রবীন্দ্রনাথ কেন জরুরি

প্রকাশ : ০৭ আগষ্ট ২০১৯

রবীন্দ্রনাথ কেন জরুরি

  ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ

কে রবীন্দ্রনাথ? সহজ উত্তর- পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাবয়িত্রী এবং কর্মযোগী মানুষের নাম রবীন্দ্রনাথ। একটি জাতির ভাষিক এবং সাহিত্যিক রুচি সৃষ্টি করেন যিনি, তিনিই রবীন্দ্রনাথ। গ্রাম-সংগঠনে নিরলসভাবে কাজ করেন যিনি, মানবিকতার পক্ষে দাঁড়ান যিনি, নারীমুক্তির স্বপ্ন দেখেন যিনি, শিক্ষা বিস্তারে উন্নয়নের তত্ত্ব দেন যিনি- তিনিই রবীন্দ্রনাথ। কতভাবেই তো রবীন্দ্রনাথের পরিচয় তুলে ধরা যায়!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে স্রষ্টা এবং কর্মযোগী মানুষ হিসেবেই দেখতে ভালোবাসি আমি। জন্মের পর প্রায় একশ' ষাট বছর অতিক্রান্ত; মৃত্যুর পরও আমরা পেরিয়ে এসেছি প্রায় আশি বছর; তবু বাংলাভাষী মানুষের কাছে রবীন্দ্রনাথের অব্যাহত প্রভাব দেখে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই। তাঁর সাহিত্যকর্মের পরিমাণ বিপুল; লিখেছেন তিন হাজারের বেশি গান, এঁকেছেন দু'সহস্রাধিক চিত্র, প্রতিষ্ঠা করেছেন মানবকল্যাণমূলক অনেক প্রতিষ্ঠান। দ্বিমাত্রিক এই প্রয়াস এবং উদ্যোগের কথা স্মরণে রেখেই আমি দেখতে চাই, ভাবতে ভালোবাসি রবীন্দ্রনাথকে।

যাকে বলব বহুমাত্রিক সাহিত্যপ্রতিভা, রবীন্দ্রনাথ তার উজ্জ্বল উদাহরণ। কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, ছড়া, ব্যক্তিগত রচনা, ভ্রমণসাহিত্য, চিঠিপত্র, সঙ্গীত- কোন রূপকল্পে না লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ? সর্বত্রই রবীন্দ্রনাথের ভুবনবিজয়ী হাতের স্পর্শ এখনও আমাদের বিস্ময়াভিভূত করে রাখে। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও সঙ্গীত বাঙালির চিরকালীন সম্পদ, বাঙালির আত্মমুক্তির অফুরন্ত উৎস।

রবীন্দ্রনাথের কবিতা ধারণ করে আছে মানবাত্মার সামূহিক ভাব। রোমান্টিক ভাববিলাস অতিক্রম করে রবীন্দ্রনাথ একসময় নেমে এসেছেন বাস্তব মানুষের কাছে, কঠিন মৃত্তিকায়, উচ্চারণ করেছেন আত্মমুক্তি ও মানবমুক্তির মাঙ্গলিক বাণী। মানবাত্মার মুক্তির জন্য তিনি বিশ্বমানবের পাশে দাঁড়িয়েছেন- কখনও আফ্রিকার পক্ষে পঙ্‌ক্তি নির্মাণ করেছেন, কখনও-বা কবিতায় ব্যঙ্গের বাণ নিক্ষেপ করেছেন জাপানি সমরবাজদের বিরুদ্ধে।

এই যে রবীন্দ্রনাথ, মানবতার মুক্তিসাধক রবীন্দ্রনাথ, এই রবীন্দ্রনাথই এখন আমাদের জন্য বেশি প্রয়োজন। মানবতার শত্রুরা, পরাজিত হায়েনারা মানবতার বিরুদ্ধে দেশে দেশে নানা অপকর্মে লিপ্ত, নানা ষড়যন্ত্রে সংশ্নিষ্ট। বাংলাদেশেও সে-হাওয়া বইছে প্রবলভাবে। ওদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্যই তাই রবীন্দ্রনাথ এখন আমাদের কাছে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। ধর্মকে ব্যবহার করে, ধর্মের নামে অনেক ভণ্ড রাজনীতিক-সমাজসেবক আমাদের ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে, যেমন নিঃশ্বাস ফেলেছিল রবীন্দ্রনাথের 'বিসর্জন' নাটকের রঘুপতি। আমাদের ঘরে-বাইরের ওই রঘুপতিদের রোখার জন্যই সার্বভৌম কবি রবীন্দ্রনাথ এখন অতি জরুরি এক হাতিয়ার।

কারয়িত্রী প্রতিভার প্রেরণায় জনকল্যাণ ও সমাজ-উন্নয়নমূলক অনেক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন রবীন্দ্রনাথ। এই উপমহাদেশে কৃষি ব্যাংকের প্রথম প্রতিষ্ঠাতা তিনি। তিনি ডেইরি ফার্মের প্রতিষ্ঠাতা, দিয়েছিলেন রেশম গুটিপোকার কারখানাও। শিলাইদহ-পতিসরে গ্রামীণ মানুষকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নৈশ বিদ্যালয়। শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতন-সুরুলে গ্রামীণ নারীর আর্থিক উন্নতির জন্য স্থাপন করেন একের পর এক প্রতিষ্ঠান। নোবেল পুরস্কারের অর্থ দিয়ে তিনি গ্রহণ করেছেন পল্লী-সংগঠনের নানা উদ্যোগ। সমবায় পদ্ধতিতে চাষ করার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে তিনি 'দ্য কো-অপারেটিভ প্রিন্সিপাল' নামে বই লিখেছেন, রাশিয়ায় গিয়ে সমবায় প্রথা দেখে বাংলায় তা প্রবর্তনের স্বপ্ন দেখেছেন, শাহজাদপুরে দুগ্ধ খামার এবং সমবায় প্রথা চালু করেছেন। সমাজ-উন্নয়নের জন্য স্বাপ্নিক এই রবীন্দ্রনাথই এখন আমাদের জন্য অনেক বেশি জরুরি। সমাজ-উন্নয়নের জন্য রবীন্দ্রনাথের কথা বাদ দিয়ে কেবল সাহিত্যিক হিসেবে তাঁকে দেখলে, কখনোই বোঝা সম্ভব নয় পূর্ণ রবীন্দ্রনাথকে।

শিক্ষাকে রবীন্দ্রনাথ দেখেছেন প্রযুক্তি হিসেবে। শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর চিত্তে মনুষ্যত্ববোধ ও বিশ্বাক্মচেতনা জাগ্রত করাই রবীন্দ্র-শিক্ষাদর্শনের মূল কথা। শিক্ষালাভ করে শিক্ষার্থী যাতে মানবিক পুঁজিতে রূপান্তরিত হতে পারে, সেদিকে রবীন্দ্রনাথ বিশেষভাবে সচেষ্ট ছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে শিক্ষা হয়ে উঠেছে পণ্য। এই প্রবণতার বিরুদ্ধে তাঁর শিক্ষাদর্শন আমাদের দেখাতে পারে মুক্তির পথ। এ কারণেই এখন অপশিক্ষা-প্লাবিত এই বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেন প্রবলভাবে প্রাসঙ্গিক। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন পরিবেশ-সচেতন দার্শনিক। পরিবেশ রক্ষার জন্য তিনি গান লিখেছেন, রচনা করেছেন প্রকৃতির প্রতিশোধ নামে নাটক, রক্তকরবীতেও আছে তার ইঙ্গিত। 'বৃক্ষরোপণ' শব্দের স্রষ্টা তিনি। বর্ষায় ঘটা করে শান্তিনিকেতনের চারদিকে গাছ লাগাতেন তিনি। পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উন্নত কৃষিজ্ঞান আহরণের জন্য পাঠিয়েছেন আমেরিকা, সেই ১৯০৩ সালে। পরিবেশ-সচেতন কৃষিসভ্যতা-সচেতন এই রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশে এখন অধিক প্রাসঙ্গিক। রবীন্দ্রনাথ উন্নয়নের কথা বলেছেন, তবে জোরের সঙ্গে বলেছেন উন্নয়নকে হতে হবে পরিবেশবান্ধব, উন্নয়নকে হতে হবে মানববান্ধব।

বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ কেন অপরিহার্য? আমাদের সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ নির্মাতা তিনি, আমাদের জাতীয়তাবাদী চেতনার অন্যতম উদ্গাতা তিনি। বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, কি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ- সর্বত্রই রবীন্দ্রনাথ এক শাণিত হাতিয়ার। ষাটের দশকে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আমাদের উল্লেখযোগ্য শক্তি-উৎস। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের একটি দিনও কি চলে রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে?

হউপাচার্য, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য