মো. রহমত উলল্গাহ্‌

শিক্ষক ও পরিচালনা পর্ষদ ভালো হলে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের সফলতা। যোগ্য প্রতিষ্ঠানপ্রধানই প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নয়নে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেন। নিশ্চিত করেন শিক্ষার সুন্দর পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা। বিভিন্নমুখী সহশিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের করে তোলেন মননশীল। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রতিনিয়ত প্রদান করেন উদ্দীপনা, বৃদ্ধি করেন কর্মউদ্যম, নিশ্চিত করেন সফলতা। শিক্ষার্থীদের প্রদান করেন নৈতিক, আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষা। গড়ে তোলেন ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবক সুসম্পর্ক। নিশ্চিত করেন প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন। এছাড়াও একজন ভালো প্রতিষ্ঠানপ্রধান প্রতিনিয়ত করে থাকেন আরও অনেক শুভ কাজ। এক কথায় জুতা সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ পর্যন্ত করতে হয় একজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানকে। তাই তার থাকতে হয় নানামুখী যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা, যা তালিকা করে শেষ করা অসম্ভব। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান, ধরন, অবস্থা ও অবস্থান অনুসারে যথাযোগ্য প্রধান বাছাই করা খুব সহজ কাজ নয়। যারা বাছাই করবেন তাদেরও থাকতে হবে ততোধিক সততা, দক্ষতা, নিরপেক্ষতা ও দূরদর্শিতা।

আমাদের দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান নিয়োগে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার একটা প্রচলন বিদ্যমান। অথচ এই লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার লিখিত কোনো বিধান বা বাধ্যবাধকতা নেই। তদুপরি নেওয়া হলে কোনো কোনো বিষয়ক প্রশ্নে শতকরা কত নম্বরের লিখিত এবং কত নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা নিতে হবে, তাও নির্ধারিত নেই। তাই এ ক্ষেত্রে নিয়োগ নির্বাচনী কমিটির স্বেচ্ছাচারিতার অবাধ সুযোগ বিদ্যমান। আমি মনে করি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগের জন্য বাছাই প্রক্রিয়ায় একজন প্রার্থীর কোনো কোনো বিষয়-দিক কীভাবে কতটুকু মূল্যায়ন করতে হবে, তার একটা সুনির্দিষ্ট নীতিমালা জারি থাকা আবশ্যক। সে ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্ট্যাটাস অনুসারে যথাযোগ্য প্রধান নিয়োগের বাছাই প্রক্রিয়ায় প্রাসঙ্গিক লিখিত পরীক্ষা ও দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের পাশাপাশি অনুসরণ করা যেতে পারে আমাদের জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান প্রধান নির্বাচনের জন্য প্রবর্তিত কিছু কৌশল বা নীতিমালা। যার আলোকে মূল্যায়ন করা যেতে পারে একজন প্রার্থীর যোগ্যতা : ১. শিক্ষাগত যোগ্যতা; ২. অভিজ্ঞতা; ৩. জ্ঞান ও নিষ্ঠা; ৪. পরিবেশ সচেতনতা, সৃজনশীলতা ও দূরদর্শিতা; ৫. ছাত্রছাত্রী ও সহকর্মীদের ওপর প্রভাব এবং অভিভাবক ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতার প্রবণতা; ৬. চারিত্রিক দৃঢ়তা, ব্যক্তিত্ব, সততা ও সুনাম; ৭. দায়িত্ব-কর্তব্যবোধ এবং প্রশাসনিক দক্ষতা ও আর্থিক শৃঙ্খলা; ৮. মাল্টিমিডিয়া ক্লাসে আগ্রহ ও আইসিটি বিষয়ে দক্ষতা; ৯. সহশিক্ষা বিষয়াদিতে আগ্রহ ও দক্ষতা; ১০. পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও পেশাগত-গবেষণামূলক সৃজনশীল প্রকাশনা; ১১. গুণগত মানের শিক্ষায় উদ্ভাবনী-সৃজনশীল উদ্যোগ ও উত্তম চর্চার নিদর্শন; ১২. দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধ। উলিল্গখিত বিষয়গুলোতে থাকা উচিত ৬০ শতাংশ নম্বর। যদিও এসব বিষয় সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ কাজ। এ ক্ষেত্রে যে প্রার্থী ছাত্র জীবনে ভালো ছাত্র ছিলেন, ক্লাসে ক্যাপ্টেন ছিলেন, রোভার স্কাউট বা গার্স গাইড লিডার ছিলেন, সাংবাদিকতা-লেখালেখিতে সক্রিয় ছিলেন, রচনা-বক্তৃতা-বিতর্কে বিজয়ী ছিলেন, জাতীয় দিবস উদযাপনে সক্রিয় ছিলেন, কল্যাণমুখী ক্লাব বা সংগঠনের উদ্যোক্তা-নেতা ছিলেন, স্টুডেন্ট কেবিনেট-কাউন্সিলে নির্বাচিত ছিলেন, শিক্ষকদের খুব প্রিয় পাত্র ছিলেন, সর্বোপরি শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী নির্বাচিত হয়ে ছিলেন এবং যিনি কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান হয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উলেল্গখযোগ্য সততা, দক্ষতা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন বা শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান প্রধান নির্বাচিত হয়েছেন; এমন প্রার্থী-প্রার্থীরা পেতে পারেন অন্যের তুলনায় অধিক নম্বর। উলিল্গখিত বিষয়গুলোর আলোকে সঠিক জীবনবৃত্তান্ত মূল্যায়নের মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে বাছাই করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ করা হলে অবশ্যই অধিক লাভবান হবে শিক্ষার্থী।

অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা


মন্তব্য