পাকিস্তান নিশ্চুপ থাকতে পারে না

প্রকাশ : ০৭ আগষ্ট ২০১৯

পাকিস্তান নিশ্চুপ থাকতে পারে না

  আসাদ রহিম খান

ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু একদা লিখেছিলেন- 'ভারতের কথা চিন্তা করলে আমি অনেক কিছুই ভাবি। এমনকি বসন্তে কাশ্মীরের পাহাড়ি উপত্যকাও তার বাইরে নয়। যেটি নতুন ফুলে আচ্ছাদিত। এর মধ্যে কলকল ছন্দে বয়ে গেছে একটি ছোট স্রোতস্বিনী।' নেহরুর কথাগুলোর নতুন অর্থ আজ খুঁজে পাওয়া যাবে। নেহরু তার কথা এভাবে সমাপ্ত করেন- 'আমরা আমাদের পছন্দের বিষয়গুলোর ছবি তৈরি ও সংরক্ষণ করি'- এটা ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর জন্যই মানানসই, আজকের জন্য নয়।

ভারতের সামরিক বাহিনী যখন স্রোতের মতো কাশ্মীরে প্রবেশ করছে, তখন নেহরু নিশ্চয়ই ছলছল চোখে তার শিকারদের দেখছেন এবং জাতিসংঘের নিয়ন্ত্রণে একটি গণভোটের আকুতি জানাচ্ছেন- 'কাশ্মীরের জনগণই ঠিক করবে, তারা কোথায় যাবে।' ১৯৪৮ সালের ২৮ অক্টোবর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে টেলিগ্রামে আরও লেখেন, 'তাদের নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে তারা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেবে।'

যদিও এর পর ৭০ বছর ধরে কাশ্মীরের মানুষকে কখনোই সে স্বাধীনতা দেওয়া হয়নি। আজ সে কাশ্মীর একটি উন্মুক্ত হত্যার কেন্দ্র। এ উপত্যকায় রয়েছে গণকবর আর গণঅন্ধত্বের শিকার হয়েছে এখানকার মানুষ। যেখানে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে শিশুরা ধর্ষণের শিকার, যেখানে বেসামরিক লোকদের যারা জিপে বেঁধে টানতে পারবে, তাদের সাহসিকতার পুরস্কার দেওয়া হয়। ভারতের এ রকম নানা নৃশংসতার সাক্ষী রয়েছে অনেক কিছুই। এটিই নরেন্দ্র মোদিকে পরবর্তী ধাপের সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছে। এ সেই নরেন্দ্র মোদি, যিনি কখনোই মুসলমানদের গণহত্যার দায় থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারবেন না।

আসলে কেউই বুঝতে পারেনি হিন্দুত্ববাদী প্রকল্প এত দ্রুত বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে! এ বছরের নির্বাচনে ভারতের বিজেপির ইশতেহারে এ ধারা তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে এভাবে- আমরা জনসংঘের সময় থেকেই যেটি বলে এসেছি, ৩৭০ ধারা বাতিলের মাধ্যমে তারই বাস্তবায়ন করব। জনসংঘের বিষয়টি সামনে এনে বিজেপি মূলত নাৎসি আরএসএসের চক্রান্তই সামনে নিয়ে এসেছে। এ ইশতেহারের মাধ্যমে যখন বিজেপি পুনরায় ক্ষমতায় আসে তখন তারা দ্রতই তা বাস্তবায়নে উঠেপড়ে লাগে। ৩৭০ ধারা বাতিলের প্রভাব হবে ভূমিকম্পের মতো। দীর্ঘমেয়াদে ভারত যে একটি গণতান্ত্রিক দেশ- সে ধারণাই মুছে যাবে। তাহলে ভারতের লাভ আসলে কী হবে? এখন ভারতীয় সেটলাররা কাশ্মীরে দখল কায়েম করতে পারবে, কাশ্মীরে জায়গা কেনাসহ সেখানকার ভূমির অধিকার লাভ করবে। ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর দখলে ইসরায়েলি ফর্মুলার মতোই সংঘ পরিবার স্বপ্ন দেখছে চিরতরে কাশ্মীরের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ডেমোগ্রাফি পাল্টে দিতে। সেখানে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ করে হিন্দুত্ববাদের শাসন কায়েমের স্বপ্ন তাদের।

কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি বলেছেন, 'সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ রদের মাধ্যমে কেবল কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদাই বাতিল হয়নি, এটি বরং জম্মু ও কাশ্মীরে ভারতীয় কমাবে।' কিন্তু মেহবুবা মুফতি ভুল বলেছেন। ভারত সব সময় কাশ্মীরে দখল কায়েম চালিয়ে এসেছে। এখন ৩৭০ ধারা রদ মানে নরেন্দ্র মোদি সেই দখল আরও জোরদার করবেন।

এর অর্থ এটাও, ১৯৭২ সাল থেকে নয়াদিল্লি সিমলা চুক্তির নামে যে কার্ড খেলে এসেছে, তারও পরিসমাপ্তি। সিমলা চুক্তির কথা বলে ভারত এতদিন তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা বাতিল করেছে, যেটা দ্বিপক্ষীয় সমঝোতাকে উৎসাহিত করে। সেটা কেবল সিমলা চুক্তিতেই নয়, বরং জাতিসংঘ অন্তর্ভুক্ত। এমনকি ভারত তার নিজস্ব সংবিধানেরও ব্যত্যয় ঘটিয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীরের ভূমির ব্যাপারে সেখানকার যে অনুমতির কথা সংবিধানে বলা হয়েছে, এখানে সেটি করা হয়নি। কারণ এ ক্ষেত্রে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বদলে কেবল গভর্নরের কাছ থেকে অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। অথচ গভর্নর হলেন কেন্দ্রের প্রতিনিধি, যা সম্পূর্ণ অবৈধ।

চূড়ান্তভাবে এখানে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে অকল্পনীয়ভাবে। ১৯৪৮ সালের জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সনদ অনুযায়ী একটি গণভোট আয়োজনের কথা বলা হয়েছে; এর পর ১৯৪৯ সালের জাতিসংঘ ভারত-পাকিস্তান অবজার্ভেশন মিশন বা ইউএনসিআইপির ১৯৪৯ সালের সনদে নাগরিকের রাষ্ট্র বেছে নেওয়ার স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে এবং ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশনে অধিকৃত দেশের ভূমি দখলে নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছে। ভারত তার ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল দ্বারা এ সবক'টির বাধ্যবাধকতার সীমা অতিক্রম করেছে।

পাকিস্তানকে কাশ্মীরের পাশে দাঁড়িয়ে বিশ্ববাসীকে বিষয়টি জানানোর এখনই সময়। মোদি তার হিন্দুত্ববাদী উপনিবেশ বানাতে চান। এর মাধ্যমে আসলে কাশ্মীর উপত্যকায় আগুন লাগাতে চান।

হব্যারিস্টার; পাকিস্তানের দ্য ডন থেকে ঈষৎ সংক্ষেপে ভাষান্তরিত


মন্তব্য