বাজেট নিয়ে প্রত্যাশা

প্রকাশ : ১৩ জুন ২০১৯

  মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান

'সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ' শিরোনামে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২০১৮ নির্বাচনী ইশতেহারে আগামী পাঁচ বছরের (২০১৯-২৩) লক্ষ্যমাত্রা ও কর্মসূচির যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, এবারের বাজেটে তার একটি হাতছানি লক্ষ্য করা যায়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৭ দশমিক ৮৬ হারে এবং আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১০ শতাংশ। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নির্বাচনী ইশতেহারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় হবে ৫ হাজার ৪৭৯ ডলারেরও বেশি, যা বর্তমানে (২০১৮) এক হাজার ৭৫১ মার্কিন ডলার।

বাজেটের কাহিনীতে আমরা সবাই শুনে থাকি বাজেট ঘাটতি এবং এই ঘাটতি পূরণে প্রথমেই অস্ত্রোপচার হয় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে। আশা করি, এবার তা হবে না এবং নির্বাচনী অঙ্গীকারেও শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের ব্যাপারে পরিস্কার ও বিশদ লক্ষ্যমাত্রা ও পরিকল্পনার কথা বিস্তারিত ব্যক্ত করা হয়েছে। কর্মকৌশল নির্ধারণ করে বাজেট প্রণয়নে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নে বরাদ্দ যা লাগার লাগুক না। যেহেতু বাজেট হচ্ছে সরকারি আয়-ব্যয়ের সংখ্যাগত হিসাব এবং আমাদের সরকার সাধারণত আগে ব্যয় নির্ধারণ করে; পরে আয়ের উৎস ঠিক করে; তাই সংশোধিত বাজেটকেই আসলে মূল বাজেট হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

আর যখনই বাজেট সংশোধন হয়, তখনই মানবসম্পদ সম্পর্কিত উন্নয়ন বাজেটে বড় ধরনের কাটছাঁট হয় এবং দেখা দেয় সেক্টর বাজেট ঘাটতি। সাধারণত বিভিন্ন মহল থেকে দাবি বা চাহিদা না থাকলে খাতভিত্তিক বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ হয় না। আবার এটিও ঠিক যে, আমাদের কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বরাদ্দকৃত (যাই হোক) বাজেটও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয় না। অন্যদিকে গরিবের পক্ষে দাবি তোলার কেউ নেই; তাই দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারকেই নানা প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে আসতে হয়। এ পর্যন্ত নিরাপত্তা বেষ্টনীর বরাদ্দ এবং নানামুখী দারিদ্র্য বিমোচনভিত্তিক কর্মসূচির বিশাল বাজেট সরকারেরই, বিশেষ করে স্থানীয় সরকারের দায়বদ্ধতার ফল। এবারের বাজেটে পুঁজিবাজারে অর্থায়ন বাড়ানোর জোর দাবি উঠেছে। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নানা দুর্বলতা সত্ত্বেও এ খাতে প্রণোদনা ও ভর্তুকি দেওয়ারও জোর দাবি জানানো হচ্ছে। অথচ নদীভাঙনের কারণে জলবায়ু উদ্বাস্তু হিসেবে মানবেতর জীবনযাপনে ঢাকায় বসবাসরত ৩৫ শতাংশ মানুষ যারা বস্তিতে বাস করে, তাদের জীবনমান উন্নয়নে প্রণোদনা বা উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়ার দাবির অভাব দেখা যাচ্ছে। সুপেয় পানির চাহিদা পূরণে খাস পুকুর সংরক্ষণ বা পুনর্খননের জন্য জোর দাবি দেখা যাচ্ছে না। প্রায় ৬ শতাংশ হারে ঢাকায় মাইগ্রেশন বা স্থানান্তরিত মানুষ বাড়ছে। অন্যান্য শহর বা গ্রামের পরিকল্পনায় নানামুখী উন্নয়ন বরাদ্দ বাড়াতেই হবে। বাজেটকে করতে হবে জনঅংশগ্রহণমূলক এবং সবার কাছে বোধগম্য। বাজেট সবাইকে সহজভাবে বুঝতে হবে। পুঁজিবাজার, ব্যাংকিং খাত, তারল্য সংকট, মুদ্রাস্টম্ফীতি ইত্যাদি বাজেট বিষয়ক পরিমণ্ডলে নানা ব্যবস্থা ও অবস্থা।

বাজেট হচ্ছে সরকারের রাজনৈতিক দর্শনের সংখ্যাগত পরিকল্পনা। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে গ্রামকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির কেন্দ্রীয় দর্শন হিসেবে আখ্যায়িত করে বিভিন্ন লক্ষ্য ও পরিকল্পনার অঙ্গীকার করা হয়েছে। সুতরাং অভিজ্ঞ সরকারের এই রাজনৈতিক দর্শন বাস্তবায়নের প্রথম বাজেট ২০১৯-২০ অর্থবছরের দিকে আমরা চেয়ে আছি। ন্যায্যতাভিত্তিক বাজেট প্রণয়ন হলে আয় বৈষম্য যেমন কমবে, তেমনি উৎপাদনমুখী, কর্মসংস্থানমুখী, দরিদ্রদের জীবনমান উন্নয়নমুখী এবং রাজস্ব আয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনমুখী বাজেট বাস্তবায়নে সবার অংশগ্রহণে দক্ষ চালকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষণা পরিচালক, র্ড‌প
research@dorpbd.org


মন্তব্য