ঈদের চাঁদ :জটিলতা ও বিধান

প্রকাশ : ০৯ জুন ২০১৯

ঈদের চাঁদ :জটিলতা ও বিধান

   ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন

রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বরকতপূর্ণ মাস হলো পবিত্র রমজান। খুশি ও প্রত্যাবর্তনের ঈদুল ফিতর উদযাপনের মধ্য দিয়ে মহিমান্বিত এ মাসের সমাপনী ঘটে। রোজাব্রত পালন আর ঈদ উদযাপন- এ দুয়ের মাঝে রয়েছে চাঁদ দেখার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়; যার ওপর একটি দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় ভাবাবেগ মিশ্রিত তীক্ষষ্ট ও সতর্ক দৃষ্টি থাকে। সরকারি পর্যায়ে ও ধর্মীয় অঙ্গনে চাঁদ দেখার সুষ্ঠু আয়োজন থাকার পরও আমাদের দেশে প্রায়ই চাঁদ দেখা, ঈদের ঘোষণা এবং রোজা পালন ও ভঙ্গের ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতার সৃষ্টি হয়। আমরা চাঁদ ও চাঁদ দেখার বিষয়ে পবিত্র কোরআনের একটি বাণী দেখে নিতে পারি, যেখানে মহান আল্লাহ তাঁর হাবিবকে বলছেন- 'য়াসআলুনাকা আনিল আহিল্লাহ কুল হিয়া মাওয়াকিতু লিন্নাসি ওয়াল হাজ।' অর্থাৎ আপনাকে লোকেরা নতুন চাঁদ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করবে- আপনি বলে দিন, এটা মানুষ ও হজের জন্য সময় নির্দেশক। আয়াতে 'আহিল্লাহ' শব্দটি বহুবচন। তার অর্থ হচ্ছে একাধিক নতুন চাঁদ, যা একেক অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে উদিত হবে। এর দ্বারা সৌদি আরবে চাঁদ দেখা গেলে যে আমাদের দেশেও রোজা বা ঈদ পালন করতে হবে- এ বিষয়টি বাতিল হয়ে যায়। কোরআনুল কারিমের এ আয়াতে স্পষ্টতই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, নবচন্দ্রের উদয় মানুষের ইহজাগতিক সময় ব্যবস্থাপনার এক নির্দেশক হিসেবে কাজ করবে। সুতরাং এর সঙ্গে রোজাব্রত পালন ও ভঙ্গ করা এবং পবিত্র ঈদ উদযাপনের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর তা মহানবীর (সা.) বাণীতে আরও পরিস্কার হয়ে উঠেছে- 'তোমরা চাঁদ (রমজানের) দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ (শাওয়ালের) দেখেই রোজা ভাঙো।' বুখারি, মুসলিম ও নাসায়ি শরিফে বর্ণিত এ হাদিসে পাকে কোনো অস্পষ্টতা নেই। বরং সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে রোজা পালন ও রোজা ভঙ্গ করার বিষয়ে, যা পালন করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্যই অবধারিত। আমাদের দেশে চাঁদ দেখা বিষয়ে দায়িত্ব পালন করে আল হেলাল তথা চাঁদ দেখা কমিটি; যাদের নিষ্ঠা ও কর্তব্য পালনের মধ্য দিয়ে এ বিষয়ে আমরা আশ্বস্ত থাকি। কিন্তু যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে এবং চাঁদ দেখতে না পাওয়া যায় তবে হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী আমাদেরকে ৩০ রমজান পূর্ণ করতে হবে। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে অত্যাধুনিক যন্ত্রাদি প্রয়োগে তথা দূরবীক্ষণ দিয়ে চাঁদ দেখা নিষিদ্ধ নয়; এমনকি প্রযুক্তি প্রয়োগে যদি চাঁদ দেখা হয় তবে তার ওপর আমল করাও নাজায়েজ হবে না।

এবারের ঈদুল ফিতরের রাত থেকেই আলোচনার বিষয় ঈদের চাঁদ। রাত ৯টায় চাঁদ দেখা যায়নি- ঘোষণা শুনে আলহামদু লিল্লাহ বলে মুসল্লিরা তারাবিহর নামাজ আদায় শেষে যার যার মতো ঘরে ফেরেন। কিছু সময় পর অনেকে ঘুমিয়ে পড়েন আবার কেউ কেউ জেগেও থাকেন। আমি ঘুমাতে যাইনি, বরং আমার সামনে থাকা লোকজনকে বলি, একটু অপেক্ষা কর, দেখবে আবারও একটি ঘোষণা আসবে এবং সেটি হবে চাঁদ দেখতে পাওয়া ও আগামীকাল ঈদুল ফিতর উদযাপনের। আমি নিছক ধারণা থেকেই এমনটি বলেছিলাম। ঠিকই রাতের প্রায় মধ্য-প্রহরে সেই ঘোষণাটি এলো আর যথারীতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সর্বত্র আগের ঘোষণার প্রতিক্রিয়ার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখে তুমুল আলোচনা, সমালোচনা, হর্ষ-বিষাদ, নিন্দা-ক্ষোভ আর বিনোদনের ঝড় উঠল। ধর্ম প্রতিমন্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি-জানি। দেশের আলেম সমাজ ও ইসলামের সংবিধিবদ্ধ নিয়ম-কানুনের ব্যাপারে তাকে সব সময় শ্রদ্ধা ও আনুগত্যের পরাকাষ্ঠা বহন করতে দেখেছি। একটু ভেবে দেখুন, চাঁদ না দেখেই অথবা সরকারি বরাতে সাক্ষ্য-প্রমাণসহ চাঁদ দেখার খবর দিয়ে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী যদি ঈদের ঘোষণা দিয়ে দিতেন, আর দেশের কোনো কোনো এলাকা থেকে ধীরে ধীরে প্রভাবশালী আলেম ও তার অনুসারীরা এর বিপক্ষে অবস্থান নিতেন, তবে কী হতো? কিন্তু মধ্যরাতের ঘোষণা সেই আলেমদেরই কারও কারও সাক্ষ্যের ফল; যা সাময়িক বিনোদনের জন্ম দিলেও পুরো দেশের মানুষ মেনে নিয়েছে এবং যথারীতি ঈদ উদযাপন করেছে। বিষয়টি ধর্মীয় বলে সরকার এখানে ধর্মীয় বিধি-বিধান ও আলেমদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও মূল্যায়ন করেছে, যা ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্টতই প্রতীয়মান। তবে আমার একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। সেটি হলো, যারা চাঁদটি দেখেছেন এবং হেলাল কমিটিকে জানিয়েছেন, তারা তো চাঁদকে সন্ধ্যা রাতেই দেখেছেন, তবে খবরটি দিতে তারা এতটা বিলম্ব করলেন কেন? এ প্রশ্নের জবাব তাদেরই দিতে হবে।

লেখক ও গবেষক; অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ