স্মৃতি ও শ্রদ্ধায় মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

শ্রদ্ধাঞ্জলি

প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০১৯

স্মৃতি ও শ্রদ্ধায় মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

  ফরিদুর রেজা সাগর

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরও আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। কে কবে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে, সেটা মহাকালের হিসাব। মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর যখন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন, তখন ব্যাংককের একটা হাসপাতালে দেখা করতে গিয়েছিলাম। সবাই বলেছিল, প্রিয় জাহাঙ্গীর ভাই হয়তো আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। তাই ব্যাংকক আসা। কিন্তু গিয়ে দেখলাম, অন্য এক মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরকে। প্রচণ্ড মনোবল। বেঁচে থাকার দারুণ স্পৃহা। বললেন, আমি এত সহজে যাচ্ছি না। সুস্থ হয়ে ফিরে তোমাদের সঙ্গে টেলিভিশনের পর্দায় নতুন নতুন অনুষ্ঠান করব। সত্যি সত্যি কথা রেখেছিলেন মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর। সুস্থ হয়ে ব্যাংকক থেকে ফিরে এসে চ্যানেল আইয়ের পর্দায় নানা রকম অনুষ্ঠান করেছিলেন।

তিনি চ্যানেল আইতে প্রতি শুক্রবার লাইভ অনুষ্ঠান 'টেলি সময়' একটানা করে গেছেন। বই নিয়ে অনুষ্ঠান, সরাসরি সংবাদপত্র বিষয়ক অনুষ্ঠানসহ নানা ধরনের অনুষ্ঠানে তিনি অংশগ্রহণ করতে থাকেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনে বলা চলে প্রথম সরাসরি অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ছিলেন তিনি। অনুষ্ঠানের নাম ছিল- 'আপনি কি ভাবছেন'। প্রযোজক ছিলেন বেলাল বেগ। সেই সময় মোবাইল ফোন ছিল না। শুধু ল্যান্ডফোন। ফলে অনুষ্ঠান প্রচারের সময় ল্যান্ডফোনের অপর প্রান্তে কে কী বলছে, সেটা শোনার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তাহলে অনুষ্ঠান হবে কী করে? কিন্তু সেই সময় টেলিভিশন অনুষ্ঠানে কারিগরি সুবিধা ছাড়াও আরেকটি বড় সুবিধা ছিল উপস্থাপকদের উৎসাহ ও আগ্রহ। যে কারণে নানা রকম পরিকল্পনা করে 'আপনি কি ভাবছেন' অনুষ্ঠানটি মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরের উপস্থাপনায় একটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠান হিসেবে দীর্ঘদিন দর্শকদের মনে প্রভাব  বিস্তার করে।

সত্তরের দশকে দৈনিক পাকিস্তানে বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার হিসেবে সাংবাদিকতা জীবন শুরু করেন। '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় যে গৌরবময় ভূমিকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাখে, সেই বিষয়টাকে আরও তীব্র ও স্পষ্ট করে তুলেছিলেন একজন তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার। দৈনিক পাকিস্তান পরবর্তী পর্যায়ে দৈনিক বাংলায় শেষ পৃষ্ঠায় সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়ে ওঠে মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরের লেখা। সে সময়কার একটি বিখ্যাত লেখার শিরোনাম ছিল-পাকিস্তানীদের কাছে তিন অপরাধী : শহীদ মিনার, রবীন্দ্রনাথ ও শেখ মুজিব।

আজকে মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর চলে যাওয়ার পর বারবার মনে হচ্ছে, একজন টেলিভিশন উপস্থাপক কিংবা সাংবাদিক আমাদের ছেড়ে চলে যাবে, সেটা সত্যি। কিন্তু তার সৃষ্টিগুলো শুধু কি আমরা স্মৃতিতেই ধরে রাখব? টেলিভিশন ও দৈনিক পত্রিকা ছাড়াও মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর মুদ্রণশিল্পের সঙ্গে নিজেকে নানাভাবে জড়িয়ে রেখেছিলেন। দেশের প্রথম বিজ্ঞানবিষয়ক পত্রিকা বিজ্ঞান সাময়িকী, নাট্যবিষয়ক পত্রিকা থিয়েটার, করপোরেট প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। পারাপার নামে একটি পত্রিকার প্রচ্ছদ করার সময় সবাই যখন মসৃণ অংশে ছাপার কথা ভাবছেন, তখন তিনি কাগজের খসখসে অংশে প্রচ্ছদ ছাপলেন এবং আলী ইমাম, কবির আনোয়ার, চিন্ময় মুৎসুদ্দী প্রমুখ খুব প্রশংসা করলেন।

পত্রিকা, টেলিভিশন ছাড়াও মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর শিল্পাঙ্গনের যে কোনো ব্যাপারেই উৎসাহ দিতে কার্পণ্য করতেন না। 'দেশ' পত্রিকায় ঢাকা-প্রতিনিধি ছিলেন দীর্ঘদিন। দৈনিক বাংলায় দীর্ঘদিন বই আলোচনা করেছেন। টেলিভিশনে লাইভ অনুষ্ঠান ছাড়াও শিল্প-সাহিত্য বিষয়ক নানা অনুষ্ঠান করেছেন। নৃত্যশিল্পীদের নিয়ে একটা সংগঠন করে বাংলাদেশে নৃত্যচর্চার পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন।

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরকে নিয়ে অনেকের অনেক কিছু লেখার আছে, বলার আছে। মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আমার বাবা চিত্র পরিচালক ফজলুল হকের নামে যে পুরস্কার দেওয়া হয়, সেই কমিটির তিনিই ছিলেন আহ্বায়ক। আমার একজীবনের টেলিভিশন বইয়ের মুখবন্ধ তিনি লিখে দিয়েছিলেন।

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর জানতেন কোন কাজটা তাকে করতে হবে। কোনটা হবে না। সে জন্যই অল্প একটু জীবনে তার কর্ম ও সাফল্য অনেক।

লেখক ও নির্মাতা; ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক


মন্তব্য