'আচমকা নয়ন বন্ড ও আমরা'

প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০১৯

'আচমকা নয়ন বন্ড ও আমরা'

  জাঁ-নেসার ওসমান

এসির রিমোটটা ক'দিন ধরে ঠিকমতো কাজ করছে না।

মাঝেমধ্যে অন হয়, মাঝেমধ্যে অন হয় না! কমপ্রেসার মনে হয় গেছে... সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে আমার প্রেসার, ঠিকমতো লিখতে পারছি না।

দেশ ও জাতির জন্য নয়ন বন্ড নিয়ে আধুনিক ডিজিটাল চিন্তার এক পশলা বিদ্রোহী মার্কা ঠাণ্ডা মলমের পরশে জাতি জেগে উঠবে, এমনি এক মাহেন্দ্র ক্ষণে এসি কাজ করছে না, একি বিড়ম্বনা! দেশ ও জাতি জাগবে কীভাবে! আমরা কালচারাল পাবলিক যদি ঠিকমতো দেশ ও জাতির জন্য কাজ না করতে পারি, তাহলে মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নততর দেশে পৌঁছব কী করে!

জানি, আজকাল অনেকে আমাদের হিংসা করে কালচারাল না বলে 'কালো চাঁড়াল' বলে ডাকে! ওরে ভাই বুঝি বুঝি পরশ্রীকাতরতা। কালচারাল হওয়া অত সোজা না। কালচারাল বলো বা 'কালো চাঁড়াল' বলো, যাই বলো না কেন, 'কালো চাঁড়াল' হওয়া অত সোজা না। ছন্দের জ্ঞান থাকতে হয়, আদিরস, হাস্যরস, অদ্ভুতরস, বীভৎসরস সব বুঝে প্রবন্ধ লিখতে হবে। তেল মারার পরিমিতবোধ থাকতে হবে, না হলে তোমার স্থান হবে ডাস্টবিনে শত সহস্র লেখকের মতো। আমরা পারি, কারণ আমাদের রক্তে, আমাদের বংশে রয়েছে জনসেবার হিমোগ্লোবিন। আমার দাদি ছিল সে আমলের ফিমেল ওয়ার্ডের নার্স। ওটিতে ডিউটি করে, রোগীদের শুভেচ্ছায় আর ডাক্তারদের স্নেহে দাদি ধানমণ্ডিতে জমি কিনেছেন। জি জি রায়েরবাজার, ওটা ধানমণ্ডিই ধরা হয়। ধানমণ্ডি বলেন বা রায়েরবাজার যাই বলেন, মূল কথা হলো ধমনিতে সেবার শ্বেতপ্রদর। সেবাই মানবধর্ম, তাই আমরা কালচারাল ব্যক্তিরা কখনোই সেবা থেকে পিছপা নই। এই যে দেখুন, সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষে, যে কোনো দিন কোনোকালেও যাত্রা করেনি বা সারারাত কখনও যাত্রা দেখেনি, সেসব জনদরদি কালচারাল লোকগুলো যাত্রার দায়িত্ব নিয়ে বসল। আপনার ভাষায় এই কালো চাঁড়ালরাই পারে এই অভিজ্ঞতাবিহীন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে।

বুঝেছি আপনি বলবেন, পানিওয়ালির পোলাদেরই এই রকম দুঃসাহস থাকে। কারণ পেছনে টাকার লালচ। ভাই টাকার লালচ কার নেই! ঋণখেলাপি কি কখনও থামে! আর শোনেন, আজ টাকা আছে বলেই নিজেদের পায়ে নিজেরা দাঁড়াতে পারছেন। বিশ্বব্যাংক কাঁচকলা দেখাল কিসের জোরে? ওই টাকার জোরে! কী বললেন? টাকা থাকলে গ্যাসের দাম বাড়ালে হরতাল ডাকে কেন? আরে ভাই ওটা খাইসলত! খাইসলত বুঝেন, পাতে যদি একটু হালুয়া-রুটি জোটে সেই চেষ্টা। না হলে আপনার ওই বামাস্বর শুনে ঈশ্বরী পাটনি মানে হারমোনিয়াম পাট্টি একবার বাঘছাল গায়ে দেয় ঈশপের গল্পের মতো। তারপর খাল কেটে কুমির আনল, আরও কত কী! হাসায়েন না ভাই হাসায়েন না, শ্রীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শ্রীকান্তের মতো আপনার ওই ছিনাদ বহুরূপীর রূপে কেউ আর ভুলবে না ভাই।

জনতাকে জাগাতে হলে আমাদের দলে ভেড়েন- কালচারাল হন, নইলে হালুয়া-রুটি, মানসম্মান কিছুই পাইবেন না। আর ভাইবেন না, কালচারাল হওয়া অত সোজা। মনে রাখবেন, কালচারাল হতে হলে প্রয়োজনে হিজাব তেল বেচবেন। হিজাবের আড়ালে ইহুদি-নাসারাদের মাল বেইচ্চা আপনারে কালচারাল হইতে হইবে।

দাঁড়ান এসিটা ঠিক হোক, তারপর ঠাণ্ডা মাথায় এমন একটা বোমবাস্টিং কলাম লিখমু- দুই দিনেই নয়ন বন্ডরা সব আকাম-কুকাম ছাইড়া ধর্ষণ বন্ধ কইরা দলে দলে সৎ-সুন্দর জীবনযাপন করবে। দেশে কেবল শান্তি আর শান্তি।

কী কী, আমরা রাস্তায় নামি না কেন? এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করি না কেন? আপনে তো মিয়া আস্ত গাড়োল, আপনে কুনো দেখছেন... হরতাল সফল করে কারা? যারা সাধারণ দিন আনে দিন খায় তারা। কালচারাল রাস্তায় নাইম্মা হরতাল সফল করছে! হালা হাগোলনি কোনো! ওই ব্যাডা রাস্তায় এসি আছে? এয়ার কন্ডিশনার বা এয়ারকুলার! আমরা রাস্তায় নামমু! আরে ভাই এটা ফ্রান্স না যে 'জঁ-জীনের (ঔবধহ এবহবঃ)' মতো লেখকরে পুলিশে অ্যারেস্ট করার সঙ্গে সঙ্গে জঁ পল সার্ত্র, আঁদ্রে মালরোসহ প্রায় সব বুদ্ধিজীবী রাস্তায় মিছিল করে প্রতিবাদ করলে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ লেখক নাট্যকার 'জঁ-জীনেরে' ছাইড়া দিল। ব্যাপারটা খুবই সোজা, ঠাণ্ডার দেশ, রাস্তায় এসি লাগে না। তাই সবাই রাস্তায় নেমেছিল, প্রতিবাদ করেছিল।

বাংলাদেশে এসব চলে না, রাস্তায় এসি নেই, তাই আমরাও কেউ নেই। টক শো, আছি। এসি স্টুডিও। প্রেস কনফারেন্স, আছি। এসি রুম। সেমিনার, আছি। এয়ার কন্ডিশনার- প্রাইভেট ইউনিভর্ার্সিটি? আছি, এসি ...

না ভাই, ওই রাস্তার গরমে মিটিং-মিছিলে ডাইকেন না, পারমু না, বডি নেয় না ভাই।

ভাই ভাই মাফ করেন ভাই, এসি ঠিক হয়েছে, রিমোট কাজ করছে! বরফ দেওয়া বাতাস বাইরাইতাছে... ইয়া আইজ মাফ করেন, এইবার এইবার নয়ন বন্ড লয়া ফাটাফাটি একটা লেখা লিখমু, মাফ করেন ভাই, যাই বাই, পরে আর একদিন আইসেন ... সরি ভাই সরি, নয়ন বন্ডের হেডলাইনও হেডে মানে মাথায় আসছে, ক্যাপশেন হবে... 'আচমকা নয়ন বন্ড ও আমরা...'

লেখক


মন্তব্য

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ