ক্রসফায়ারে নয়, আইনি প্রতিকার

অপরাধ

প্রকাশ : ১০ জুন ২০১৯

ক্রসফায়ারে নয়, আইনি প্রতিকার

  আবু আহমেদ ফয়জুল কবির

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর 'ক্রসফায়ারে' নিহতের সংখ্যা বেড়ে চলছে। ২০১৮ সালের মে মাসে শুরু হওয়া মাদক নির্মূল অভিযানে চলতি বছরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত এক বছরে নিহত হয়েছে ৩৪৮। মানবাধিকার কর্মীরা এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন। বিনা বিচারে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বা প্রাণ সংহার বন্ধের দাবি অবশ্য দীর্ঘদিনের। বক্তব্য, বিবৃতিসহ নানাভাবে বিনা বিচারে এ রকম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ চলমান রয়েছে। তারপরও এসব প্রতিবাদ ও নিন্দা উপেক্ষা করে হত্যাকাণ্ড চলছেই।

মাদক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের বিচারের পাশাপাশি তাদের পীড়নে দেশের মানুষকে উৎকণ্ঠায় দিন কাটাতে হচ্ছে, ভুক্তভোগীসহ সচেতন নাগরিকরা সবসময়ই মাদক নির্মূলে পদক্ষেপ কামনা করে আসছে। তবে অনেক সময় ভুক্তভোগীরা বা সাধারণ মানুষ তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এসব হত্যাকাণ্ডে স্বস্তিবোধ করার বিষয়টিকে তুলে ধরা হয়। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রতিক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র তার ব্যবস্থার পরিবর্তন আনতে পারে না কিংবা বলা যায়, রাষ্ট্রনীতি প্রণীত হয় না। রাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করা হয়- সুচিন্তিত, সুদৃঢ়প্রসারী ও বিশ্নেষণের ওপর নির্ভর করে, যার মাধ্যমে উঠে আসে নীতিনির্ধারকদের এবং রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের অভিজ্ঞতা, স্বচ্ছতা, পাণ্ডিত্য এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের প্রতি প্রতিশ্রুত অঙ্গীকার ও মানবাধিকারের প্রতি সম্মানবোধ থেকে। আমাদের সংবিধানের ৩২নং অনুচ্ছেদে জীবনের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। যেখানে উল্লেখ রয়েছে, 'আইনানুযায়ী ব্যতীত কোনো ব্যক্তিকে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।' জাতিসংঘের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের সনদেও উল্লেখ করা হয়েছে

এই অধিকারের কথা। বাংলাদেশ সেই সনদে স্বাক্ষর করেছে।

স্বাধীনতা-উত্তরকালে বাংলাদেশ বারবার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় হোঁচট খেয়েছে। দুটি সামরিক শাসনের সময়কাল স্বাধীনতার মূল স্তম্ভ আমাদের সংবিধানকে নাড়িয়ে দিয়েছে। সমাজে ন্যায়বিচার প্রাপ্তিসহ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায় যে বাংলাদেশ যাত্রা করেছিল, ঠিক যেন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হওয়ার পর্যায়ে নেমেছিল। গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় সবসময় আইনের শাসনের ব্যাপ্তিই হতে পারে একটি দেশের বা জাতির মানদণ্ড নির্ণয়কের মাপকাঠি। গত ২০ বছরের রাজনীতিতে যারাই সরকার পরিচালনার দায়িত্বে এসেছে কিংবা বলা যায় দায়িত্ব পেয়েছে, কেন যেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বুকে তুলে নেওয়ার প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের। বোধ করি সরকারে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো বুঝে গেছে শাসনব্যবস্থায় কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি ভীতির পরিবেশ তৈরি করতে পারাটা জরুরি। আর তাই যৌথ বাহিনীর অভিযান, অপারেশন ক্লিনহার্ট, র‌্যাব নামের এলিট ফোর্স সৃষ্টিসহ নানা উদ্যোগ নিতে হয়েছে। লক্ষ্য করলে স্পষ্টত বোঝা যায়, এ ধরনের অভিযানের সঙ্গে হত্যা-নির্যাতন শব্দগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আত্মরক্ষায় গুলি ছোড়ে এমন বক্তব্যকে সমর্থন করে যাচ্ছে দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা শুরু থেকে। একটু আশ্চর্য লাগে, অভিজাত বাহিনীর সদস্যরা তো তারাই হয়, যারা অত্যন্ত উন্নতমানে গত প্রায় ২০ বছর ধরে নর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তারা কিনা গুলি ছুড়ে থাকে বুক বরাবর কিংবা মাথা বরাবর। ধারাবাহিকভাবে মাথায়-বুকে গুলি করে যাচ্ছে। আর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একই গল্পের পুনরাবৃত্তি করানো হচ্ছে। আমরা প্রায় ২০ বছর ধরে আমাদের রাষ্ট্রকে একই কায়দায় দেখছি, কেন আমরা এসব অগ্রহণযোগ্য হত্যাকাণ্ড বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছি না, সেটা একটা বড় প্রশ্ন! এই অসাংবিধানিক এবং বেআইনি হত্যাকাণ্ড বন্ধে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে, যদি বাংলাদেশকে একটি উন্নত মানবিক রাষ্ট্রে উন্নীত করতে হয়। আমরা বিচার বিভাগ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে দিয়ে দিতে পারি না। অভিযুক্ত যেই হোক না কেন, তার ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আছে।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে সন্ত্রাসীর কিংবা অপরাধীর মৃত্যুর যেন রাষ্ট্রীয় অনুমোদন দেখা যাচ্ছে। সাময়িকভাবে কোনো কোনো মহলকে এই প্রক্রিয়ায় স্বস্তি দিতে পারে; কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় আমাদের চলমান বিচার ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থাহীনতার প্রসঙ্গটি সামনে নিয়ে আসছে। অনেক সময় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, গুলিবিদ্ধ মৃতদেহের পাশে উদ্ধারকৃত অস্ত্রগুলোর একটিও কি কোনো পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে? প্রকৃতই নিহতরা এসব অস্ত্র প্রয়োগ করেছিল কিনা? উদ্ধারকৃত অস্ত্রগুলো ব্যালেস্টিক নিরীক্ষার দাবি বিবেচনায় নেওয়া  যেতে পারে।

দিনের পর দিন একই কায়দায় হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার প্রবণতা থেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বের করে আনার একটা কার্যকর উদ্যোগ আমরা দেখতে চাই। আইন ও বিচার ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে রাষ্ট্রীয় সংস্থা বা বাহিনীর হাতে মানুষের মৃত্যুর ঘটনাকে সাধারণভাবে বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। একটি দেশের প্রতিষ্ঠিত আইন ব্যবস্থা ও আইনের বিধিবিধানের যথাযথ প্রয়োগেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব। বাংলাদেশের সংবিধান তার সব নাগরিকের জীবনের অধিকারকে নিশ্চয়তা দিয়েছে। অনুচ্ছেদ ২৭ অনুযায়ী সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। এই অধিকার রক্ষা করা বা সুরক্ষা প্রদান করাই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্তব্য। এ ব্যক্তি আদালতের রায়ে অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত হলেও তাকে আইনে বর্ণিত সব ধাপ যথাযথভাবে অনুসরণের পর রায় কার্যকর করা হয়। আর সেখানে বিচার আরম্ভ হওয়ার আগেই অথবা বিনা বিচারে

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে মানুষের মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না।

মানবাধিকার কর্মী, আইন ও সালিশ কেন্দ্রে

(আসক) কর্মরত


মন্তব্য