এলপিজি হতে পারে বিকল্প জ্বালানি

সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

প্রকাশ : ১১ জুন ২০১৯

এলপিজি হতে পারে বিকল্প জ্বালানি

  ড. ফাহাদ ইব্রাহিম

এলপিজি বা সিলিন্ডার গ্যাস আমাদের অনেকের বাড়িতেই ব্যবহূত হয় রান্নার কাজে। দৈনন্দিন জীবনে প্রত্যেকের জন্যই এটি দরকার। কিন্তু দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ ক্রমশই কমে যাচ্ছে। এতে বাসাবাড়িতে গ্যাসসেবা পাওয়া দিন দিন জটিল ও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে যারা প্রাকৃতিক গ্যাসসেবা নিচ্ছেন, তাদের অনেকের বাসায়ই সবসময় পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যায় না। এছাড়া কিছু কিছু বাসাবাড়িতে নির্দিষ্ট সময় ছাড়া গ্যাস থাকেই না। এর ফলে অনেকেই প্রাকৃতিক গ্যাস সংযোগের পাশাপাশি এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করতে বাধ্য হন। তাৎক্ষণিক জ্বালানির জন্য দিন দিন এসব সিলিন্ডারের ব্যবহার বাড়ছে।

ব্যবহারের আগে জেনে রাখা ভালো যে, লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি অথবা এলপি গ্যাস) মূলত দাহ্য হাইড্রোকার্বন গ্যাসের মিশ্রণ এবং জ্বালানি হিসেবে রান্নার কাজে, গাড়িতে, ব্রয়লার চালাতে, হিটিং চেম্বারে এবং যেসব শিল্প প্রতিষ্ঠানে পণ্য তৈরিতে অতিরিক্ত তাপমাত্রা প্রয়োজন হয়, সেখানেই এলপিজি ব্যবহূত হয়। বর্তমানে জ্বালানির প্রয়োজনে যতগুলো মাধ্যম ব্যবহূত হয়, তার মধ্যে এলপিজি সবচেয়ে নিরাপদ এবং সহজ ব্যবহার্য জ্বালানি। তবে যেহেতু সিলিন্ডারের গ্যাস খুব বেশি চাপে তরল করে প্রবেশ করানো হয়, তাই এটি ব্যবহারে সঠিক নিয়ম পালন অপরিহার্য। শুধু সঠিক ব্যবহারবিধি সিলিন্ডারের সঙ্গে ব্যবহার্য হোস পাইপ, রেগুলেটরের সঠিক সংরক্ষণ করলেই দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।

প্রতিটি সিলিন্ডারের একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে। প্রতিটি নতুন সিলিন্ডার একাধারে ১০ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়। বাংলাদেশ বিস্টেম্ফারক অধিদপ্তর প্রণীত বিধান অনুযায়ী তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বিধিমালা-২০০৪ (২০১৬ পর্যন্ত সংশোধিত) অনুযায়ী সিলিন্ডার নির্ধারিত ১০ বছর মেয়াদের পর পরীক্ষা করার নিয়ম রয়েছে। মেয়াদ শেষে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং মেরামতের মাধ্যমে এটি পুনরায় নিরাপদ ব্যবহারের উপযোগী হয়ে ওঠে। তাই প্রত্যেক গ্রাহকের উচিত, সিলিন্ডার ব্যবহারের আগে এটির তৈরির সময় পরীক্ষা করে ব্যবহার নিরাপদ কিনা, তা যাচাই করা।

সাম্প্রতিক কয়েকটি দুর্ঘটনা থেকে দেখা গেছে, কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের পেছনে গ্যাস সিলিন্ডারের দায় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠলেও তার সত্যতা মেলেনি। কিন্তু একই সঙ্গে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি, পরিবহন, মজুদ ও ব্যবহারে সচেতনতার অভাব ও বিধিমালার তোয়াক্কা না করারও অভিযোগ রয়েছে। আর এই নিয়ম অগ্রাহ্যের কারণেই কিছু কিছু ক্ষেত্রে এলপিজি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ঝুঁকির সৃষ্টি হয়। পরিবেশক ও সরবরাহকারী বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ব্যবহারকারীদের বেশিরভাগই জানে না সিলিন্ডার ব্যবহারের নিয়ম ও সংরক্ষণের উপায়। এ কারণেই এলপিজি ব্র্যান্ডগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিস্টেম্ফারক অধিদপ্তর ব্যবহারের প্রতিটি স্তরে এলপিজি ব্যবহারের বিধিমালা প্রচারের ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এর ফলে গৃহস্থালি থেকে শুরু করে এলপিজি-সংশ্নিষ্ট প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্যবহারিক সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে। আশা করা যায়, ভবিষ্যৎ ঝুঁকিও হ্রাস পাবে।

গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের নিয়ম বা শর্ত পরিপূর্ণভাবে পালন করলে এলপিজিই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে নিরাপদ জ্বালানি। আপনার পরিবারকে নিরাপদ রাখতে এলপিজি ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিধিমালা হলো : সিলিন্ডার সবসময় ছায়াযুক্ত ঠাণ্ডা জায়গায় রাখতে হবে, যেন তাপের সংস্পর্শে না আসে; গ্যাস সিলিন্ডার পরিবর্তনের সময় অবশ্যই রেগুলেটর বন্ধ রাখতে হবে; গ্যাস সিলিন্ডারের হোস পাইপ নির্দিষ্ট সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন জরুরি; হোস পাইপ ফেটে গেলে বা কোনো রকম ছিদ্র দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে রেগুলেটর বন্ধ করে এটি পরিবর্তন করতে হবে; রান্নাঘরের মধ্যে কোনো প্রকার দাহ্য পদার্থ না রাখা; প্লাস্টিক, কাগজ, কেরোসিন ও গ্যাস ভর্তি একের অধিক সিলিন্ডার একই রান্নাঘরে না রাখা; অব্যবহূত এলপিজি সিলিন্ডারের রেগুলেটর বন্ধ কিনা পরীক্ষা করতে হবে এবং খোলা জায়গায় সংরক্ষণ করতে হবে; লক্ষ্য রাখুন, সিলিন্ডারের হোস পাইপ এবং রেগুলেটর যেন মানসম্পন্ন হয়, ভর্তি সিলিন্ডার ব্যবহারের আগে লক্ষ্য রাখুন এটি সেফটি ক্যাপ পরিহিত কিনা; গ্যাসস্টোভে আগুনের প্রবাহ সংশ্নিষ্ট কোনো সমস্যা দেখা দিলে অবশ্যই নিকটস্থ অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ানের পরামর্শ নিতে হবে এবং সবসময় প্রতিষ্ঠান অনুমোদিত ডিলারের কাছ থেকে গ্যাস সংগ্রহ করা উচিত।

বাংলাদেশে গ্যাস সিলিন্ডার শুধু বাসাবাড়িতে কিংবা হোটেল-রেস্তোরাঁয় রান্নার কাজে নয়, বর্তমানে যানবাহনেও বিশেষায়িত সিলিন্ডার ব্যবহূত হচ্ছে। তাই যানবাহনে ব্যবহার্য সিলিন্ডার স্থাপনের ক্ষেত্রে শুধু কোম্পানি অনুমোদিত বিক্রেতাদের কাছ থেকে ক্রয় করা উচিত, যা নিশ্চিত করবে মানসম্পন্ন সার্টিফাইট অটোগ্যাস। অটোগ্যাস সারাবিশ্বে বহুল ব্যবহূত জনপ্রিয় একটি জ্বালানি, যা নিশ্চিত করে যানবাহনের স্থায়িত্ব, রোধ করে বায়ুদূষণ এবং একই সঙ্গে এটি সাশ্রয়ও বটে। ইতিমধ্যেই আমাদের দেশে প্রচুর সংখ্যক অটোগ্যাস স্টেশন স্থাপিত হয়েছে এবং অসংখ্য গাড়ি এলপিজিতে চলছে।

গৃহস্থালিতে ব্যবহূত এলপিজি সিলিন্ডার যেহেতু বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি পরিবারের একটি আবশ্যকীয় পণ্য। তাই এটি শুধু ব্যবহারের ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা বিধান নয় বরং এর পরিবহন এবং মজুদের ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সিলিন্ডার প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের যা যা করণীয় কিছু বিষয় হলো : বিক্রেতা-ডেলিভারিম্যান অথবা সিলিন্ডারের সংযোগকারীকে সিলিন্ডারের যথাযথ ব্যবহারবিধি ও ম্যানুয়াল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া আবশ্যক, যাতে তারা খুচরা ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন স্তরের ব্যবহারকারীকে যথাযথভাবে বোঝাতে সক্ষম হয়; ১০টির বেশি গ্যাস সিলিন্ডার মজুদ করলে বিস্ম্ফোরক অধিদপ্তর থেকে অনুমোদন নেওয়ার বিধান রয়েছে। ডিলার পর্যায়ে মজুদকালীন নিরাপত্তা আরও জোরদারের জন্য সরবরাহকারী মূল প্রতিষ্ঠানের যথাযথ পদক্ষেপ বেশ জরুরি; ডিলারশিপ দেওয়ার আগে আগ্রহী ডিলার সিলিন্ডার মজুদ, সরবরাহ এবং এ সংক্রান্ত সব নিয়ম মেনে আবেদন করেছে কিনা তা সরেজমিনে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করে নেওয়া উচিত প্রস্ততকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর। ডিলাররা যেসব স্থানে সিলিন্ডার মজুদ করে, সেসব স্থানে নিয়মিত প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞ প্রতিনিধি গিয়ে সিলিন্ডারের সার্বিক অবস্থা পরীক্ষা করে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

আমরা সবাই জানি, দেশে গত ১০ বছরে পাইপলাইনে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে ছয়বার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ক্যাপটিভ ও যানবাহনের সিএনজির দাম। বাসাবাড়িতে দুই চুলার গ্যাস বিল ছিল ৪৫০ টাকা, যা এখন ৮০০ টাকা। নতুন প্রস্তাবে তা এক হাজার ৪৪০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। এক চুলার ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত দর এক হাজার ৩৫০ টাকা। ২০০৮ সালের এপ্রিলে প্রতি ঘনমিটার সিএনজির দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৬ টাকা ৭৫ পয়সা। এখন তা ৪০ টাকা, যা বাড়িয়ে ৫৪ টাকা করার কথা বলা হয়েছে।

বাংলাদেশে মাত্র ৩৫-৪০ লাখ গ্রাহক পাইপলাইনে গ্যাস পান। বাকি কোটি কোটি মানুষের কথাও আমাদের ভাবতে হবে। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশে এলপিজি বা সিলিন্ডার ব্যবসার বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে যেখানে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংযোগ প্রদান বন্ধ রয়েছে, সেখানে জ্বালানি চাহিদা মেটাতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি বা সিলিন্ডার গ্যাস) চাহিদা বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক।

বর্তমানে ৫৬টি প্রতিষ্ঠানের এলপিজি ব্যবসার অনুমোদন রয়েছে। দেশি এলপিজি বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বর্তমানে আমাদের প্রতিষ্ঠানসহ আরও বেশ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দেশি বাজারের চাহিদা মেটাতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে। একই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠান বিপিসিও সীমিত আকারে এলপিজি সরবরাহ করছে। যেহেতু প্রতিনিয়তই বৃদ্ধি পাচ্ছে গ্যাসের চাহিদা আর এ চাহিদা মেটাতে দেশি প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমাগতভাবে তাদের নিজস্ব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই চাহিদা মেটাতে কাজ করে যাচ্ছে। দেশের বিপুল জনসংখ্যার গ্যাসের চাহিদা প্রাকৃতিক গ্যাস দিয়ে মেটানো সম্ভব না আর তাই সিলিন্ডার গ্যাসের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সিলিন্ডার গ্যাসের ক্ষেত্রে এলপিজির কথাই সবার আগে মাথায় আসে। কারণ, সাশ্রয়ী দামে তা দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায়। কিন্তু সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহারের সময় সতর্কতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, ডিলার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং ব্যবহারীরাও যদি সচেতন হোন, তবেই দুর্ঘটনা এড়ানো এবং এ খাতের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব হবে; যা নিরাপদ এলপিজি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমরা জি-গ্যাস থেকে ভোক্তা, গ্রাহক ও সরবরাহকারী প্রতিটি স্তরেই এলপিজি ব্যবহারের সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশব্যাপী নিয়মিত কর্মশালার আয়োজন করে চলেছি।

পরিশেষে, যদি গ্যাসের দাম খুব বেড়ে যায়, তাহলে দেশের শিল্পায়নে বড় বাধা আসবে। এলপিজিকে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে জায়গা করে দিতে হলে এখানে সরকারের প্রণোদনা দেওয়া দরকার। কারণ জ্বালানি ব্যবহার করে দেশে শিল্পায়ন হবে আর শিল্পায়ন হলে দেশের অর্থনীতি ও সমৃদ্ধি এগিয়ে যাবে। আর সব ক্ষেত্রেই সঠিক ব্যবহারবিধি মেনে চলার মাধ্যমেই নিরাপত্তার বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় রাখতে হবে।

টিচিং ফেলো, বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটি


মন্তব্য

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ