এরশাদ, জাতীয় পার্টি এবং তারপর...

বলা না-বলা

প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০১৯

এরশাদ, জাতীয় পার্টি এবং তারপর...

  আবু সাঈদ খান

জাতীয় পার্টিপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এখন সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। প্রায় ৯০ বছর বয়সী এরশাদের শরীরে নানা ধরনের বার্ধক্যজনিত জটিলতা দেখা দিয়েছে। তার জীবন শঙ্কামুক্ত নয় বলে এরশাদের ভাই ও জাতীয় পার্টি নেতা জিএম কাদেরের বরাদ দিয়ে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা বায়তুল মোকাররমসহ বিভিন্ন মসজিদে এরশাদের রোগমুক্তির জন্য প্রার্থনা করেছেন। আমিও তার রোগমুক্তি কামনা করি।

এরশাদ ভাগ্যবান। নানা দেশে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসকরা হয় ফাঁসিতে ঝুলেছেন নতুবা আমৃত্যু জেলে পচেছেন। এরশাদকে এমন ভাগ্যবরণ করতে হয়নি। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত এরশাদ দুই দশক ধরে বহাল তবিয়তে। ক্ষমতার স্বাদ ভোগ করে চলেছেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি জান্তার পক্ষাবলম্বন করেও ক্ষমতার শীর্ষে উঠতে তাকে কোনো বেগ পেতে হয়নি। অনেকের অজানা, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ এরশাদ রংপুরের সৈয়দপুরে ছিলেন। এ প্রসঙ্গে তখন পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত সেনা অফিসার (পরে মেজর জেনারেল) খাদিম হোসেন রাজা লিখেছেন, 'সৈয়দপুরের অস্থায়ী সেনাছাউনিতে লে. কর্নেল (পরে লে. জেনারেল ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি) ৩ বেঙ্গল রেজিমেন্টের দায়িত্বে ছিলেন। কিছুক্ষণ গুলি বিনিময়ের পর বাঙালি সেনারা ক্যাম্প ছেড়ে চলে যায়' ('আ স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওন কানট্রি, ইউপিএল; পৃষ্ঠা ৮৪)। বলা বাহুল্য, সে সময়ের লে. কর্নেল এরশাদ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গেই থাকলেন। তখন জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশাররফ, আবু ওসমান চৌধুরী, রফিকুল ইসলাম, অলি আহমেদ প্রমুখ বিদ্রোহ করেছেন। মেজর জলিল ছুটিতে থাকা অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন। মঞ্জুর, আবু তাহের প্রমুখ পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে যুদ্ধে যোগ দিয়েছেন।

এরশাদের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, যেসব বাঙালি কর্মকর্তা ও সিপাহি পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন বা ধরা পড়েছিলেন, তাদের বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। এরশাদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে না পারায় আফসোস করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে তাকে পশ্চিম পাকিস্তানে বদলি করা হয়েছিল। বদলি আদেশ পেয়ে তিনি জেনারেল ওসমানীর পরামর্শ চেয়েছিলেন। ওসমানী নাকি বলেছিলেন, সৈনিকের কাজ কমান্ডের নির্দেশ মান্য করা। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে পাকিস্তানে যেতে হয়েছিল।

স্বাধীনতার পর অন্য সব বাঙালি সেনা অফিসারের সঙ্গে এরশাদও দেশে ফেরেন এবং সেনাবাহিনীতে পুনর্বাসিত হন। জিয়া তাকে সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ করেন। উচ্চাভিলাষী এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করে সামরিক আইন জারি করেন। এক পর্যায়ে তিনি পুতুল রাষ্ট্রপতি আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে সরিয়ে নিজে রাষ্ট্রপতি হন। '৮৬-এর অক্টোবরে এরশাদের সাজানো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মূলধারার কোনো দল অংশ নেয়নি। '৮৬ ও '৮৮ সালে দুটি বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছিল। '৮৬-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ৮ দল অংশ নিলেও অল্পদিনের ব্যবধানে পদত্যাগ করেছিল। আর '৮৮-এর নির্বাচন আন্দোলনরত তিন জোটই বয়কট করেছিল। ক্ষমতা ধরে রাখতে আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়ন চলেছিল। তার লেলিয়ে দেওয়া সরকারি ও প্রাইভেট বাহিনী জীবন কেড়ে নিয়েছিল সেলিম, দেলোয়ার, বসুনিয়া, তাজুল, শাজাহান সিরাজ, ময়েজউদ্দিন, নূর হোসেন, ডা. মিলনসহ অনেকের। তার শাসনকালে সংবিধানে নানা অগণতান্ত্রিক বিধানসহ বিতর্কিত রাষ্ট্রধর্ম আইনও সংযোজিত হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, এরশাদের শাসনামলে ভালো কিছু কি হয়নি? নিশ্চয়ই হয়েছে। আমি গত সপ্তাহে প্রসঙ্গক্রমে লিখেছি, স্বৈরশাসকদের আমলেও ভালো কিছু হয়। এরশাদ আমলে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটেছে। উপজেলা ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ হয়েছে। দেশমুখী ঔষধ নীতি হয়েছে।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর জিয়া সেনাছাউনিতে বসে বিএনপি গঠন করেছিলেন। জিয়া নিহত হওয়ার পর তার পত্নী দলের হাল ধরেন। ক্যান্টনমেন্টমুখী দলটিকে জনমুখী দলে পরিণত করেন। ১৯৯১ এবং '৯৬ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে দুই মেয়াদ দেশ পরিচালনা করেন। এখন অবশ্য দলটির লেজেগোবরে দশা। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও এরশাদ সেনাছাউনিতে গড়া জাতীয় পার্টিকে টিকিয়ে রেখেছেন। রংপুরসহ কিছু জেলায় কতগুলো শক্তিশালী রাজনৈতিক-সাংগঠনিক পকেট ধরে রেখেছেন। আর আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সঙ্গে দরকষাকষি করে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছেন। গত দশ বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতার সঙ্গে আছেন। স্মার্ট খেলোয়াড়। একই সঙ্গে ক্ষমতার শরিক ও সংসদের বিরোধী দল। যখন যেটি বললে সুবিধা তাই বলছেন। মাথার ওপর মঞ্জুর হত্যার মামলা। থোড়াই কেয়ার করছেন। মামলা আদালতে উঠছে না। আদালত থেকে অনূ্যন অর্ধশতবার সময় নিয়েছেন। এরশাদকে তারিফ করতেই হয়!

আগামীতে দেখার বিষয়, এরশাদের অবর্তমানে জাতীয় পার্টির কী দশা হবে, কে হাল ধরবেন? তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, এরশাদের অবর্তমানে জাতীয় পার্টি কি টিকে থাকবে? ইতিমধ্যে রংপুরের এরশাদ প্রভাবিত কতক আসন আওয়ামী লীগ করায়ত্ত করেছে। এর কারণ সহজ, মানুষ কেন 'এ' টিম বাদ দিয়ে 'বি' টিম আঁকড়ে থাকবে?

এরশাদের রাজনীতির এখন দুই উত্তরাধিকার- তার পত্নী রওশন এরশাদ ও ছোট ভাই জিএম কাদের। এরশাদ কখনও ভাইকে সাইড লাইনে রেখে পত্নীকে নেতৃত্বে বসিয়েছেন আবার কখনও পত্নীকে সাইড লাইনে রেখে ভাইকে নেতৃত্বে বসিয়েছেন। এরশাদের অবর্তমানে কে নেতা হবেন- ভাবি না দেবর? এ নিয়ে জনগণের মধ্যে গুঞ্জন, জাতীয় পার্টিতে উত্তেজনা। কেউ কেউ বলছেন- রংপুর যার, নেতৃত্ব তার। সে বিবেচনায় বড় 'ছাওয়ালের' অবর্তমানে ছোট 'ছাওয়ালের' নেতৃত্ব পাওয়ার কথা; বউয়ের নেতা হওয়ার কথা নয়। উল্টো কথাও শুনছি, ভাবি মুরব্বি, তার ওপর দেবর কেন ছড়ি ঘোরাবে! এই দ্বন্দ্বের মাঝে এরশাদের সাবেক পত্নী বিদিশাও গণমাধ্যমে হাজির হয়েছেন। বলছেন, তিনি তো এরশাদপুত্র এরিখের মা। তা ছাড়া তারও জাতীয় পার্টির ঘরে শ্রম রয়েছে। তাই দলের প্রতি দরদও রয়েছে। তিনিও জাতীয় পার্টির সংকটকালে ভূমিকা পালনে প্রস্তুত।

অনেকেরই ধারণা- এরশাদ নেই, জাতীয় পার্টিও নেই। এরশাদের অবর্তমানে জাতীয় পার্টি টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। কিন্তু আরও ভাববার আছে। জাতীয় পার্টির সংকট ও দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের সংকট একরেখায় মিলেছে। দশম সংসদে ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিসহ বিভিন্ন দল নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় সংসদে বিরোধী দল ছিল না। তখন জাতীয় পার্টি মহাজোটের শরিক হয়ে নির্বাচন করার পর দলটিকে বিরোধী দলের শূন্যস্থান পূরণ করতে হয়েছে।

সংসদীয় গণতন্ত্রের এই সংকট এবারও রয়েছে। নির্বাচনের পর বিএনপি, গণফোরাম তথা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সংসদ বয়কটের ঘোষণা দিলে ক্ষমতাসীনরা যে সংকটে পড়েছিলেন, জাতীয় পার্টিকে আবার সংসদের বিরোধী আসনে বসিয়ে তা মোচন করেছে। এখন বিএনপি সদস্যরা সংসদে এলেও তাদের ওপর ক্ষমতাসীনরা ভরসা করতে পারছেন না। কারণ, যে কোনো সময় বিএনপি সাংসদরা সংসদ বর্জন, এমনকি পদত্যাগও করতে পারেন। এমন অবস্থায় জাতীয় পার্টিই ভরসা। তাই এরশাদের অবর্তমানেও তারা উপেক্ষণীয় হবেন না। তখন জাতীয় পার্টিকে টিকিয়ে রাখা হবে সরকারেরও দায়। তাছাড়া জাতীয় পার্টির দুই অংশই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুগত। বিভিন্ন সময়ে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ মেটাতে রওশন গ্রুপ ও কাদের গ্রুপ উভয়ই প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।

তাই আমার মনে হয়, এরশাদের অবর্তমানে জাতীয় পার্টি জীবন্মৃত হলেও তা ক্ষমতাসীনদের দেওয়া 'লাইফ সাপোর্টে' আগামী নির্বাচন পর্যন্ত আয়ু পেলেও পেতে পারে।

সাংবাদিক ও লেখক
ask_bangla71@yahoo.com


মন্তব্য