মশা-রাজনীতির অর্থনীতি

সমকালীন প্রসঙ্গ

প্রকাশ : ০৮ আগষ্ট ২০১৯

মশা-রাজনীতির অর্থনীতি

  আমিরুল আলম খান

পুঁজিবাদের গুরু তিনি। স্মিথ সাহেব। বলেছিলেন মোক্ষম কথাটিই :সব সম্পদের পেছনের ইতিহাসই লুটপাটের। আর সে লুটপাট চরমে ওঠে পুঁজি সঞ্চয়ের আদি পর্বে। আমরা নাকি এখন সে পর্ব অতিক্রম করছি। সুতরাং এ পর্বে লুটপাট ফরজ। কে করে লুটপাট? ডারউইনের বিবর্তনতত্ত্বেও তার ব্যাখ্যা মেলে। যার জোর আছে। তত্ত্বটা নিশ্চয়ই আরও প্রাচীন। কে প্রথম বলেছিলেন, এ অধম তার হদিস করতে পারেনি। কিন্তু বচনটি অমৃত সমান- জোর যার, মুলল্গুক তার।

তবে স্মিথ সাহেব দেখেছিলেন মার্কেন্টাইল পুঁজি। সে ছিল প্রথম শিল্প বিপল্গবের কাল। আমরা এখন চতুর্থ শিল্প বিপল্গবের দ্বারে। এ কালের করপোরেট পুঁজির হাঁ দেখলে তিনি নিজেই হাঁ হয়ে যেতেন। বিল গেটসের নাম তিনি কল্পনাও করেননি! মার্ক্স সাহেবের কল্পনায়ও বিলের জায়গা মেলেনি!

তা লুটপাটে মওকা লাগে। সাহস লাগে। তেজ লাগে। না হলে মওকা হারিয়ে যায়। কেবল যাদের জোর আছে, মানে ক্ষমতা আছে, তাদেরই সে মওকায় মৌরসি-পাট্টা। এই পাট্টাদারদের মওকা ফিরে ফিরে আসে। যেমন- খুব গরম পড়লে পাখাওয়ালাদের, এসিওয়ালাদের; শীত পড়লে লেপ-কম্বলওয়ালাদের; রোগ-বালাই বাড়লে ডাক্তার, ক্লিনিক, হাসপাতালের ব্যবসা জমজমাট হয়।

রোজা, ঈদ, পূজায় বণিকদের পোয়াবারো। খরা, বন্যায় সাধারণ মানুষ ভোগে, দুর্ভিক্ষে তারাই মরে। কিন্তু এসব সময় বরাত খোলে কিছু লোকের। তারা বরাতি আদম। সে দলে আছে রাজনীতির পেয়াদা-পাইক, নানা দপ্তরে নানা মাপের কেরানি, দালাল আর সবার ওপর বণিক গোষ্ঠী। যুদ্ধই হোক আর খোদার গজবই হোক, লাখো লাখো মানুষের কপাল না পুড়লে গুটি কয়েক লোকের বরাত খোলে না। এবারও বরাত খুলেছে কিছু লোকের। আদতে এরা সবাই বেনেতি। ঢাকায় আড়াই কোটি মানুষের ঘুম হারাম। দেশের ১৭ কোটি লোকেরও একই দশা। ওদিকে লাল হচ্ছে বণিক গোষ্ঠী আর তাদের চক্রটি। কে জানত, অতি ক্ষুদ্র মশা তাদের কপাল খুলে দেবে?

বাজারে এখন মশারি, কয়েল, অ্যারোসল, মর্টিন, ব্লিচিং পাউডার, ডেঙ্গু কিটস, প্যারাসিটামল, স্যালাইনের রমরমা ব্যবসা। ওদিকে যারা এলসি নিয়ে ব্যস্ত, তাদের নজর দুনিয়ার বিষ বেপারীদের গুদামে, কারখানায়। বিষ বানানো বিজ্ঞানীদেরও ভালো মওকা এটা। ব্যাংক, জাহাজের কারবারি, ঠিকাদারদের এখন পৌষ মাস। সরকারি দপ্তর, করপোরেশনের 'কাজের কাজি'দের সুখের বন্যা।

রোম যখন পুড়ছিল, সম্রাট নিরো নাকি তখন বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। তিনি সুখী মানুষ। তাই সুখ তাকে কখনও ত্যাগ করে না। সম্রাটের মনে নিশ্চয়ই তখন আনন্দের ফল্কগ্দুধারা বইছিল। প্রজা মরলে, নগর পুড়লে সম্রাটের কী? তিনি তো কারও ঘরে আগুন দেননি? সম্রাট তো সুখের পেছনে ছোটেন না। সুখই ছোটে সম্রাটের পিছু পিছু।

রোমের সম্রাট নিরো যাই ভাবুন, করিন্থ নগরের কেচ্ছা কিন্তু একেবারেই আলাদা। সে কথা অমর করেছেন হোমার। তা থেকে সফোক্লিস লিখেছেন ইদিপাস। গ্রিকদের শ্রেষ্ঠ কাহিনীশিল্প। নগরে পেল্গগের প্রাদুর্ভাব কার পাপে? প্রশ্ন উঠেছিল সেটাই। জমাট কাহিনীতে উন্মোচিত হয় আদি পাপের রঙ্গলীলা।

সে নাকি ললাটলিখন। দেবতাদের ইচ্ছার ফসল। সেখানে তাই ওরাকল ছিল। এ যুগে কি ওরাকল নেই? আছেই তো। চোখ-কান থাকলেই বুঝত অন্ধ নিয়তিবাদীরা, এ যুগেও ওরাকল আছে। মিডিয়া। আগেভাগেই মিডিয়া জানিয়ে দিয়েছিল, 'বর্ষাকাল আসছে, দুর্যোগ আসন্ন। হুঁশিয়ার হও।' কেউ শোনেনি, গা করেনি। একেবারে গা করেনি তাই-বা বলি কী করে? জিহ্বার বিষে তারা হামলে পড়েছিল। 'ষড়যন্ত্র! সব ষড়যন্ত্র! এরা সব চেতনাবিরোধী, পাকি দালাল।' হুকুমও জারি করেছিল পাতিরা :এরা পাকে চলে যাক! ভুলে যায় এরা, 'অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ হয় না।'

বোকারাই শুধু গান ধরে, 'সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু, আগুনে পুড়িয়া গেল।' তা আহাম্মক না হলে কেউ সুখের পেছনে ঘোরে! ঘর তো তাদের পুড়বেই। যে আহাম্মকরা নিজেদের ঘরদোর আগুন থেকে বাঁচাতে পারে না, তাদের বস্তিতে আগুন লাগাই তো স্বাভাবিক। এই যেমন আমাদের রাজধানী ঢাকা। বছরে কতবার পোড়ে, কত আদম পুড়ে মরে, আর কত যে নিঃস্ব হয়, সে খবর কে রাখি?

বাংলাদেশ তো প্রজাতন্ত্র। আমরা কেউ নাগরিক নই, প্রজা। আমরা যদি প্রজা হই তো জমিদার, রাজাও আছেন, আছেন সম্রাট বাহাদুরও। মহাপরাক্রমশালী তারা। তাদের আঙুলের ইশারায় হয় না এমন কিছু মর্ত্যলোকে নেই। আছেন তারা বহাল এবং তবিয়ত যে খুশদিল, তা তাদের বচন থেকেই বুঝি আমরা।

একাত্তরের পর গোটা দেশে এমন ভয় ছড়িয়ে পড়েনি কখনোই। পয়লা পয়লা ভয়ে ছিল রাজধানীর মধ্যবিত্ত। তারাই তো আসল হুজুকে। আমাদের ডঙ্গা দপ্তর তা জানান দিয়েছে মাইক বাজিয়ে। খোকন সাহেব তো চটে লাল। তার রাজ্যে ফাজলামি! কথা একটাই, সব চক্রান্ত। কার চক্রান্ত? কার বিরুদ্ধে চক্রান্ত? কেন সে চক্রান্ত? জবাব নেই। এলানমন্ত্রীর গলা বড়। তিনিই হাঁকেন জোরে জোরে। তার সঙ্গে লেঠেল সরদার।

এ জমিদারিতে শুধু লেঠেল আছে। জমিদার রাজাদের পোষ্য তারা। তাদের সঙ্গে হুক্কা হুয়ারা। ডেঙ্গু ডেঙ্গু বলে চেঁচিয়ে চেঁচিয়েই নাকি ডেঙ্গু এনে দেশ রসাতলে! না, রসাতলে কেন? ওই যে স্মিথ সাহেব বলে গেছেন, আয়-উন্নতিতে লুটপাট ফরজ। এখন এরা ফরজ আদায়ে ব্যস্ত। দেদার লুটের সুযোগ মিলিয়ে দিয়েছে এডিস মশা। পারলে পূজা দিত, দেবতা বানিয়ে। লক্ষ্মী মা এখন তেমন কাজের না। তার চেয়ে এডিস ভালো। ক'দিনেই লালে লাল হওয়ার মওকা মিলিয়ে দিল। এখন একটা বড় মূর্তি বানিয়ে করপোরেশনের সদর গেটে বসিয়ে দিয়ে ধূপধুনা দিয়ে পূজা দিলেই হবে।

তা ২০১৯ খ্রিষ্টবর্ষে বঙ্গদেশে রাজনীতির, মশক অর্থনীতি- কতটা মোটাতাজা হলো তার একটা তামাম শুদ্ধ হলে এ অধমের চোখ খুলত।

যশোর শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান


মন্তব্য