ঘরে ফেরার অব্যবস্থাপনা

অন্যদৃষ্টি

প্রকাশ : ১৩ জুন ২০১৯

ঘরে ফেরার অব্যবস্থাপনা

   তাসলিমা তামান্না

যাত্রাপথে ঈদে ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তি হবে না- এমন ঘোষণা প্রতিবছরই শোনা যায় সরকারের পক্ষ থেকে। যদিও একমাত্র ঘরমুখো মানুষই জানেন, এই ভোগান্তির মাত্রা কতখানি। ব্যস্ততার কারণে বেশ কয়েক বছর ঈদ ঢাকাতেই করতে হয়। এবার ঈদে বাড়িতে যাওয়ার সুবাদে মহাসড়কের চরম বিশৃঙ্খলা আর দুর্দশার চিত্র দেখতে পেলাম। ২৮ রোজায় অর্থাৎ ৩ জুন দেশের অধিকাংশ অফিস, শিল্প-কারখানা ছুটি হওয়ায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে গাড়ির বেশ চাপ ছিল। ঢাকা পেরিয়ে সাভার বাসস্ট্যান্ড যেতেই প্রচণ্ড যানজটে পড়লাম। প্রথমে ভেবেছিলাম, হয়তো গাড়ির চাপের কারণেই এমন হচ্ছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই অন্য দৃশ্য চোখে পড়ল। রাস্তার দুই ধারে শত শত লোক গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিল। যে যা পাচ্ছে তাতেই ছুটছে গন্তব্যের দিকে। লেগুনা, খোলা ট্রাক, পিকআপ ভ্যানে অনেকটা গরু-ছাগলের মতো গাদাগাদি করে মানুষ ছুটছে নাড়ির টানে। রাস্তার মাঝখানে, কোথাও-বা এলোমেলোভাবে রাখা অবস্থায় খোলা ট্রাক, পিকআপে যাত্রীদের টেনে-হিঁচড়ে তুলছে অন্য যাত্রীরা। একজন নারীকে একটা ট্রাকে এমনভাবে টেনে তুলতে দেখলাম, যা রীতিমতো ভয়ঙ্কর। আবার কোনো কোনো পিকআপ ভ্যানে মানুষ গাদাগাদিভাবে বাইরের দিকে পা ছড়িয়ে বসে ছিল, যা কোরবানির গরু-ছাগলের কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে বারবার। শুধু তাই নয়, মহাসড়কে চলাচল নিষিদ্ধ থাকলেও কোথাও কোথাও রিকশা, অটো, নছিমন, করিমন, লেগুনাতে যাত্রীদের যত্রতত্র ওঠানামা, মোটরসাইকেলে হেলমেটবিহীন ব্যাগ-ব্যাগেজ নিয়ে যাত্রীদের ভ্রমণও লক্ষ্য করলাম। সারাপথ যানজট পেরিয়ে ৫ ঘণ্টায় পাটুরিয়া ঘাটে পৌঁছে জানতে পারি, সারাদিন গাড়ির অভাবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিছুটা অলস সময় কাটিয়েছে। অথচ গাড়ির চাপে ফেরিঘাটেই ভিড় হওয়ার কথা ছিল।

ফেরার দিন অর্থাৎ ৯ জুন দৌলতদিয়া ঘাটে পৌঁছানোর অনেক আগে থেকেই যানজট চোখে পড়ল। জানতে পারলাম, দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে রাস্তা আটকা পড়েছে। পুলিশ, অ্যাম্বুলেন্স, ক্রমাগত গাড়ির চাপে দুই পাশের রাস্তাই কিছুক্ষণ পর আটকে গেল। যা হোক, ফেরি পার হয়ে ভাবলাম এবার বোধহয় ঝামেলামুক্ত হলাম। কিন্তু মানিকগঞ্জ পৌঁছানোর আগেই শুরু হলো যানজট। জানলাম, এপারেও দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে রাস্তা আটকে রয়েছে। সেখানেও অপেক্ষা করতে হলো কয়েক ঘণ্টা। আমাদের গাড়ির ড্রাইভার জানাল, ঈদে বেশি টাকা আর ট্রিপ বেশি পাওয়া যাওয়ার কারণে চালকদের মধ্যে তাড়াতাড়ি যাওয়ার একটা প্রতিযোগিতা কাজ করে। কেউ কেউ একটানা ১২ ঘণ্টাও গাড়ি চালায় বাড়তি অর্থের আশায়। নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন বলছে, ৩০ মে থেকে ৯ জুন পর্যন্ত ১১ দিনে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন সড়ক, মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে সংঘটিত ১১টি দুর্ঘটনায় কমপক্ষে ১৪২ জন নিহত ও ৩২৪ জন আহত হয়েছে।

সংখ্যাটি দেখে মনে হচ্ছে, ঈদে মানুষ ঘরে ফিরবে আর সড়কে মারা যাবে, এটাই স্বাভাবিক ঘটনা। কারণ প্রতিবছরই এই ঘটনা ঘটছে। অথচ এর পেছনে সড়কে যে এত বড় বিশৃঙ্খলা চলছে, তা দেখার কেউ নেই। মানুষের ভোগান্তির জন্য শুধু বেহাল রাস্তা নয়, যাত্রাপথের সব অব্যবস্থাপনাও দায়ী। সামনে আসছে কোরবানির ঈদ। না জানি সেখানেও কত প্রাণ ঝরবে। যতই আমরা নিরাপদ সড়ক চাই বলে চিৎকার করি না কেন, সড়কের অব্যবস্থাপনা দূর না হলে সড়কে তাজা প্রাণ ঝরা কোনোদিনই দূর হবে না, ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তিও কমবে না।


মন্তব্য