ভালো-মন্দের এইচএম এরশাদ

সমকালীন প্রসঙ্গ

প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০১৯

ভালো-মন্দের এইচএম এরশাদ

  এমাজউদ্দীন আহমদ

একজন মানুষ মৃত্যুর পর সমাজে অন্যভাবে মূল্যায়িত-পর্যালোচিত হন। জীবদ্দশায় কিংবা কর্মজীবনে একজন মানুষের কর্মকাণ্ড যেভাবে আলোচনায় আসে, তার জীবনাবসানের পর সেই আলোচনার প্রেক্ষাপট আরও বিস্তৃত হয়। সদ্য প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি এভাবেই প্রযোজ্য। ১৪ জুলাই সকাল প্রায় পৌনে ৮টায় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এইচএম এরশাদের জন্মস্থান অবিভক্ত ভারতের কোচবিহার জেলায়। পরে তার পরিবার চলে আসে এই ভূখণ্ডের রংপুরে। সেখানেই তার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাজীবন সম্পন্ন হয়েছে বলে জানি। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পর্ব শেষ করে যোগ দেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে। মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তান থেকে প্রত্যাবর্তন করেন স্বাধীন বাংলাদেশে। ক্রমান্বয়ে সেনাবাহিনীর শীর্ষ পদ আহরণ করেন।

অনেককেই ব্যঙ্গ করে বলতে শুনেছি, তিনি খলনায়ক থেকে নায়ক হতে চেয়েছিলেন। আজ তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। আমি আজকে তাকে ঠিক এভাবে মূল্যায়ন করব না। তবে সামরিক গণতন্ত্রের নাম দিয়ে রাজনৈতিক জীবনের যে বীজটা তিনি বুনেছিলেন, সেই অধ্যায়টা সাধুবাদ কিংবা প্রশংসা পাওয়ার নয়। তিনি রাজনীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রের শাসনভার হাতে নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার কাজ শুরু করেননি। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে যেভাবে নিজের হাতে ক্ষমতা নেন, তাতে গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর সবরকম উপাদানই ছিল। তার ভাষায় যা ছিল গণতান্ত্রিক সামরিক শাসন, সেই শাসনকালের পর্যায়ক্রমিক ধারাবাহিক কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রেই নয় প্রীতিকর।

দেশের রাজনীতিতে এইচএম এরশাদের নামটি নানাভাবেই আলোচিত হয়েছে তার সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনের ধাপে ধাপে। সেনাপ্রধান থেকে ক্ষমতা দখল এবং এরই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রপতি হিসেবে ৯ বছরের শাসন। রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালক হিসেবে পরিচিতির বাইরে কবি ও প্রেমিক হিসেবে পরিচিত এরশাদ নিজেই একসময় বলেছেন, সামরিক শাসক হিসেবে ক্ষমতা নেওয়ার পর রাজনীতিতে টিকে থাকার ইতিহাসে বিরল ব্যক্তি তিনি। তার এই কথার ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণও হতে পারে নানাভাবেই। ক্ষমতায় থাকতে নিজের কিছু কিছু কর্মকাণ্ড তাকে কঠোর সমালোচনার কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। তার দীর্ঘ পথচলায় মন্দ কাজের ছাপটাই বেশি- এ কথাও বলা যায়। তিনি তার অনেক সিদ্ধান্তেই বেশিক্ষণ স্থায়ী থাকতে পারেননি, এমন নজির আছে বিস্তর। তার মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা কিংবা সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। এমনকি জীবনের প্রায় একেবারে শেষ পর্যায়েও দলের ভার কার ওপর অর্পণ করবেন- এ নিয়ে সিদ্ধান্তের দোটানায় তাকে ভুগতে দেখা গেছে।

ভালো-মন্দ মিলিয়েই একজন মানুষ ছিলেন তিনি। একেবারে সমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকাটা মানুষের পক্ষে দুরূহই বটে। তিনি যখন রাজনীতির অঙ্গনে প্রবেশ করেন, তখন তাকে নানারকম কৌশলই অবলম্বন করতে দেখা গেছে। তিনি বলতেন, এক বিপর্যস্ত বাংলাদেশের দায়িত্ব তাকে গ্রহণ করতে হয়েছিল। কিন্তু যদি তা সত্য হয়, তাহলে তো এ কথাও অসত্য নয় যে, তিনি আরও বেশি বিপর্যস্ত করে তুলেছিলেন সেই সময়ের দেশচিত্র তার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে। রাজনৈতিক দলে ভাঙনসহ গোটা রাজনৈতিক ক্ষেত্রটাকেই কলুষিত করার অভিযোগের তীরে তিনি বিদ্ধ। তবে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েও কোনো কিছু তোয়াক্কা না করার মনোভাবটা তার শক্তই ছিল বলা যায়। তার শাসনের বিরোধিতা করে ১৯৮৩ সালের ১৪ ও ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদের ব্যাপক সংঘর্ষের মর্মন্তুদ ঘটনাও সচেতন মানুষ মাত্রই বিস্মৃত হওয়ার কথা নয়। জয়নাল, কাঞ্চন, মোজাম্মেল, জাফর, দিপালী সাহার প্রাণপ্রদীপ নিভে গিয়েছিল সেই সংঘাতে।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টাও করেছিলেন প্রকটভাবেই। আমার মনে হয়, সেখানেই তিনি বড় ভুলটা করেছিলেন। কারণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন শিক্ষার্থীরা এ দেশের গণতান্ত্রিক-সাংস্কৃতিক প্রতিটি আন্দোলনে ইতিবাচক ভূমিকাই রেখে এসেছে। তারা কখনোই কারও হাতের ক্রীড়নক হতে চায়নি। ডা. মিলনের প্রাণপ্রদীপ নিভে যাওয়ার মর্মান্তিক ঘটনার মধ্য দিয়ে তার শাসনামলের অবসানের একধাপ পথ সৃষ্টি হয়। এরশাদ শাসনামলের বিরোধিতাকারী একেবারে সাধারণ মানুষ হিসেবে পরিচিত নূর হোসেন, যার বুকে-পিঠে লেখা ছিল- 'স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক'। তার গুলিবিদ্ধ হওয়া এবং শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের মর্মন্তুদতার মধ্য দিয়ে এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন অধিকতর বেগবান হয়ে ওঠে। আরও বহু ঘটনাই টেনে নিয়ে আসা যায়। হয়তো এখন তার জীবন অধ্যায়ের আরও কিছু দিকও আবার নতুনভাবে মানুষের সামনে চলে আসবে। ওই যে বলেছি, মৃত্যুর পর একজন মানুষ অন্যভাবে পর্যালোচিত হন, এ কারণেই হয়তো তিনি এভাবে আলোচনায় আসবেন। তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন বিতর্কমুক্ত নয়। তার এসব কর্মকাণ্ডের কারণে দেশের বদনাম হয়েছিল। আগেই বলেছি, ভালো-মন্দ মিলিয়েই তো একজন মানুষ। অনেকেই মন্দটা মুছে ফেলেন ভালো কাজের মধ্য দিয়ে, আবার অনেকেরই ভালো কাজও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে তার মন্দ কাজের কারণে।

আওয়ামী লীগ তার প্রতি হঠাৎ আকৃষ্ট হয়ে তাকে নানাভাবে ব্যবহার করে রাজনৈতিক অপকৌশলের কসরত করেছে- এমন কথা বলাও অমূলক হবে না। আমি বলব, তার হাতে গড়া দল জাতীয় পার্টির নীতিনির্ধারকরা যদি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ধারায় রাজনৈতিক চর্চার বিষয়টি এখন অনুধাবন করতে সক্ষম হন, তাহলে লাভটা তাদেরই হবে। তারা যদি দলটিকে নিজ শক্তিবলে চালাতে পারেন, একেবারে নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম থেকে দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে এগোতে পারেন, তবে হয়তো দলটির অস্তিত্ব টিকে থাকতে পারে কিংবা রাজনীতিতে আরও বিকশিতও হতে পারে। দলটি নিজের পায়ে হাঁটুক, দেশে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানের ক্ষেত্রে যথাযথ ভূমিকা রাখুক, এটাই প্রত্যাশা। দেশে গণতন্ত্রের বড় দুর্দিন চলছে। রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা নয়, বিরাজ করছে স্থবিরতা। এই স্থবিরতা গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য কোনো শুভবার্তা নয়। সরকারি দল নিজেদের মতো করেই সবকিছু করছে। এখানে বিরুদ্ধ মত, মানুষের অধিকার কিংবা চিন্তার স্বাধীনতার পথ সংকুচিত।

এরশাদের শাসনামলের শুধু মন্দের দিকে দৃষ্টি দিলে সঠিক পর্যালোচনা কিংবা মূল্যায়ন হবে না। এরশাদ প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ করে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় একটা পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন- এই সত্য এড়ানো যাবে না। এ ব্যাপারে তার উদ্যোগ ছিল দূরদর্শী। লক্ষ্য ছিল শাসনব্যবস্থা গতিশীল করা এবং জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়া। এ ক্ষেত্রে তার সফলতা রয়েছে। উপজেলা ব্যবস্থার প্রবর্তন তিনিই করেছিলেন। এসব পদক্ষেপে তার দূরদর্শিতার পরিচয় মেলে। বিচার ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও সৃষ্টি করেছিলেন নতুন অধ্যায়ের। পাবলিক সার্ভিস কমিশন সম্পর্কে বলতে গেলে তার ইতিবাচক ভূমিকার কথা অস্বীকার করা যাবে না। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় তিনি এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিলেন, এও সত্য। তার শাসনামলেই সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হয়। বিশেষ করে, উত্তরবঙ্গের সঙ্গে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এর সুস্পষ্ট ছাপ রয়েছে। অবহেলিত জনপদ হিসেবে গোটা উত্তরাঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়নের কথাও বিস্মৃত হওয়ার নয়। প্রশাসক হিসেবে তার দূরদর্শিতা-দৃঢ়তা থাকলেও দোদুল্যমানতা তাকে অনেক ভুল পথে নিয়ে যায়। তার পরও যদি প্রশ্ন করি, আমরা কি এরশাদের শাসনব্যবস্থার চেয়ে এখন খুব ভালো ব্যবস্থায় আছি, তাহলে এর উত্তরটা কী হবে? বহুক্ষেত্রেই নিশ্চয় প্রীতিকর হবে না।

এইচএম এরশাদ আজ আমাদের মাঝে নেই। তার কর্ম অধ্যায়টা ভালো-মন্দ মিলিয়েই কেটেছে। আমি তার আত্মার শান্তি কামনা করি। আল্লাহ তার বেহেশত নসিব করুন। তার ভালো কাজগুলোর জন্য তাকে মন্দ কাজের অধ্যায় থেকে আল্লাহ মুক্তি দিন। তিনিও অনেকের মতোই রাজনীতি করতে গিয়ে হয়তো ভুল-ত্রুটি করেছেন, কদর্যভাবে শাসনভার কেড়ে নিয়ে সমালোচিত হয়েছেন; কিন্তু আমরা একই সঙ্গে তার ভালো কাজগুলোও স্মরণে রাখার প্রয়াস নেব। যদি তা না করি, তাহলে তা সঠিক হবে না। আজ তিনি সবকিছুর ঊর্ধ্বে চলে গেছেন। তার মন্দ কাজের ভুক্তভোগী যেমন অনেকেই, ঠিক তেমনি তার ভালো কাজের জন্য সুফলভোগীর সংখ্যাও কম নয়। এটা মনে রাখা বাঞ্ছনীয়। এইচএম এরশাদের জীবন অধ্যায়ের প্রায় পুরোটাই বলা চলে কেটেছে সচলভাবে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য