তবে কিছু না খেলেই হয়!

অন্যদৃষ্টি

প্রকাশ : ০৮ জুন ২০১৯

   অরুণ কুমার বিশ্বাস

খাবারে ভেজাল নিয়ে মেলা ক্যাঁচাল লেগেই আছে। আমাদের বিশিষ্ট খাদককুল আকুল হয়ে ভাবছেন, রাত পোহালে খাবেন কী! সবটাতেই ভেজাল। খাদ্যখানা, ফলমূল, শাকসবজি, মিষ্টি-সেমাই, জাম-জামরুল, লুচি-তক্কারি, কিসে নেই ভেজাল! যেন দেশজুড়ে আমরা স্রেফ ভেজালের পসরা মেলে বসেছি আর কি! কিন্তু ভাই আমি সবিনয় জানতে চাই, দিনভর এমন খাই-খাই না করলে কি চলছে না! ঘরের খাবার রেখে আপনাকে রেস্তোরাঁয় যেতে কে বলেছে! আপনি কি জানেন না যে, সেখানে মরা মুরগির রোস্ট সার্ভ করা হয়। জেনেশুনে যদি বিষপান করতে চান তো তাহলে আপনাকে ঠেকায় কে! মিষ্টির কড়ায় এত্ত বড় বড় তেলাপোকা আর টিকটিকি আরামসে ডুবসাঁতার কাটে, এ আর নতুন কী! তারপরও আপনাকে সেই মিষ্টিই খেতে হবে! মিষ্টিতে সুগার বাড়ে, ট্রান্সফ্যাটের কারণে মেদবহুল শরীর নিয়ে হাঁটতে বড়ই কষ্ট হয়, এসব জেনেও আপনি মিষ্টি খাবেন! কেন ভায়া, আপনার এত নোলা কিসের শুনি!

এক শ্রেণির খাদক আছে দেখবেন, এরা কিন্তু মৌসুমি ফল বাদ দিয়ে সব 'আনকমন' ফল খাবে। তার যে খুব টাকার গরম, সেটা দেখাতে হবে তো, নাকি! বাজারে তখনও লিচু আসেনি অথচ চড়া দামে ৮০টা লিচু পাঁচ কুড়ি মনে করে পাঁচশ' টাকা দিয়ে কিনে খেতে হবে। টাকা কি এতই সস্তা! খোলামকুচি নাকি!

ইদানীং খেয়াল করবেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ দপ্তরের কর্তাবাবুরা আপসে খুব দৌড়ঝাঁপ করছেন। বছরের অন্য সময়ে অবশ্য তাদের দেখা মেলা ভার। হাইকোর্ট চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার পর তাদের কর্মকাণ্ডে কিঞ্চিৎ গতি এসেছে বটে; কিন্তু স্রেফ আর্থিক জরিমানা কেন বাপু! খাবারে যারা ভেজাল মেশায় তারা তো একরকম খুনি। যার হাতে পিস্তল আছে সে সোজাসুজি কপালে বন্দুকের নল ঠেকায়, আর এই ভেজালকারীরা স্লো পয়জনের মতো করে আস্তে ধীরে মানুষ মারে। এদের অন্তত বছর দশেক জেল তো হতেই পারে। একেই বলে গুরুপাপে লঘুদণ্ড।

লক্ষ্য করে দেখবেন, আমের সিজন আসার আগেই একদল পেটুক আম কেনার জন্য একেবারে হামলে পড়ে। আমের বাইরেটা হলুদ, কিন্তু আঁটি পাকেনি। পাকা তো দূরের কথা, আঁটি শক্তও হয়নি। অথচ সেই আম কিনে বগল বাজাতে বাজাতে বাসায় ফেরে। অধিদপ্তর বলছে, তাদের এত লোকবল কই যে অপরাধী ধরবেন! খাসা কথা বটে! দেশে কি বেকারের অন্ত আছে! এদের দু'চার হাজার নিয়োগ দিলেই হয়! আর তা যদি না পারেন তো বিষ খাবার আগে আম পাবলিক সচেতন হোন। আপনাকে তো আর কেউ জোর করে এসব খাওয়াচ্ছে না।

কিছু কিছু লোক আছে দেখবেন, দিনে অন্তত একবেলা বাইরে না খেলে তাদের মনে সুখ আসে না। পিৎজা-পাস্তা খাওয়া নাকি এখন স্ট্যাটাস-সিম্বল। মাসে কে কতবার কোন কোন দামি রেস্তোরাঁয় বসে আকণ্ঠ উদরপূর্তি করেছে, সেই হিসাবে ব্যক্তির সম্মান ও স্মার্টনেস নির্ণীত হয়। ইকোনমিক্সের থিওরি বলে, চাহিদা তৈরি হলেই তার সরবরাহ বাড়ে। চোর চুরি করবে আর আপনি ঘরের দরজা-জানালা খুলে বসে থাকবেন, তা তো হয় না। খাবারে যারা ভেজাল মেশায় তারা মনুষ্যকুলের অযোগ্য; কিন্তু বুদ্ধিমান লোক হিসেবে আপনাকেও সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে। বাচ্চা একবার কাঁদলেই অমনি তাকে বগলদাবা করে নিয়ে ঠুসে পিৎজা বা ফাস্টফুড খাওয়াতে রেস্তোরাঁয় যাবেন কেন! উল্টাসিধা খাবারের ডিমান্ড কমান, বাচ্চাকে বোঝান, দেখবেন ভেজাল খাবার বাজারে আর চলবে না। সেই সঙ্গে বলে রাখা ভালো, মানুষ কিন্তু এমনি আইন মানে না। তাকে আইন মানাতে হয়। আইনের পশ্চাতে পীড়ন আছে বলেই দুষ্টুলোকেরা সোজা পথে হাঁটে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের নামে টিভি ক্যামেরাসমেত টুকটাক বউ-ছির মতো মিষ্টি-মালাইয়ের দোকান ছুঁয়ে এলে কি আর ভেজাল কমে! আইনের প্রয়োগ আরও কঠোর করতে হবে।

কথাসাহিত্যিক ও অতিরিক্ত কমিশনার, বাংলাদেশ কাস্টমস


মন্তব্য