রিকশা না রিকশা শ্রমিক উচ্ছেদ

নগরজীবন

প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০১৯

রিকশা না রিকশা শ্রমিক উচ্ছেদ

  হাসান তারিক চৌধুরী

ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধের ঘোষণা এসেছে। তা কার্যকরও হয়েছে দ্রুতগতিতে। যদিও বাংলাদেশে সরকারি ঘোষণার এত দ্রুততম কার্যকারিতা সচরাচর দেখা যায় না। প্রশ্ন উঠেছে, নগরীর বিভিন্ন সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধের মধ্য দিয়ে যানজটের আদৌ কোনো অবসান ঘটবে কি-না? প্রশ্ন উঠেছে- কোনো বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে এই ঘোষণা এসেছে কি-না? যদি এটা বিশেষজ্ঞ মতামত হয়ে থাকে, তাহলে সেই বিশেষজ্ঞ মহোদয় কারা এবং কী তাদের যুক্তি? প্রশ্ন উঠেছে- এই রিকশা চলাচল বন্ধের ঘোষণা কি ঢাকা শহর থেকে রিকশা উচ্ছেদের জন্য, নাকি রিকশা শ্রমিকদের উচ্ছেদের জন্য? গরিব রিকশাওয়ালারা সরকারকে আয়কর দিতে অক্ষম বলে কি তাদেরকে শহর থেকে বিতাড়ন করা হচ্ছে? প্রশ্ন আরও আছে- যদি সত্যিই এসব রিকশাওয়ালাকে বেকার বানিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তাদের কার্যকর পুনর্বাসনে সরকার কী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে? পুনর্বাসন নিশ্চিত না করে দেশের আইনানুগ নাগরিকের সংবিধানস্বীকৃত পেশা ও বৃত্তির স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া অসাংবিধানিক কি-না? তাহলে কর্তৃপক্ষ কোন জনস্বার্থ দেখছে? নাকি ঢাকা শহরে দামি জিপ, প্রাইভেটকার ইত্যাদির ব্যবসাকে জোরদার করার জন্য কোনো গোপন চুক্তি ইতিমধ্যে সম্পাদিত হয়েছে? যে স্বল্প দূরত্বে হাঁটার পরামর্শ মেয়র দিয়েছেন, সে দূরত্বকে কীভাবে নির্ধারণ করেছেন?

যে সিটি করপোরেশন মশাভরা ঢাকা, আবর্জনাভরা ঢাকাকে স্বাভাবিক বলে স্বস্তিতে থাকে; ডেঙ্গু জ্বর মহামারি আকার ধারণ করলেও যে সিটি করপোরেশন কার্যত নির্বিকার থাকে; তারাই আজ মানুষকে হেঁটে স্বাস্থ্য ভালো রাখার পরামর্শ দিচ্ছে। খুব ভালো কথা! কিন্তু এই সাধারণ মানুষই যদি সিটি করপোরেশনকে প্রশ্ন করে- হাঁটার রাস্তাগুলো ঠিকঠাক আছে তো মেয়র সাহেব? ফুটপাতগুলোর খবর কী? ড্রেনগুলোর ময়লা উপচে পড়া বন্ধ হবে কবে? নির্মাণাধীন ভবন থেকে পথচারীর মাথায় ইট পড়া বন্ধ হবে কি-না? ম্যানহোলের ঢাকনাগুলো এখন কোথায়? অফিস শেষে সন্ধ্যাবেলায় হাঁটা পথগুলো ছা-পোষা মানুষদের জন্য কতটা নিরাপদ? ঢাকার রাস্তা, খাল, নদী দখল করে রেখেছে কারা? মন্ত্রী-এমপি এবং মেয়ররা হেঁটে কিংবা পাবলিক বাসে নিয়মিত অফিস করা শুরু করবেন কবে?

এ কথা বিনা তর্কে সবাই মানেন, ঢাকা মহানগরীকে যানজটমুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু এই প্রকট সমস্যার সমাধান কীভাবে এবং কত দ্রুততম সময়ে করা যায়, তা নিয়ে কি মেয়ররা কোনো জাতীয় সংলাপ করেছেন? রিকশা উচ্ছেদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে কম করে হলেও ১০ লাখ নগরবাসীর খাওয়া-পরা জড়িত। তাদের নিয়ে একটি সিদ্ধান্তের জন্য কোনো সংলাপের প্রয়োজন পড়ে না! এসব রিকশা শ্রমিকের দরকার হয় নির্বাচনের সময়। নির্বাচনী মিছিল, শোভাযাত্রা, নির্বাচনী জনসভা, সমাবেশ এই রিকশা শ্রমিকদের ছাড়া চলেই না। উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো, নির্বাচনের সময় কোনো মেয়র কিংবা কাউন্সিলর তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ভুল করেও বলেন না- নির্বাচিত হলে তারা রিকশা চলাচল বন্ধ করে দেবেন। কেন বলেন না? এর উত্তর সবাই জানেন এবং বোঝেন। ঢাকা সিটি করপোরেশনে রিকশার বৈধ লাইসেন্স আছে ৭৯ হাজার ৫১৪টি। দীর্ঘদিন ঢাকা সিটি করপোরেশন মালিকানা লাইসেন্স নতুন করে না দেওয়ার ফলে মানুষের চাহিদা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে এখন প্রায় ৫ লাখ রিকশা চলাচল করে। এই ৫ লাখ রিকশার সঙ্গে ১০ লাখ শ্রমিক জড়িত। ঢাকার রিকশা মালিকদের একটি সংগঠন এ তথ্য বিভিন্ন দৈনিককে জানিয়েছে। যদি এ তথ্যকে আমরা একটি সূচক হিসেবে বিবেচনায় নিই, তাহলে আমাদের স্বীকার করতেই হবে, ভোটের রাজনীতিতে এসব গরিব মানুষের তাৎপর্য কতখানি। কারণ, এরা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ভোটারের মতো নন। সাধারণত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ভোটার অথবা উচ্চবিত্ত ভোটাররা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শুধুই ভোটার। প্রার্থীর কর্মী হিসেবে এসব গরিব ভোটারই বেশি কাজে লাগে।

কথা প্রসঙ্গে একজন গবেষকের নাম না বললে বেশ অন্যায় হয়ে যাবে। এই গবেষকের নাম রব গ্যালাঘার। এই ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার-কাম গবেষকের জন্ম বার্মিংহামে। শেফিল্ড ইউনিভার্সিটিতে তিনি পড়াশোনা করেছেন নগর উন্নয়ন ও পরিকল্পনা বিষয়ে। তিনি বাংলাদেশে থেকেছেন ১০ বছর। বুয়েটে শিক্ষকতা করেছেন। ১৯৯২ সালে তিনি এ দেশের রিকশা পরিবহনের ওপর ৬৮৩ পৃষ্ঠার এক চমৎকার গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশ করেন। গ্রন্থটির নাম 'দি রিকশা অব বাংলাদেশ'। ১৯৯৩ সালে আমি যখন দিল্লিতে অবস্থান করছিলাম, তখন আন্তর্জাতিক পরিবহন ট্রেড ইউনিয়নের কর্মকর্তা শৈল বসু সে বইটি আমাকে দেখান। আমি তখন অবাক হয়েছিলাম এই ভেবে যে, রিকশার মতো একটা সাধারণ পরিবহনের প্রকৌশল, রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক দিকের কত খুঁটিনাটি বিষয় পর্যন্ত সে গ্রন্থে অধ্যাপক রব গ্যালাঘার তুলে ধরেছেন। পরক্ষণে কষ্ট পেয়েছিলাম এ কারণে যে, ঢাকার ঐতিহ্য রিকশা নিয়ে কি-না শেষ পর্যন্ত এক ব্রিটিশ গবেষককেই লিখতে হলো! কোনো বাংলাদেশি গবেষক এ কাজটি করতে পারলেন না! অধ্যাপক রব গ্যালাঘার তার রিকশাবিষয়ক সেই গবেষণা গ্রন্থে স্পষ্ট করেই বলেছেন, 'রিকশা খুবই পরিবেশবান্ধব এক যানবাহন। এটি পরিবেশ বা শব্দদূষণ করে না। রাস্তায় রিকশা অনেক কম জায়গা নেয়। অন্য গাড়ির তুলনায় মোড় ঘুরতে তাদের জায়গা লাগে অনেক কম। প্রাইভেটকারের যাত্রী রিকশা যাত্রীর তুলনায় অর্ধেকেরও বেশি জায়গা নেয়। বাসের তুলনায় ৫ থেকে ১০ ভাগ কম জায়গা নেয়। রিকশার জন্য কোনো বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয় না। লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়। শুধু রিকশাচালক নয়, রিকশার মিস্ত্রি, মেরামত, যন্ত্রাংশ উৎপাদন; গ্যারেজ ও হোটেল-রেস্টুরেন্ট মালিক, ছোট্ট দোকানদার, বস্তিমালিক মিলে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ও উপার্জনের ব্যবস্থা হয়।'

সঙ্গত কারণেই বলতে হয়, রিকশাকে কেন্দ্র করে যে নিম্নবিত্ত মানুষের 'জীবিকার অর্থনৈতিক চক্র' অস্তিত্বশীল; এর কোনো বিকল্প কি সিটি করপোরেশনের কাছে আছে? মজার বিষয় হলো, করপোরেশন এসব গরিব মানুষকে গ্রামে গিয়ে ধান কাটার মতো হাস্যকর পরামর্শ দিয়েছে। কৃষিপ্রধান এ দেশের প্রায় সবাই জানেন, ধান কাটার মৌসুম বাদ দিয়ে বছরের প্রায় আট মাস গ্রামীণ মজুরের কোনো কাজ থাকে না। প্রশ্ন হলো, সেই আট মাসের জন্য কি সিটি করপোরেশন বেকার ভাতা দেবে? এসব যুক্তি দিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই বিস্ময়কর সাফল্যের যুগে রিকশাকে চিরস্থায়ী করার কথা বলছি না। অনেকের মতো আমিও চাই, বিগত শতকের এই অমানবিক বাহন টানার হাত থেকে মানুষ মুক্তি পাক। কিন্তু আচমকা তা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন বিকল্প কর্মসংস্থান। রিকশা শ্রমিকরাও বলেছেন, উপযুক্ত কর্মসংস্থান পেলে তারাও এই কষ্টকর পেশায় থাকতে রাজি নন।

সবাই চায় যানজট চিরতরে বিদায় হোক। সাধারণ মানুষের জন্য সুলভ গণপরিবহন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হোক। বিদেশি বিনিয়োগ যেন যানজটের কারণে ফেরত না যায়। যানজট কমাতে সরকারের বড় বড় প্রকল্প সফল হোক। ফ্লাইওভার, আন্ডারপাস, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল ইত্যাদি যেন মেগা দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত না হয়। কিন্তু ঢাকা নগরে যানজটের মূল কারণ হলো, ধারণক্ষমতার চেয়ে ১০ গুণ জনসংখ্যা। জীবিকা, শিক্ষা, চিকিৎসার প্রয়োজনে সারা দেশের মানুষ ঢাকায় আসবেই। ঢাকামুখী এই জনস্রোত কমাতে পারলেই যানজট কমবে। এ জন্য চাই উন্নত জীবিকা, শিক্ষা, চিকিৎসার পর্যাপ্ত বিকেন্দ্রীকরণ। গরিব রিকশা শ্রমিকদের গামছা ধরে টানাটানি করলে সমস্যার কোনো কার্যকর সমাধান হবে না।

রাজনীতিক, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী


মন্তব্য

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ