রাজনীতিতে আশা-নিরাশা

সমকালীন প্রসঙ্গ

প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০১৯

রাজনীতিতে আশা-নিরাশা

  এম হাফিজ উদ্দিন খান

দেশের রাজনীতি কেমন চলছে- এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় হয়তো বলা চলে ভালোই তো। রাজনৈতিক দল বলতে এখন একমাত্র সরকারি দলের কর্মকাণ্ডই পরিলক্ষিত হচ্ছে। আরও পরিস্কার করে বলা যায়, জোট সরকারের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ছাড়া অন্য কিছু তেমনভাবে দৃষ্টিগ্রাহ্য নয়। আর বিরোধী দল বলতে যা বোঝায় তা দৃশ্যত পরিলক্ষিত হলেও কার্যত নানা কারণে তাদের অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ। সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে শক্তিশালী করতে বিরোধী দলের অপরিহার্যতা সম্পর্কে নতুন করে ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ নিষ্প্রয়োজন। বর্তমানে আমাদের জাতীয় সংসদের ভেতরে-বাইরে ক্ষমতাসীন মহলের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগকে চ্যালেঞ্জ করার বা তাদের কর্মকাণ্ডের গঠনমূলক সমালোচনা করে কিংবা তাদের কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করে তা প্রতিহত করার মতো অপর পক্ষ নেই। এটা সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে শুভবার্তা নয়। শক্তিশালী বিরোধী দল গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকাশে জরুরি।

জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টি বিরোধীদলীয় আসনে আছে বটে; কিন্তু এই দলটিও ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েই গত জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। এখনও তারা এই জোটেই আছে। এমতাবস্থায় বিরোধী দল বলতে আমরা যা বুঝি, সে রকম অবস্থানে তারা নেই কিংবা থাকার মতো প্রেক্ষাপটও সঙ্গতই অনুপস্থিত। তা ছাড়া তাদের দলের চেয়ারম্যানের অসুস্থতা, অভ্যন্তরীণ নানারকম টানাপড়েন, দলে বিভিন্ন পন্থির নানারকম স্ববিরোধী কর্মকাণ্ড- এসব মিলিয়ে দলটির ভবিষ্যৎ প্রশ্নবিদ্ধ। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে যে বিতর্ক চলছিল, বিশেষ করে দেশের রাজনৈতিক মহলে বিএনপির সাংসদদের সংসদে নাটকীয় যোগদান (গণফোরামের দু'জনসহ) এবং তাদের নীতিনির্ধারকদের অসংলগ্ন ও লক্ষ্যহীন কথাবার্তা, তা চাপা দিয়ে দিয়েছে। বিষয়টি সরকারি মহলের জন্য স্বস্তি জুগিয়েছে। জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের রয়েছে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা। দুর্মুখেরা বলেন, এই শক্তিবলেই আওয়ামী লীগ তার জোটভুক্তদেরও খুব একটা আমলে রেখে সেরকমভাবে মূল্যায়নের খুব প্রয়োজন মনে করছে না। যাক, এসব হলো বিতর্কের বিষয়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো- জাতীয় সংসদে কোনো দলের একক বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য ভালো খবর নয়। এ অবস্থায় সরকারের কাজকর্মে ভুল হতে পারে, তোয়াক্কা না করার মনোভাব এক ধরনের বৈরী পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে এবং এমন নজির আমাদের সামনে আছেও।

আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতে অতীতে একটি দলের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকারের জন্য, দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য অনেক প্রশ্নই দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধীর মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ভুলের খতিয়ান হয়েছিল বিস্তৃত। এমন দৃষ্টান্ত আমাদের প্রেক্ষাপটেও দেওয়া যাবে। কাজেই এসব বিষয় যদি আমরা আমলে নিয়ে সামগ্রিক পরিবেশ-পরিস্থিতি পর্যালোচনা করি, তাহলে এ কথাটাই সত্য বলে প্রতীয়মান হয় যে, শক্তিশালী বিরোধী দল কিংবা পক্ষ ছাড়া সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চার পথটি বিকশিত হতে পারে না। আমাদের নানারকম সামাজিক সংকট রয়েছে। এর মধ্যে জননিরাপত্তা অন্যতম। বিশেষ করে নারীরা নানা ক্ষেত্রে নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। সামাজিক এসব বিষয় কিংবা গণতান্ত্রিক দাবি-দাওয়া নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো আন্দোলন কিংবা মাঠ গরম করার আয়োজন নেই। তার মানে কি এই যে, রাজনীতি ভালোই চলছে? অনেকেই মনে করেন, দেশে সুষ্ঠু রাজনীতির চর্চা নেই। যেন অনেকটা একদলীয় শাসনব্যবস্থার অধীনে রয়েছি আমরা।

যদিও বিএনপি একটি পুরনো রাজনৈতিক দল হিসেবে এখনও বড় বিষয়; কিন্তু দলটির মধ্যে নানারকম বিভাজন আর নেতৃত্ব তাদের দলীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে সংকট বাড়াচ্ছে। বিএনপির নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোট আছে বটে; কিন্তু রাজনীতির মাঠে তাদের সক্রিয়তা তেমনটি নেই। এই জোটভুক্ত কয়েকটি দলের জনসম্পৃক্ততা প্রায় শূন্যের কোঠায়। জামায়াতের অভ্যন্তরীণ সংকট প্রকট। ইতিমধ্যে একটি অংশ দল থেকে বের হয়ে নতুন দল করেছে। বিগত জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টেও নানা সংকট রয়েছে। তাদের মধ্যে ভাঙনের আওয়াজ আগেই পাওয়া গিয়েছিল এবং ভবিষ্যতে তা আরও প্রকট হয় কি-না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা না গেলেও এটুকু বলা যায়- তাদের মধ্যে এখন রয়েছে ব্যাপক আস্থার সংকট। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বিগত জাতীয় নির্বাচনে যে ফল করেছে, তা বিস্ময়কর। বিশেষ করে বিএনপির এত নগণ্য আসন লাভ বিস্ময়ের পাশাপাশি বহুবিধ প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছিল। কিন্তু ২০ দলীয় জোট কিংবা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যর্থতার কারণেই এখন সব প্রশ্নই চাপা পড়ে গেছে। বিএনপির সাংসদরা (মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাদে) জাতীয় সংসদে যোগ দিয়ে দলের জন্য কী অর্জন করেছেন- এই প্রশ্নটি দলের তৃণমূল পর্যায় থেকে শোনা গেছে। হয়তো কেউ কেউ বলতে পারেন, এর মধ্য দিয়ে বিএনপি মূলধারার রাজনীতিতে ফিরে এসেছে। কিন্তু আমার মনে হয়, সমীকরণটি এত সহজ নয়। বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ এত সহজে কষা যাবে না। কেউ কেউ এও বলেছেন, বিএনপির নেতারা এক ধরনের অবসাদগ্রস্ততায় যেন ভুগছেন এবং মনে হচ্ছে, তারা হাল ছেড়ে দিয়েছেন। তবে এটুকু আমরা ধারণা করতে পারি, তাদের বর্তমান রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড গোছানো নয়। দলটির চেয়ারপারসন দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে। আরেক শীর্ষ নেতা লন্ডনে। সেখানে বসে নির্দেশনা দিয়ে দলকে দুরবস্থা থেকে টেনে তোলা সহজ কাজ নয়। বিএনপির সর্বাগ্রে দরকার জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর পক্ষে রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া। তা ছাড়া দলের যেসব নেতাকর্মী হামলা-মামলাসহ নানারকম নেতিবাচকতার তীরে বিদ্ধ, তারা আস্থা রেখে দলের জন্য নিবেদিতভাবে কাজ করতে পারেন, সে পথটাও ক্রমেই হচ্ছে কণ্টকাকীর্ণ। কারণ দলের কার ওপর তারা ভরসা করবেন। এ ছাড়া জাতীয় সংসদে যোগদানের বিষয়ে দলের তৃণমূলে অসন্তোষ রয়েছে। মোদ্দাকথা, বিএনপির রাজনীতিতে খালেদা জিয়া কিংবা তারেক রহমান এখন সরাসরি কিছুই করতে পারবেন না। এ অবস্থায় নতুন করে ভেবে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে রাজনীতির মাঠে তাদেরকে জনস্বার্থ-সংশ্নিষ্ট কর্মসূচি নিয়ে দাঁড়াতে হবে। আমাদের নানা ক্ষেত্রেই বহুবিধ সংকট রয়েছে। মূল সংকট হচ্ছে- দেশের কোনো স্তরেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ কিংবা চর্চা নেই।

রাজনীতিতে সর্বাগ্রে দরকার যোগ্য-দক্ষ নেতৃত্ব। তারপর চাই ত্যাগ। শক্তিশালী জনসম্পৃক্ত সংগঠনও দরকার। নব্বইয়ের অধ্যায় জনমনে অনেক আশার সঞ্চার ঘটিয়েছিল। আওয়ামী নেতৃত্বাধীন জোট, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ও বামদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চার নতুন পথ সৃষ্টি করলেও জনপ্রত্যাশা বেশিদিন টেকেনি, হোঁচট খেয়েছে। এখন তো বিএনপি কোণঠাসা আর এ জন্যই হয়তো তারা এখন জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলার কথা আর তেমনভাবে বলে না। সম্প্রতি ২০ দলীয় জোটের সদস্য এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বে ৪-৫টি ছোট দল নিয়ে একটি ছোট জোট গঠিত হয়েছে। তাই মেরুকরণের সমীকরণ নিয়েও পরিস্কার করে কিছু এখনও বলা যাচ্ছে না। আমরা আজ পর্যন্ত বিতর্কমুক্ত একটা নির্বাচনী ব্যবস্থাই গড়ে তুলতে পারলাম না। আমরা সবসময়ই সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পক্ষে বলে আসছি। কোনো পক্ষাবলম্বন আমাদের উদ্দেশ্য নয়। সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ, প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আরও বিপদের মুখে পড়বে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ কিংবা নীতি-নৈতিকতা অশুভ শক্তি গ্রাস করে ফেলছে।

অনস্বীকার্য যে, আমাদের দেশে সুস্থধারার রাজনীতি চর্চার পথটি অনেক দিন ধরেই অমসৃণ। প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতা নানা ক্ষেত্রে কম বিদ্যমান নয়। এত কিছুর পরও প্রত্যাশা করি, রাজনীতি যেন গতিহারা, পথহারা না হয়। শেষ পর্যন্ত রাজনীতিই জনগণের অধিকার আদায়ের একমাত্র মাধ্যম। রাজনীতিবিহীন কোনো সমাজে মানুষের অধিকারের পূর্ণতা আশা করা যায় না। আরও প্রত্যাশা করি, রাজনীতির নিয়ন্ত্রণটা থাকুক রাজনীতিকদের হাতেই। দেশের রাজনীতি কোন পথে- এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে অনেক কিছুই আমাদের সামনে এসে যায়। তবে এ কথা সত্যি যে, রাজনীতির দোষ-ত্রুটি রাজনীতির মধ্য দিয়েই দূর করা উচিত হবে। আমাদের রাজনীতির অর্জন যেমন কম নয়, তেমনি বিসর্জনের খতিয়ানও কম বিস্তৃত নয়। কিন্তু অর্জন ধরেই এগোতে হবে। বিসর্জনের পথ রুদ্ধ করে দিয়ে অর্জন সম্বল করে নির্মাণ করতে হবে ভবিষ্যৎ। রাজনীতিকদের স্বচ্ছতা-দায়বদ্ধতা-জবাবদিহি নিশ্চিত হোক। পরমতসহিষুষ্ণতা, সহনশীলতার পাঠ পুষ্ট হোক। গণতান্ত্রিক রাজনীতি চর্চার পথটিও সুগম হোক। দৃশ্যমান ও পরিসংখ্যানগত উন্নয়ন আর গুণগত, টেকসই ও পরিবর্তনের উন্নয়ন এক নয়। এখনও সমাজে দুর্নীতি বড় রকমের ব্যাধি হয়েই আছে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যদি স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হয়, তাহলে দুর্নীতির মতো বহুবিধ ব্যাধি আমাদের সম্ভাবনা কুরে কুরে খাবেই। সবশেষে বলতে চাই, রাজনীতিকরা যেন তাদের দায়টা ভুলে না যান।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সভাপতি সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন


মন্তব্য

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ