টেকনাফ, ইয়াবার প্রভাব ও কিছু কথা

সমাজ

প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০১৯

টেকনাফ, ইয়াবার প্রভাব ও কিছু কথা

  লে. কর্নেল মো. সাইফুল ইসলাম

'ইয়াবা' একটি থাই শব্দ, যার অর্থ হচ্ছে ক্রেজি মেডিসিন, এটা মিথামফেটামিন; একটি শক্তিশালী উদ্দীপক। এটা শুরুর দিকে শুধু মানবদেহেরই উদ্দীপক ছিল বটে; কিন্তু ইয়াবা এখন সমাজ, রাষ্ট্র ছাড়িয়ে উপমহাদেশের একটি খারাপ উদ্দীপক হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে এর প্রভাব ভাবার বিষয় আর বাংলাদেশের জন্য এটা একটি মহাপ্রলয়ের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। একটি মহাপ্রলয় আসে, ধ্বংসযজ্ঞ করে চলে যায়; মানুষ পরে ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে জনপদকে আবার মুখরিত করে তোলে। কিন্তু ইয়াবার মহাপ্রলয় যেন থামার নয়। এটা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে প্রতিনিয়তই ধ্বংস করে যাচ্ছে।

সম্প্রতি মাদকের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী জিরো টলারেন্সের ঘোষণা দিয়েছেন। তারপরও সংবাদমাধ্যমে আসে, 'বন্দুকযুদ্ধেও থামছে না ইয়াবা পাচার।' অদ্ভুত ও কিছুটা হতাশার বার্তা বহন করে এটি। অর্থাৎ মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও আমাদের সমাজের কিছু লোক এ ব্যবসা থেকে পিছপা হচ্ছে না। সত্যি অবাক করা কাণ্ড এবং সুস্থ মস্তিস্কের বাবা-মায়ের কাছে একটি আতঙ্কের বার্তা- তা হলে আমাদের ছেলেমেয়েরা, যুবকরা কতটা নিরাপদ এই ইয়াবা থেকে? বাঙালি জাতির বহু সাফল্য রয়েছে। আমরা জাতি হিসেবে অনেক সাহসী। আমাদের সংস্কৃতি অনেক সমৃদ্ধ, মূল্যবোধ, স্বকীয়তা, বীরত্ব বিশ্বজুড়ে। তবে কেন আমরা পারব না এই ইয়াবার গ্রাস থেকে জনগণ, সমাজ ও সর্বোপরি রাষ্ট্রকে বাঁচাতে। রিপোর্টটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ইয়াবা ব্যবসায়ীর বাড়িও নাকি জব্দ করার প্রয়াস চালাচ্ছে স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আমরা তাদের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। সঙ্গে সঙ্গে আমরা আরও অনেক পদক্ষেপেরও আশা করি। শুনেছি, ইয়াবা নৌকায় করে নদী পার হয়ে, খাল পার হয়ে এ দেশে ঢোকে। আমরা সীমান্তে নৌকার বিকল্প দেখতে চাই; প্রয়োজনে নৌকার ওপর নির্ভরশীল স্বল্প সংখ্যক পরিবারের জীবন-জীবিকার পরিবর্তন ঘটাতে চাই। দেশ বঁাঁচাতে স্বল্প সংখ্যক মানুষের জীবন-জীবিকার পরিবর্তন ঘটানোটা সময়ের দাবি। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ইলিশ ধরা বন্ধ করতে সরকার যদি জেলেদের চাল দিতে পারে, অর্থ দিতে পারে, দেশের মানুষের জন্য সুস্বাদু মাছ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে, তবে অবশ্যই সরকার সীমান্তে এসব নৌকার ওপর নির্ভরশীল গুটিকয়েক মানুষের জীবিকার বিকল্পও ভেবে দেখতে পারে। সীমান্তে জনগণের চলাচলের জন্য বিশেষ নৌকার ব্যবস্থা করা যেতে পারে ও অন্যান্য নৌকা চলাচল বন্ধ করা যেতে পারে এবং নদী ও খাল দিয়ে চলাচলের একটা নির্দিষ্ট সময়সীমাও দেওয়া যেতে পারে। নৌকা চলাচলের এ পদক্ষেপ স্বল্প বা দীর্ঘ সময়ের জন্য হতে পারে। ইয়াবা চোরাচালানের কম বা বেশির ওপর নির্ভর করে এ অঞ্চলের নৌকা চলাচলে এ নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘ বা স্বল্পমেয়াদের হবে, তা নির্ধারণ করা যেতে পারে। এক লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটারকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য কয়েকশ' বর্গকিলোমিটারের অল্প কিছু মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য কিছুটা কম থাকলেও চলে এবং এতে ওই এলাকার জনগণ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে বলে আমার মনে হয়। লোকমুখে শুনেছিলাম, টেকনাফের ১৫ বছর আগের স্যাটেলাইটের ছবিতে গ্রামগুলোর যে দালানকোঠা ছিল, তা নাকি এখন ১০ গুণ বা তার চেয়েও বেশি দেখাচ্ছে। তা হলে প্রশ্ন হলো, টেকনাফবাসী এমন কি আলাদিনের চেরাগ পেল, যে গত ১৫ বছর গ্রামগুলোতে বড় বড় ইমারত বানিয়ে ফেলল। তাই যথাযথ কর্তৃপক্ষের টেকনাফের ইমারত, আলিশান বাড়িরও খবর নেওয়া দরকার। প্রয়োজনবোধে টেকনাফের বাইরের অন্যান্য শহরেও যদি তাদের (ইয়াবা ব্যবসায়ীদের) সম্পদ থেকে থাকে, তারও একটা হিসাব নেওয়া জরুরি। ইয়াবা ব্যবসায়ীদের নিজ পরিবারের সদস্যদের বেনামে পরিচালিত সব ধরনের ব্যাংক হিসাব অনুসন্ধান হওয়া প্রয়োজন এবং অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসা সব ধরনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করাও এখন সময়ের দাবি। ইয়াবার টাকায় তৈরি বাড়ি জব্দ ও বাড়ির সামনে বড় বড় সাইনবোর্ডে ইয়াবা বাড়ি, ইয়াবার টাকায় তৈরি বাড়ি জব্দ বা এ রকম বিশেষণ যোগ করা যেতে পারে। অনেকেই হয়তো ভাববেন, একটু বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে গেল না? আমার দৃষ্টিতে যারা দেশের যুব সমাজকে ধ্বংস করে আলিশান বাড়ি বানায়, সে বাড়ির সামনে শুধু সামান্য সাইনবোর্ড নয়, বাংলাদেশের জনগণ এ রকম বাড়ি ধুলার সঙ্গে মিশে গেলেও কিছু মনে করবে না।

আমরা আর একটিও টগবগে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় যুবককে হারাতে চাই না। আমরা একটি সুখী পরিবারকে ইয়াবার কারণে দুঃখী ও নিঃস্ব পরিবার হতে দেখতে চাই না। আমরা ইয়াবার কারণে আমাদের সমাজ ধ্বংস হয়ে যাক, তা চাই না। আমরা রাষ্ট্রের পাশে থাকতে চাই, মাদকের বিরুদ্ধে প্রচলিত সব অভিযানের পাশে থেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল বাড়াতে চাই। আমরা টেকনাফ মাদকের জনপদ নয়, সুখ-শান্তির একটি জনপদ হিসেবে দেখতে চাই।

সবশেষে বলতে চাই, আমরা মিথামফেটামিন ও ক্যাফিনের মিক্সারের আবদ্ধ থাকতে চাই না। শুনেছি, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে খুবই নগণ্য সংখ্যক হলেও কেউ কেউ ইয়াবা সেবন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত। তাই টেকনাফে নিয়োজিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের প্রতি তিন মাসে একবার করে মাদকাসক্ত কি-না, তা নিরূপণ করা জরুরি। এ ছাড়াও এ বাহিনীর যেসব সদস্য বেচাকেনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকবে, তাদের অবশ্যই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এ ধরনের সংবাদ প্রচারমাধ্যমে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে ছাপানোর দাবি করছি। ইয়াবার ক্ষতিকর দিকগুলো অবশ্যই টিভি চ্যানেলগুলোতে গুরুত্ব সহকারে প্রচার করা প্রয়োজন। ইয়াবায় নেশাগ্রস্তদের সাক্ষাৎকার নিয়েও তা প্রচার করা যেতে পারে। এতে দেশের সব বয়সের নারী-পুরুষরা ইয়াবার ক্ষতিকর দিকগুলো ভালোভাবে বুঝতে পারবেন ও ইয়াবা থেকে সজাগ থাকবেন।

ইয়াবা সমাজ থেকে নির্মূল করতে হলে জনসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। সমাজের ইয়াবা আস্তানাগুলোও সমাজের বসবাসকারী মানুষের বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অজানা নয়। তাই ইয়াবাকে রুখতে, মাদককে রুখতে জনগণ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সম্পৃক্ত করা খুবই জরুরি। কীভাবে এই সম্পৃক্ততা ঘটানো যায়, কত দৃঢ়ভাবে, কতটা কার্যকরভাবে করা যায়, তা নীতিনির্ধারকরাই ঠিক করবেন। সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতি অনুরোধ রইল, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সব সফলতাকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা আর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি অনুরোধ রইল, যেসব সাহসী সংবাদকর্মী-সাংবাদিক এই ইয়াবার তথ্য-উপাত্ত অনুসন্ধান করে জনগণকে সচেতন করেন, ইয়াবার বিস্তার রোধে দেশ ও জাতিকে সাহায্য করে তাদের নিরাপত্তা দিন- দেখবেন ইয়াবা নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়ে গেছে। আসুন, মাদকের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর প্রচলিত জিরো টলারেন্সে আমরা সবাই যোগদান করি।

সেনাসদর, কিউএমজির শাখা (এসটি পরিদপ্তর)
mdsaifulislam99@yahoo.com


মন্তব্য

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ