চাঁদ দেখা নিয়ে বিতর্কের অবসান হোক

সমকালীন প্রসঙ্গ

প্রকাশ : ১৩ জুন ২০১৯

  শায়খ আবদুলল্গাহ আরাবী

এবার চাঁদ দেখা কমিটির ঈদ উদযাপনের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তার রেশ এখনও চলমান। চাঁদ দেখা নিয়ে ধর্মীয় নির্দেশনা খুব সুস্পষ্ট। সুরা বাকারায় (আয়াত: ১৮৫) আলল্গাহ বলেছেন, চাঁদ দেখে রোজা পালনের। আবার ১৮৯ নম্বর আয়াতে বলেছেন, চাঁদের হিসাবে তারিখ গণনা ও হজের দিন নির্ধারণ করতে। বলার অপেক্ষা রাখে না, চাঁদ দেখেই ১ শাওয়াল তথা ঈদুল ফিতর উদযাপন করতে হবে। ঈদের দিন নির্ধারণের এখতিয়ার আলেম ও শাসকদের হলেও নির্ধারক হিসেবে সাধারণের সাক্ষ্যই সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল ভিত্তি (সুনানে তিরমিজি ৬৯৩)।

মুসলিমসহ অন্যান্য হাদিস গ্রন্থের সহি হাদিসগুলোর আলোকে রাসুলের (সা.) যে নির্দেশনা পাওয়া যায় তা হচ্ছে : 'চাঁদ দেখে রোজা রাখ এবং সমাপ্ত করো।' আবু হুরায়রায় বর্ণিত- তিরমিজির সহি (৬৭৮) হাদিসে উলেল্গখ রয়েছে, রমজানের জন্য শাবান মাসের হিসাব রাখার। এ কারণে অনেক ফকিহ শাবান মাসের ২৯ তারিখ চাঁদ দেখা আবশ্যক বলে ফতোয়া দিয়েছেন (ফতহুল কাদির, ২/৩১৩)। প্রকৃতপক্ষে, কোরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক রোজা শুরু ও ঈদের সিদ্ধান্ত সুনির্দিষ্টভাবে খালি চোখে চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল, যা প্রযোজ্য হবে স্থানীয় সময়ে। এ কারণে হজরত ওমরের শাসনকালে সিরিয়া ও মদিনায় ভিন্ন দিনে ঈদ পালনের দৃষ্টান্ত রয়েছে (মুসলিম :১০৮৭)।

ঈদের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে রাসুলুলল্গাহ (সা.) ও খোলাফায়ে রাশেদিনরা জনগণ কর্তৃক চাঁদ দেখার স্বীকৃতি বা সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ঈদের দিন নির্ধারণ করতেন। আমরা সহি হাদিসে দেখতে পাই, ঈদ পালনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল বেদুইন বা পার্শ্ববর্তী এলাকার কারও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে। প্রখ্যাত আলেম শেখ ইবনে উসাইমিনের মতে, কেউ চাঁদ না দেখলে একজনও যদি দেখার দাবি করেন, তাহলে ঈদ পালন করা উচিত (সাওয়ালান ফিল সাওম, খণ্ড ৪৮, নং ২১)। এবার সরকারের পক্ষ থেকে চাঁদ দেখা যায়নি- এই ঘোষণা প্রচারিত হওয়ার পরে কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী ও ভূরুঙ্গমারী উপজেলা এবং লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলায় অনেক ব্যক্তি স্থানীয় নির্বাহী কর্মকর্তাদের জানান, তারা চাঁদ দেখতে পেয়েছেন। ফলে ঈদের ঘোষণা আসে দেরিতে। কেউ সমালোচনা করতে পারেন; তবে এর মাধ্যমে শরিয়ত লঙ্ঘন হয়নি, বরং শরিয়ত অনুসরণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। প্রশ্ন আসতে পারে, ঈদের চাঁদ দেখা যায়নি- এমন ঘোষণা দিয়ে রাতে কেন ঈদ পালনের নির্দেশ এলো! প্রথমত, চাঁদ দেখা কমিটির বৈঠক দুই ঘণ্টাব্যাপী হওয়ার কারণ ছিল। বিশ্বের সব মুসলিম দেশে ঈদ পালনের সিদ্ধান্ত হয়েছে ৪ কিংবা ৫ তারিখে। অথচ আমাদের কেউ চাঁদ দেখার দাবি করেননি; দ্বিতীয়ত, চাঁদ দেখার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ঈদের ঘোষণা দেরিতে আসায় হয়তো সমালোচনা হয়েছে; কিন্তু বিপরীতে যে চিত্রটি পাওয়া যায়, তা সততা ও ধর্মীয় বিধানের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধার। রমজানের ৩০তম দিন সকালে ঈদ পালনের নজির রয়েছে। কারণ যত বিলম্বই হোক না কেন, চাঁদ দেখার খবর পেয়ে ঈদ উদযাপনকে বাধ্যবাধকতা হিসেবে মনে করেন আলেমরা। তারাবি পড়ে, সেহরি খাওয়ার পর ঈদ ঘোষণার দৃষ্টান্ত রাসুলুলল্গাহর (সা.) জীবদ্দশায়ই রয়েছে। প্রসিদ্ধ হাদিসগ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি।

ইবনু হিরাশ (রহ.) থেকে বর্ণিত- রমজানের শেষ দিন সম্পর্কে লোকদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিল। এমতাবস্থায় দু'জন বেদুঈন এসে নবী (সা.) কাছে আলল্গাহর নামে শপথ করে সাক্ষ্য দিলেন যে, তারা উভয়ে গতকাল সন্ধ্যার চাঁদ দেখেছেন। সুতরাং নবী (সা.) লোকদের সওম ভঙ্গ করার নির্দেশ দিলেন। খালফ (রহ.) তার হাদিসে বর্ণনা করেন, তিনি (সা.) তাদের সকালে ঈদগাহে গমনের নির্দেশ দিয়েছেন (সুনানে আবু দাউদ, খণ্ড ৪, পৃ. ২৭, হাদিস ২৩৩৯)।

আবি শায়বার মুসান্নাফে (৩/৬৭) বর্ণিত সহি হাদিস অনুসারে হজরত ওমরের কাছে ঈদ নির্ধারণের পরামর্শ চাওয়া হলে 'দু'জন মুসলিম আগের রাতে চাঁদ দেখেছেন'- এই মর্মে স্বীকৃতি দিলে রোজা ভাঙার নির্দেশ দিয়েছেন।

রোজা ও ঈদ পালন নিয়ে অনেক বিষয়ের মতো আলেমদের মতপার্থক্য রয়েছে। যেমন- প্রখ্যাত ফকিহ শেখ বিন বাজের মতে, সারাবিশ্বে সৌদি আরবের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একই দিনে রোজা ও ঈদ পালন করা উচিত। অন্যদিকে ইবনে তাইমিয়াসহ অনেক আলেমের ভাষ্য হচ্ছে, একই দিনে পালন অগ্রহণযোগ্য। এস্ট্রোনমিক্যাল দৃষ্টিকোণ থেকেও একই দিনে রোজা ও ঈদ পালন করা অসম্ভব। এ কারণে নিকটবর্তী মুসলিম দেশের অনুসরণ করার পক্ষে ফকিহদের অভিমত রয়েছে। বাংলাদেশের নিকটবর্তী পাকিস্তানেও ৪ জুন রাতে ঈদের ঘোষণা আসে। আকাশ পরিস্কার না থাকলে চাঁদ দেখতে দেরি হতে পারে। কিন্তু লালমনিরহাটে চাঁদ দেখার সংবাদ জেনেও ঈদ পালনের ঘোষণা না দিলে তা হতো ইসলাম তথা আলল্গাহর নির্দেশের সুস্পষ্ট অবমাননা। একদিন আগে বা পরে ঈদ পালনের ফলে সরকার বা সংশ্লিষ্ট দলের কিছুই যায় আসে না; কিন্তু চাঁদ দেখার কথা জেনে ঈদের ঘোষণা না দিলে তখন অবশ্যই ধর্মকে শাসনক্ষমতার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করার সমালোচনা হতো, যা সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করত। তাই এ নিয়ে বিতর্কের অবসান হওয়া উচিত বলেই মনে করি।

ইসলামী চিন্তাবিদ ও রিজাল শাস্ত্রবিশারদ
alifta.net@outlook.com


মন্তব্য