেন রণবীর সিং, প্রতাপ সিং ও হরি সিং।

ভারত বিভাজনের সময় কাশ্মীর ও সিকিমসহ করদ বা দেশীয় রাজ্য ছিল ৬৮০টি। তাদের ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। অবশ্য চাইলে তারা স্বাধীন হিসেবেও থাকতে পারবে। বেশিরভাগ মুসলমান রাজ্য পাকিস্তানে ও হিন্দু রাজ্যগুলো ভারতে যোগ দেয়। বেলুচিস্তানের কালাত করদ রাজ্য ১৯৪৭ সালের ১১ আগস্ট স্বাধীনতা ঘোষণা করে। কিন্তু ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে তাকে পাকিস্তানে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। হিন্দুপ্রধান হায়দরাবাদ দেশীয় রাজ্যের মুসলমান নিজামও স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। কিন্তু সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ভারত তা দখল করে নেয়। গুজরাটের দক্ষিণ-পশ্চিমে ছিল জুনাগড় করদ রাজ্য। রাজ্যের শাসক নওয়াব মহবত খান ১৫ আগস্ট পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলে ভারত আপত্তি জানায়। কারণ জুনাগড়ের ৮০ শতাংশ লোক হিন্দু এবং এই রাজ্যের সীমানা পাকিস্তানের সঙ্গে লাগোয়া ছিল না। পাকিস্তান একে ভারতে পাকিস্তানের একটি ছিটমহল হিসেবে গণ্য করতে বলল। কিন্তু ভারত তা গ্রাহ্য না করে জুনাগড়ে সৈন্য পাঠায়। ১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর নওয়াব পালিয়ে পাকিস্তানে চলে যান এবং ৭ নভেম্বর নওয়াবের দেওয়ান স্যার শাহনওয়াজ ভুট্টো ভারতের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। শাহনওয়াজ ভুট্টোর ছেলে জুলফিকার আলি ভুট্টো ও নাতনি বেনজির ভুট্টো পরবর্তীকালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। ভারত শাহনওয়াজ ভুট্টোর আহ্বানে ৯ নভেম্বর (১৯৪৭) জুনাগড় দখল করে নেয়।


ঠিক ওই সময়েই জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। এই রাজ্যের অধিকাংশ লোক ছিল মুসলমান আর রাজা হিন্দু। ভাগাভাগির সময় কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিং ভারত বা পাকিস্তানে যোগ না দিয়ে স্বাধীন হিসেবে থাকার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু কোনো কোনো ইতিহাসবিদ বলেছেন, মহারাজা নাকি ভারতে যোগদানের জন্য নয়াদিল্লির সঙ্গে গোপনে শলাপরার্শ করছিলেন। তখন পুঞ্চ এলাকায় মুসলমানরা বিদ্রোহের পথ বেছে নিলে রাজা মুসলমানদের ওপর অত্যাচার ও গণহত্যা শুরু করলেন, তাদেরকে তাড়িয়ে দিতে লাগলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল অধিক হারে মুসলমান চলে গেলে অচিরেই কাশ্মীর হিন্দুপ্রধান হয়ে যাবে। ১৯৪৭ সালের আগস্টে ভারত বিভক্তির দুই মাস পর অক্টোবরে পাকিস্তানি মদদে উপজাতীয়রা কাশ্মীর আক্রমণ করে। ২৫ অক্টোবর তারা বড়মুলা দখল করে। সেখান থেকে গ্রীষ্ফ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগরের দূরত্ব মাত্র ৩৫ কিলোমিটার। কিন্তু তারা রাজধানী ও তার অরক্ষিত বিমান ঘাঁটি কবজায় আনার কোনো চিন্তা না করে সেখানেই দু'দিন কাটিয়ে দেয়। চার্লস শেভনিক্স ট্রেঞ্চের মতে, তারা লুটতরাজ, হত্যা ও নারী ধর্ষণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, লোভ-লালসার জন্য তারা কিছুই করতে পারেনি (দ্য ফ্রন্টিয়ার স্কাউটস)। কাশ্মীরের নিরাপত্তা বাহিনী অত্যন্ত দুর্বল ছিল এবং পাকিস্তানিদের সঙ্গে যুদ্ধ করার মতো তেমন কোনো অস্ত্রশস্ত্রই তাদের ছিল না। মনোবলও দৃঢ় ছিল না। মহারাজা ভাবলেন, পাকিস্তানিরা যদি কাশ্মীর দখল করে নেয়, তাহলে তাকে পাকিস্তানে যোগ দিতে হবে। তখন তিনি ভারতের দিকে তাকালেন। অনুরোধ করলেন কাশ্মীর রক্ষার জন্য সৈন্য পাঠাতে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু তাৎক্ষণিক সৈন্য পাঠাতে রাজি ছিলেন; কিন্তু বিচক্ষণ গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটন রাজা হরি সিংকে সৈন্য পাঠানোর আগে ভারতে যোগ দেওয়ার পরামর্শ দিলেন। ২৬ অক্টোবর হরি সিং ভারতে সংযুক্তকরণ চুক্তি স্বাক্ষর করেন। দু'দিন পর যখন উপজাতীয়রা শ্রীনগরের দিকে যাত্রা শুরু করে, তখন কাশ্মীরে ভারতীয় সৈন্য পৌঁছে গেছে। এখন কাশ্মীরের আর একক মালিক নেই, মালিকানা চলে গেছে তিন দেশের হাতে। ভারতের দখলে আছে ৪৩ শতাংশ, পাকিস্তানের ৩৭ শতাংশ এবং চীনের ২০ শতাংশ। কাশ্মীরে ভারত ও পাকিস্তান যুদ্ধ করেছে তিনবার-১৯৪৭, ১৯৬৫ ও ১৯৯৯ সালে। তিনবারের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে উভয় পক্ষের ৪৭ হাজার লোক মারা গেছে।

ভারত সরকারের নতুন পদক্ষেপের ফলে কাশ্মীরে জনজীবন থমকে গেছে; সর্বত্র বিরাজ করছে চরম আতঙ্ক। কাশ্মীরি নেতা শেখ আবদুল্লাহ ১৯৭৪ সালের অক্টোবর মাসে আমার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন ও 'বিশেষ অধিকার' চিরদিন বজায় থাকবে। কাশ্মীর এখন আর কোনো রাজ্য নয়, ভারতের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে স্বায়ত্তশাসন এবং বিশেষ অধিকার। নিজস্ব কোনো পতাকা থাকবে না। আজ শেখ আবদুল্লাহর নাতি সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ কারাগারে। বেঁচে থাকলে তিনিও হয়তো গৃহবন্দি হতেন।

ভারতের শাসক দল বিজেপি বরাবরই কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন এবং বিশেষ অধিকারের বিরোধিতা করেছে। এখন যে কোনো ভারতীয় কাশ্মীরে জমি কিনতে পারবে। কিন্তু মিজোরামসহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে তো পারে না। তাহলে কাশ্মীরিদের শায়েস্তা করার লক্ষ্যেই কি এই ব্যবস্থা? ভারতের বিরোধী দলগুলো এবং বিশ্নেষকরা এর বিরোধিতা করে বলেছেন, পরিণাম শুভ হবে না। কাশ্মীরের ভাগ্যে কী আছে, তা শুধু ভবিতব্যই জানে। এই পদক্ষেপের জের ধরে উপমহাদেশে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে তার দায় ভারতের।

প্রবীণ সাংবাদিক, কলাম লেখক ও বিশ্নেষক; সিজেএ ইন্টারন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট ইমেরিটাস ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের প্রাক্তন সভাপতি


মন্তব্য