কাশ্মীর সংকট ও বাংলাদেশ

প্রকাশ : ০৭ আগষ্ট ২০১৯

কাশ্মীর সংকট ও বাংলাদেশ

  ড. আকমল হোসেন

৫ আগস্ট কাশ্মীর বিষয়ে ভারতীয় রাজ্যসভায় যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, তা তিনটি দিক থেকে পর্যালোচনা করা যেতে পারে। প্রথমত, এই সিদ্ধান্তটি কতখানি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে গৃহীত হলো! দ্বিতীয়ত, বিজেপির যে হিন্দু জাতীয়তাবাদী এজেন্ডা কীভাবে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে দলটিকে প্রভাবিত করেছে। তৃতীয়ত, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কাশ্মীরের যে বিশেষ মর্যাদা রদ করা হলো, তাতে কি ভারতে স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে?

১৯৪৭ সালে যখন কাশ্মীর ভারতের অঙ্গীভূত হয়েছিল, তখনও জনগণের কোনো সম্মতি ছিল না। ভারতবর্ষ বিভক্তির সময় ব্রিটিশ শাসকরা দেশি রাজ্যগুলোর ব্যাপারে তাদের স্বাধীন সত্তা ধরে রাখা অথবা ভারত-পাকিস্তান ডমিনিয়নে যোগদানের এখতিয়ার দিয়েছিল। সে সময় কাশ্মীরের মহারাজা পাকিস্তানের দিক থেকে তার শাসনের প্রতি হুমকি উপলব্ধি করে ভারতে যোগদানের ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং ইনস্ট্রুমেন্ট অব এক্সপ্রেশন স্বাক্ষর করেন। এরপর ভারত তার সৈন্য প্রেরণ করে কাশ্মীরকে ভারতের ভূখণ্ডে অঙ্গীভূত করে নেয়। কাশ্মীরের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে কোনোরকম আলোচনা করা হয়নি। তাদের মত নেওয়া হয়নি। কাশ্মীরে যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান ছিল, তারা এভাবে ভারতভুক্তি মেনে নেয়নি এবং পরবর্তীকালে ভারত-পাকিস্তান (১৯৪৮) যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়, সেই যুদ্ধের ফলে ভারত কাশ্মীরের দুই-তৃতীয়াংশের নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। অন্যদিকে পাকিস্তান এক-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে যে রাজনীতিকরা ছিলেন, তারা ভারতভুক্তির বিরুদ্ধে ছিলেন। বিশেষ করে শেখ আবদুল্লাহ এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতার কারণে দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলেন। ১৯৫০ সালে ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ বিষয়টিকে বিবেচনা করে দু'দেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল একটি গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার। কিন্তু সেই গণভোট আর কখনোই অনুষ্ঠিত হয়নি। অপরপক্ষে ভারত কাশ্মীরকে একটি স্বতন্ত্র মর্যাদা দান করার জন্য কাশ্মীর রাজ্য সরকারকে কিছু বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছিল। ভারতের অন্য কোনো রাজ্যকে এমনটি দেওয়া হয়নি। সে সময় কাশ্মীরের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব তুলে ধরার জন্য সংবিধান, পতাকা, প্রধানমন্ত্রী পদ ইত্যাদি দিতে কেন্দ্রীয় সরকার সম্মত ছিল। কাশ্মীরের যেসব নেতা ভারতভুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন, তারাও পরবর্র্তীকালে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাশ্মীর শাসন করেছেন।

কিন্তু ৫ আগস্ট ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজ্যসভায় যে ঘোষণা দিলেন এর মাধ্যমে কাশ্মীরের যতটুকু স্বায়ত্তশাসন ছিল, তাও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ঘোষণাটি হঠাৎ করে এলেও কাশ্মীরি জনগণের কাছে একদম অপ্রত্যাশিত ছিল, তা বলা যাবে না। গত কিছুদিন ধরে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার কাশ্মীর নিয়ে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তা এই কেড়ে নেওয়াকেই ইঙ্গিত করছিল। সেখানে সেনা মোতায়েন করা হলো এবং অমরনাথ তীর্থযাত্রা বন্ধ করে দেওয়া হলো। পর্যটকদের দ্রুত কাশ্মীর ত্যাগ করার নির্দেশ দেওয়া হলো। তাতে বোঝা যায়, কাশ্মীরের পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে- এই চিন্তাটা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ছিল। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, আমজনতা তো দূরের কথা, কাশ্মীরের প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে পর্যন্ত কোনো পূর্ব আলোচনা করা হয়নি। এমনকি ভারতীয় সংসদে (লোকসভায়) এ নিয়ে আলোচনা হয়নি। সংসদে আলোচনা হলে এই ইস্যুতে বিরোধিতা যে খুব হতো, তাও মনে হয় না। যখন এই ঘোষণা দেওয়া হলো, তখন সরকার বিরোধীদের কেউ কেউ সমর্থন জানিয়েছেন। কোনো ধরনের আলাপ-আলোচনা না করার ইচ্ছা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত এবং একগুঁয়েমি আচরণ বলা যেতে পারে।

বিজেপির হিন্দু জাতীয়তাবাদের যে রাজনৈতিক এজেন্ডা, সেটি আমরা লক্ষ্য করেছি ২০১৪ সালে। এই এজেন্ডার মধ্যে আমরা বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছি মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি ক্রমবর্ধমান অসহিষুষ্ণতা। এটি আমরা প্রথমে গোরক্ষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর বিভিন্ন সময় যে আক্রমণ হয়েছে, তা-ই আমাদের মনে করিয়ে দেয়। কাশ্মীর ভারতের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র এবং বিশেষ প্রেক্ষাপটে তাকে যে স্বতন্ত্র ক্ষমতা বা মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল, বিজেপির কাছে তা গ্রহণযোগ্য ছিল না। গত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রচারে অন্যতম একটি বিষয় ছিল, কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা সম্পর্কিত সংবিধানের ৩৭০ ধারা বিলোপ করা।

নির্বাচনে বিজেপির আরেকটি এজেন্ডা ছিল আসামে এনআরসি বাস্তবায়ন করা। এনআরসিতে ইতিমধ্যে যে ৪০ লাখ মানুষকে ভারতের নাগরিক নয় বলে বলা হয়েছে,এর বিপুল অংশই হচ্ছে মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত এবং তথাকথিত 'বাংলাদেশি'। বিজেপি তার নির্বাচনী প্রচারের প্রথম কাজটিই ৫ আগস্ট করেছে। পরবর্তী আর একটি বিষয় (এনআরসি) কীভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং বাংলাদেশের ওপর কী অভিঘাত ফেলবে, তা গভীর ভাবনার বিষয়। এ ব্যাপারে বাংলাদেশেরও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো এবং সতর্ক থাকাটা জরুরি। বিষয়টি কোনোভাবেই হেলাফেলার নয়। এই এনআরসি বিষয়ে ভারতের রাজনীতিতেও বিরূপ প্রভাব পড়েছে।

কাশ্মীরে একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে এবং বিচ্ছিন্নতাবাদীরা অস্ত্রবলে কাশ্মীরকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়। তাদের এই তৎপরতাকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে কাশ্মীরে স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট প্রয়োগ করে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করেছে। কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে ভারতীয় সেনাদের সংঘাত-সংঘর্ষে এ পর্যন্ত প্রাণহানি কম ঘটেনি। বর্তমানে যখন নতুন একটি পরিস্থিতি তৈরি হলো, তখন বিচ্ছিন্নবাদীদের তৎপরতা নতুন উদ্যমে বাড়তে পারে। এর মোকাবেলায় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সামরিক শক্তি আরও বাড়াবে। সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতনের মাত্রাও বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর বাইরেও অন্য জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী যাদের পেছনে পাকিস্তানের পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ রয়েছে, তারাও উজ্জীবিত হবে বলে মনে করার কারণ আছে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং ইতিমধ্যে জঙ্গিবাদে আক্রান্ত বাংলাদেশও এই প্রভাব থেকে দূরে থাকতে পারে না।

সবশেষে কাশ্মীরের মর্যাদা হ্রাস করে কেন্দ্রশাসিত দুটি অঞ্চল করার মাধ্যমে ভারতের কেন্দ্রীয় শাসকরা হয়তো রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে একধাপ অতিক্রম করলেন। কিন্তু শেষ বিচারে তা ভারতীয় জনগণের স্বার্থের পক্ষে যাবে না। কেননা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করার নামে কাশ্মীরে সেনা উপস্থিতি বজায় রাখার ফলে অর্থনীতির ওপরও চাপ আরও বাড়বে। সেনা শক্তি দিয়ে জনক্ষোভ মেটানো যায় না। ভারতের লাখ লাখ শান্তিবাদী প্রগতিশীল মানুষও এই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট বলে মনে হয় না। শঙ্কা রয়েছে উপমহাদেশজুড়ে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ার।

অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য