সব বিষয় নিয়ে রাজনীতি বা ঠাট্টা ভালো নয়

  আবদুল মান্নান

কথায় বলে, বাঙালি শুধু হুজুগেই নয় সবকিছুতেই রাজনীতি খোঁজে, যা মোটেও উচিত নয়। মানুষের রোগ-বালাই, শারীরিক অক্ষমতা নিয়ে তো নয়ই। কিন্তু আমাদের সমাজে কিছু ব্যক্তি আছেন, তারা এসব সামান্য নৈতিক বিষয়গুলো ভুলে যান এবং সুযোগ পেলেই তারা কারও রোগ-বালাই অথবা শারীরিক অক্ষমতা নিয়ে যেভাবে কথা বলে, তা অনেক সময় খুবই নিষ্ঠুর ও অর্বাচীনের প্রলাপ মনে হয়। আর এসব বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লন্ডন গিয়েছিলেন। লন্ডনে তার অন্যান্য কর্মসূচির সঙ্গে ছিল তার চোখের চিকিৎসা, ক্যাট্রাক্ট অপসারণ। এই বয়সে এ সমস্যা যে কোনো মানুষের হতে পারে। এ ছাড়াও বয়সের সঙ্গে আরও কিছু রোগেরও অনেকটা সম্পর্ক আছে। যেমন- রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হার্টের সমস্যা ইত্যাদি। তবে এটাও ঠিক যে, বর্তমানে বেশ কিছু রোগ আছে, যা কম বয়সী ছেলেমেয়েদেরও হতে দেখা যায়। এটি হয় বর্তমানকালের বাচ্চাদের লাইফস্টাইলের কারণে, যার জন্য বাবা-মা বা অভিভাবকরাও কম দায়ী নয়। বাংলাদেশে যত সংখ্যক কম বয়সী বাচ্চা চোখে হাই পাওয়ার চশমা পরে, তা অন্য কোনো দেশে তেমন একটা দেখা যায় না। এর প্রধান কারণ ছোটকাল থেকে বাচ্চাদের খাদ্যাভ্যাস। অনেক মা বেশ গর্ব করে বলেন, 'আমার বাচ্চা মুরগি ছাড়া কিছু খেতেই চায় না, শাকসবজি দিলে খাওয়ার প্লেট ছুড়ে মারে।' ভাগিস্য আমার প্রজন্মের অনেক মা-বাবার মাছ-মুরগি খাওয়ানোর সামর্থ্য ছিল না। আমরা ছয় ভাইবোনের ভাগে সপ্তাহে একটি ডিম জুটত। মা যত্ন করে পেঁয়াজ দিয়ে ওমলেট করে ছয় ভাগ করে দিতেন। মা আর বাবা শাকসবজি কোনো একটা দিয়ে চালিয়ে দিতেন। বাংলাদেশের মানুষের দিন বদলেছে। ফার্মের মুরগি আর ডিম এখন হালি বা ডজন হিসেবে কেনে। যে কারণে এই সময়ের বাচ্চারা বড় হচ্ছে ফার্মের মুরগির মতো। বড়দের রোগ এখন তাদেরও অনেক ক্ষেত্রে পেয়ে বসেছে। মাথায় এক ফোঁটা বৃষ্টি পড়লে সর্দি-কাশি-জ্বর।

ফিরে আসি প্রধানমন্ত্রীর চিকিৎসা নিয়ে। বয়স বাদ দিলাম, যে মানুষটি দিনরাত ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা কাজ করেন, তার তো চোখে সমস্যা হওয়ারই কথা। যারা তার সঙ্গে কাজ করেন তারা জানেন, শেখ হাসিনা কেমন কর্মপাগল মানুষ। যে মুহূর্তে লন্ডনের উদ্দেশে তিনি দেশ ছাড়লেন, সেই মুহূর্তে এক শ্রেণির মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু করে দিলেন তার চিকিৎসা নিয়ে ট্রল করা। বললেন, তিনি নাকি পাঁচ টাকা ভিজিট দিয়ে ঢাকায় চিকিৎসা করান। এখন কেন তিনি চোখের চিকিৎসা করাতে লন্ডন ছুটছেন! তারা বুঝতে চান না যে, সব রোগের চিকিৎসা, তা যদি চোখের হয়, তা অনেক সময় জটিল হয় এবং অনেক সময় চিকিৎসকরা ঝুঁকি নিতে চান না। নিজের একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলি। অভ্যন্তরীণ একটা সমস্যার কারণে আমার নিজের একটি বিশেষ এক্স-রে করানোর প্রয়োজন হলো। তখন আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করছি। চট্টগ্রামে একটিমাত্র ডায়াগনস্টিক সেন্টারে তখন এই এক্স-রেটা হতো। মালিক আমার পূর্বপরিচিত। তিনি বিনয়ের সঙ্গে জানালেন, তিনি আমার এই এক্স-রেটা করতে চান না। কারণ এটিতে সামান্য ঝুঁকি থাকতে পারে। পরে তা আমাকে ঢাকায় এসে করতে হয়েছে। আর প্রধানমন্ত্রী হলে তো যে কোনো ডাক্তারই এ রকম ঝুঁকি নিতে না চাওয়াটাই স্বাভাবিক। কেউ কেউ আবার মাহাথির মোহাম্মদের উদ্ৃব্দতি দিয়ে লিখলেন, একটি দেশে এমন চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে ওই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানকে চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যেতে না হয়। নিঃসন্দেহে উত্তম কথা। কিন্তু যারা এ ধরনের তর্ক-কুতর্ক করেন, তারা কি জানেন, মালয়েশিয়া থেকে বছরে কত মানুষ পার্শ্ববর্তী দেশ সিঙ্গাপুরে গিয়ে চিকিৎসাসেবা নেন। ইউরোপ, আমেরিকা থেকেও বছরে কয়েক হাজার মানুষ ভারত ও সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাসেবা নেন। তার সঠিক হিসাব হয়তো এদের জানা নেই। আমাদের দেশে এক শ্রেণির স্বঘোষিত বুদ্ধিজীবী আর চিন্তাশীল ব্যক্তি আছেন, যারা কথায় কথায় বাংলাদেশের সঙ্গে সিঙ্গাপুর অথবা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করেন। সেদিন একজন বিশ্ববিদ্যালয় পণ্ডিত শিক্ষক এক টিভি টক শোতে বেশ চড়া গলায় বলছিলেন, 'সেসব দেশে খাঁটি গণতন্ত্র থাকতে পারলে আমাদের দেশে থাকতে পারবে না কেন?' তিনি কি ভুলে গেলেন, সেসব দেশের সব জনসংখ্যাকে যোগ করলেও আমাদের রাজধানীর জনসংখ্যার সমান হবে না। যেমন মালয়েশিয়ার জনসংখ্যা তিন কোটি ২৫ লাখ আর আয়তন ৩,২৮,৫৫০ বর্গকিলোমিটার। অন্যদিক সর্বশেষ হিসাবমতে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৮০ লাখ ৬৫ হাজার আর দেশের মোট আয়তন হচ্ছে ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার। মালয়েশিয়ার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ঢাকার জনসংখ্যা দুই কোটি। বিশ্বে ২২৪টি দেশের মধ্যে ১৭৩টি দেশেরই এত জনসংখ্যা নেই, যা আমাদের রাজধানীতে আছে। ঢাকার প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৮,৪১০ জন মানুষ বাস করে। আমাদের ওপরে আছে ম্যানিলা ও মুম্বাই। আর স্কা্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো তো ওয়েলফেয়ার স্টেট। কাজ করলে যে বেতন, না করলেও সেই আয়। রাষ্ট্রই সবার নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছুর ব্যবস্থা করবে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ানভুক্ত চারটি দেশের (সুইডেন, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে) মোট জনসংখ্যা মাত্র দুই কোটি ৬৮ লাখ। যারা একটুতেই বাংলাদেশে বসবাস নিয়ে নাক সিটকায়, তাদের এই সামান্য পরিসংখ্যান মাথায় রাখতে অনুরোধ করি।

একসময় যে বাংলাদেশে পাড়ার হুজুরের পানিপড়া আর তাবিজ-কবজ ছাড়া অন্য কোনো চিকিৎসা ছিল না, এখন সেই দেশে অনেক অত্যাধুনিক চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়েছে। ক'দিন আগে আমার ছোটবেলার এক বন্ধুর ছেলে একটি অত্যন্ত উন্নত দেশে সামান্য ডায়রিয়াতে মাত্র ২৭ বছর বয়সে মারা গেল। কারণ তার শহরে এই রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই। ওই দেশে ট্রপিক্যাল দেশের অনেক রোগের চিকিৎসা সহজলভ্য নয়। যারা প্রধানমন্ত্রীর চোখের চিকিৎসা নিয়ে এমন সব মন্তব্য করেন, তাদের এই সামান্য বিষয়গুলো মনে রাখতে বলি। তিনি তো সামান্য সর্দি-কাশি বা পেটের পীড়ার জন্য লন্ডনে চিকিৎসা নিতে যাননি।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গুরুতর অসুস্থ হলে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে চিকিৎসা নিতে জরুরিভাবে তাকে সিঙ্গাপুর পাঠানো হলো। যখন তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন তার অবস্থা কেমন ছিল, তা সে সময় যারা তাকে জরুরি চিকিৎসা দিয়েছেন, তারাই বলতে পারবেন। অবস্থা এতই খারাপ ছিল যে, প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে ভারত থেকে উড়ে এলেন এই সময়ের বিশ্বসেরা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. দেবী শেঠি। ওবায়দুল কাদেরকে সিঙ্গাপুর নেওয়ার পর নিউইয়র্ক থেকে একজন নারী তার সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে ফেসবুক লাইভে এমন সব কুৎসিত মন্তব্য করা শুরু করলেন যে, তা মুখে আনা যায় না। এই নারী বেশ অর্থবিত্তশালী, দাঁতের ডাক্তার। একসময় ঢাকার একটি জাতীয় দৈনিকে জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া, বিএনপিকে নিয়ে প্রতি সপ্তাহে এমন সব কলাম লিখতেন যে, যারা বিএনপিকে নিয়ে নিয়মিত কলাম লেখেন, তিনি তাদের চেয়েও এক ডিগ্রি সরেস। একদিন বের হলো 'হিটলার থেকে জিয়া' নামে তার একটি বই। তিনি তখন বঙ্গবন্ধুর চেয়েও বড় আওয়ামী লীগ সমর্থক। পদবি ছিল সাহা। বিয়ে করলেন একজন মুসলমানকে। পদবির পরিবর্তন হয়ে হলো ফারাহ। তাদের ২৪ বছরের সন্তানটি যখন হঠাৎ নিউইয়র্কে মারা গেল, তখন স্থানীয় মুসলমান কমিউনিটিকে খবর দেওয়া হলো। তারা মৃতদেহ নিয়ে গেল। কবর খোঁড়া আর কাফনের ব্যবস্থা হলো। জানাজা পড়ানো হলো। কবর দিতে নিয়ে যাওয়ার পূর্বমুহূর্তে ওই নারী এসে জানিয়ে দিল, তার ছেলেকে দাহ করা হবে। সেই নারী ওবায়দুল কাদেরের সিঙ্গাপুর যাওয়াকে বললেন, তিনি নাকি সেখানে ফুর্তি করতে গেছেন। এত অমানবিক মানুষ কীভাবে হতে পারে? তিনি শুধু ওবায়দুল কাদেরের চিকিৎসা নিয়েই কথা বলেন না, নিয়মিত বিরতি দিয়ে তিনি আওয়ামী লীগ, শেখ হাসিনা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে যত সব আপত্তিকর কথা বলেন। দেশ স্বাধীন হলে বঙ্গবন্ধুর পিত্তথলিতে পাথর ধরা পড়ল। তখনও বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা বেশ নাজুক অবস্থায়। তিনি চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে রাজি হলেন না। তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক জাতীয় অধ্যাপক নূরুল ইসলামের পীড়াপীড়িতে তিনি শেষ পর্যন্ত লন্ডনে গিয়ে অপারেশনের মাধ্যমে চিকিৎসা নিলেন। এখন তো অপারেশন ছাড়াই বাংলাদেশের যে কোনো হাসপাতালে এই চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব। বঙ্গবন্ধুর এই চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়া নিয়ে বাম মহলে সে কী ঠাট্টা-মশকরা। কী দেশ স্বাধীন হলো যে, প্রধানমন্ত্রীকে এই সামান্য অপারেশন করাতে বিদেশ যেতে হবে? সাপ্তাহিক বিচিত্রা তো একটা আস্ত কার্টুনও প্রকাশ করে ফেলল। যারা কথায় কথায় বাংলাদেশকে অন্য দেশের সঙ্গে তুলনা করেন, তাদের বাস্তবতার আলোকে একটু সংবেদনশীল হতে অনুরোধ করি। সবকিছু নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা ভালো নয়। একজন মানুষকে ল্যাংড়া বলে ঠাট্টা করলে নিজেও একসময় ল্যাংড়া হয়ে যেতে পারে, সেই কথাটি মনে রাখলে ভালো। এটি হতে বেশি সময় লাগে না।

বিশ্নেষক ও গবেষক


মন্তব্য