রাজনীতিতে বেগম জিয়ার তিন যুগ

সময়ের কথা

প্রকাশ : ১৩ মে ২০১৯

রাজনীতিতে বেগম জিয়ার তিন যুগ

  অজয় দাশগুপ্ত

সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালের ৩১ মে গণভোটের প্রহসন করেছিলেন। এর আগে তিনি বিচারপতি আবুসাদত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে জোরপূর্বক সরিয়ে দিয়ে প্রথমে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও পরে রাষ্ট্রপতির পদ দখল করেন। এভাবে তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও রাষ্ট্রপতির পদ দখল করে বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধন করেন। ১৯৭১ সালে গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর যে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে, তার মূলে কুঠারাঘাত করেন তিনি। সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দেওয়া হয়। বাদ পড়ে সমাজতন্ত্র। আরও আগে ১৯৭৬ সালের ৪ মে জারি করা হয় একটি সামরিক আদেশ- ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠনে বাধা নেই। এ আদেশটি জারি হয়েছিল সে সময়ের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবুসাদত মোহাম্মদ সায়েমের নামে। সায়েম সাহেবের নামে ১৯৭৬ সালের ৪ আগস্ট জারি করা আরেকটি আদেশের শিরোনাম ছিল- 'ব্যক্তিপূজা বা ব্যক্তিত্বের মাহাত্ম্য প্রচার নিষিদ্ধ'। এতে বলা হয়, জীবিত বা মৃত কোনো ব্যক্তিকে কেন্দ্র করিয়া কোনো প্রকার ব্যক্তিপূজার উদ্রেক বা ব্যক্তিত্বের মাহাত্ম্য প্রচার অথবা বিকাশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকিবে।' এ আদেশের লক্ষ্য ছিল বঙ্গবন্ধুকে 'বাংলাদেশ থেকে বাদ দেওয়া'।

সে সময়ে কঠোর সামরিক আইন বলবৎ ছিল এবং প্রধান সামরিক শাসকের নামে যা কিছু জারি হবে, সেটাই দেশের আইন। জিয়াউর রহমান সামরিক আইন প্রশাসক ও রাষ্ট্রপতি হিসেবে যে সর্বময় ক্ষমতা লাভ করেন, সেটাও তিনি বল প্রয়োগ ও কূটকৌশল প্রয়োগ করে জারি করে নিয়েছিলেন বিচারপতি সায়েম সাহেবকে দিয়ে। ১৯৭৭ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান গণভোটের আয়োজন করেন একটি উদ্দেশ্যে- তিনি যে বল প্রয়োগ করে বিচারপতি সায়েমকে গদিচ্যুত করেছেন এবং কলমের এক খোঁচায় সংবিধান সংশোধন করেছেন, সেটাকে বৈধতা প্রদান। ১৯৭৭ সালের ৩১ মে দৈনিক সংবাদ লিখেছে- জিয়াউর রহমান সংবিধান সংশোধনসহ তার বিভিন্ন পদক্ষেপের বৈধতা প্রদানের জন্য 'হ্যাঁ-না' ভোট আয়োজন করেছিলেন। তার পক্ষে বা ৯৮.৮৭ শতাংশ ভোট পড়ে। ভোটকেন্দ্রগুলো ছিল ভোটারশূন্য। গণভোটের বিরুদ্ধে প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল।

প্রহসনের এই গণভোটের পর ১৯৭৮ সালের ৩ জুন অনুষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি পদে বহাল থেকে এবং নিষ্ঠুর সামরিক আইনের পরিবেশেই জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা এবং আড়াই মাস যেতে না যেতেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আওয়ামী লীগের চার শীর্ষনেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে ব্রাশফায়ারে হত্যার পর আওয়ামী লীগ তখন কার্যত নেতৃত্বহীন। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী এ দলের শত শত নেতাকর্মীও কারাগারে। আওয়ামী লীগের মিত্র দুটি দল ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির অনেক নেতা জেলে। এমন পরিবেশে সামরিক আইনের দাপট দেখিয়ে জিয়াউর রহমান সহজেই নিজেকে রাষ্ট্রপতি পদে 'বিপুল ভোটে নির্বাচিত' ঘোষণা করতে পারেন।
তিনি রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার কয়েক মাস পর ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর গঠন করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি। দলের গঠনতন্ত্রে তিনি নিজেই নিজেকে সর্বময় ক্ষমতা প্রদান করেন। তখন একটি কৌতুক চালু ছিল এভাবে- 'সামরিক শাসকরা নারীকে পুরুষ এবং পুরুষকে নারীতে রূপান্তর ছাড়া যে কোনো কিছু করার ক্ষমতা রাখে।' পাকিস্তানের প্রথম সামরিক শাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান এর সূচনা করেছিলেন। বেগম খালেদা জিয়া ১৯৮৪ সালের ১০ মে বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পরও উত্তরাধিকার সূত্রে এ দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। ৩৫ বছর ধরে তিনি এ দায়িত্বে রয়েছেন।

জিয়াউর রহমান বিএনপি গঠনের মাত্র সাড়ে পাঁচ মাসের মধ্যে ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কঠোর সামরিক আইনের পরিবেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তিনি বিভিন্ন দল থেকে কিছু লোককে ভয়ভীতি ও আর্থিকসহ অনৈতিক বহুবিধ সুবিধা দিয়ে দলে টানেন। একইভাবে প্রশাসন, সামরিক বাহিনী ও পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে অবসর নেওয়া কিছু ব্যক্তিও এ নতুন দলে যোগ দেয়। দলে যোগদানকারীদের কাছে দুটি বিষয় ছিল স্পষ্ট- এক. দলটি ইতিমধ্যেই ক্ষমতায়। অর্থাৎ তারা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের একচ্ছত্র নেতৃত্বে পরিচালিত ক্ষমতায় থাকা দলে যোগ দিচ্ছেন; দুই. জিয়াউর রহমান যে কোনোভাবেই হোক সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন দখল করবেন। কারণ সংবিধান আনুষ্ঠানিকভাবে সংশোধন এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড, ৩ নভেম্বর জেলহত্যা, সংবিধান সংশোধনসহ যেসব অসাংবিধানিক, অগণতান্ত্রিক ও অনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, তার বৈধতা প্রদানের জন্য এর প্রয়োজন রয়েছে।

সামরিক আইনের দাপট-দৌরাত্ম্য দেখিয়ে জিয়াউর রহমান দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল বিজয় অর্জন করার পর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগী শাহ আজিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী পদে নিযুক্ত করেন। ৫ এপ্রিল জাতীয় সংসদে অনুমোদন পায় সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী, যাতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে সামরিক আইন জারিসহ যাবতীয় কর্মকাণ্ডকে বৈধতা প্রদান করা হয়।

বিএনপির অনেকে বলেন, জিয়াউর রহমান ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না। তারা খন্দকার মোশতাকের ওপরেই এ দায় চাপিয়ে নিশ্চিত থাকতে চান। কিন্তু ১৫ আগস্টের মর্মন্তুদ ঘটনার সাংবিধানিক বৈধতা তো জিয়াউর রহমানই দিয়েছিলেন, যে কলঙ্ক মুছে ফেলার জন্য বহু বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

জিয়াউর রহমান গণভোটের প্রহসন আয়োজন করেছিলেন ১৯৭৭ সালের ৩০ মে। এর ঠিক চার বছর পর ১৯৮১ সালের ৩০ মে তিনি চট্টগ্রামে নিহত হন সেনাবাহিনীর একটি অংশের হাতে। তার মৃত্যুর কয়েকদিন আগে (১৭ মে) বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা প্রায় ৬ বছর নির্বাসিত জীবনযাপন শেষে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তাকে ১৯৮১ সালের ১৩ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনুষ্ঠিত আওয়াম লীগ সম্মেলনে দলের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর দেশে ফেরত আসা তার এবং শেখ রেহানার জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবেই বিবেচিত হয়েছে। ১৭ মে ঝুঁকি নিয়েই ঢাকায় পা রাখেন। তবে বিস্ময়ের ঘটনা ছিল, প্রবল ঝড়-তুফান এবং জিয়াউর রহমান ও তার প্রত্যক্ষ প্রশ্রয়ে বঙ্গবন্ধুর ঘাতক চক্র ও ধর্মান্ধ বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির প্রতিহিংসা গ্রহণের হুমকির মধ্যেও সারাদেশ থেকে লাখ লাখ নারী-পুরুষ সমবেত হয়েছিল তাকে স্বাগত জানাতে। তৃণমূল আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুকে ভোলেনি, এ ঘটনা ছিল তার বড় প্রমাণ।

বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হওয়ার আগেই রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের সঙ্গে সংঘাতে গিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর কারণে বিএনপির চেয়ারপারসনের শূন্য পদে উভয়ে প্রার্থী হয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য খালেদা জিয়া পিছু হটেন। তিনি ভাইস চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এইচএম এরশাদ সামরিক শাসন জারি করে ফের অসাংবিধানিক শাসনের পথে দেশকে ঠেলে দেওয়ার পর বিচারপতি আবদুস সাত্তার বিএনপির দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান এবং দলের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার সরাসরি রাজনৈতিক দৃশ্যপটে আগমনের পথ খুলে যায়।

তবে তার আগেই কিন্তু প্রথমে আওয়ামী লীগের ছাত্রলীগ, কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র ইউনিয়ন ও জাসদের ছাত্রলীগ এইচএম এরশাদের সামরিক শাসনকে নানাভাবে চ্যালেঞ্জ জানাতে থাকে। এর সূচনা ১৯৮২ সালের নভেম্বরের ছাত্র আন্দোলনে। বিএনপির ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল তাতে শামিল ছিল না। ১৯৮৩ সালের ৩১ জানুয়ারি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এইচএম এরশাদ ভাষা আন্দোলন ও ২১ ফেব্রুয়ারিকে কটাক্ষ করে বক্তব্য রাখলে তার প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ, মণি সিংহের কমিউনিস্ট পার্টি, মোজাফ্‌ফর আহমদের ন্যাপ, জাসদ, বাসদ, রাশেদ খান মেননের ওয়ার্কার্স পাটিসহ ১৫টি দল নিয়ে একটি জোট গঠন করা হয়। কয়েকদিন পর এরশাদ-মজিদ খানের শিক্ষানীতির প্রতিবাদে ছাত্রদের যে প্রবল আন্দোলন গড়ে ওঠে, তাতেও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের অংশগ্রহণ দেখা যায়নি। ১৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের মিছিলে গুলি হয়, তাতে কয়েকজনের মৃত্যু ঘটে। ওই দিন সেনাবাহিনী-পুলিশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বত্র হানা দিয়ে শত শত ছাত্রকে গ্রেফতার করে নিষ্ঠুর নির্যাতন চালায়। পরদিন ১৫ ফেব্রুয়ারি ড. কামাল হোসেনের বাসায় বৈঠক চলাকালে শেখ হাসিনাসহ ১৫ দলের ৩০ জনের বেশি নেতাকে গ্রেফতার করে ক্যান্টনমেন্টে বন্দি রাখা হয়। তখনও কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া, তার দল বিএনপি ও ছাত্রদল রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নেই। তখন বিএনপির অনেক নেতাকে এইচএম এরশাদ তার পক্ষে টানার চেষ্টা করছিলেন। ১৯৮৩ সালের ২৭ নভেম্বর সামরিক শাসক এইচএম এরশাদের 'পুতুল' রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আহসানউদ্দিনের নেতৃত্বে জনদল নামে যে রাজনৈতিক দল গঠিত হয়, তাতে এ বিএনপির অনেকে যোগ দেয়। বেগম খালেদা জিয়াকে রাজপথের বড় কর্মসূচিতে প্রথম দেখা যায় এর পরদিন ২৮ নভেম্বর সচিবালয়ের সামনে অবস্থান ধর্মঘটকে কেন্দ্র করে। পুলিশ, বিডিআর ও সেনাবাহিনী দিয়ে এ কর্মসূচি বানচাল করা হয়েছিল। ২৯ নভেম্বর শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়াকে এরশাদ সরকার নিরাপত্তামূলক হেফাজতে নিয়েছে বলে ঘোষণা দেয়। এর আগে ১ নভেম্বর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত ১৫ দল এবং বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত ৭ দল সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত দেশব্যাপী হরতাল ডেকেছিল। সামরিক শাসনের অবসান ও সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণাসহ ৫ দফা দাবিতে ডাকা এ হরতালে বিপুল সাড়া মেলে।

বেগম খালেদা জিয়া দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণের পর বিএনপির কর্মী-সমর্থক, বিশেষভাবে ছাত্র-যুবকদের মধ্যে উৎসাহ সৃষ্টি হয়। ছাত্রদল বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকে (পরবর্তী দুই দশক এ শক্তি ছাত্রদল ধরে রাখে)। তবে ততদিনে রাজনৈতিক অঙ্গনে কিন্তু প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগ। এইচএম এরশাদের বিরুদ্ধে ১৫ ও ৭ দলের আহ্বানে একের পর এক হরতাল ডাকা হতে থাকে। তাতে সামনের সারিতে দেখা যায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের। ১৯৮৪ সালের ১৪ অক্টোবর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৫ দল মহাসমাবেশ ডাকে মানিক মিয়া এভিনিউয়ের বিশাল প্রাঙ্গণে, বেগম খালেদা জিয়া ৭ দলের সমাবেশ করেন গুলিস্তান এভিনিউয়ের ছোট অঙ্গনে। ১৯৮৬ সালের ৭ মে ঘোষিত সংসদ নির্বাচনে ১৫ ও ৭ দল প্রথমে অংশগ্রহণের ঘোষণা দেয়। শুরুতে ঠিক হয়, যেহেতু এইচএম এরশাদ রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা বহাল রেখে সংসদ নির্বাচন দিয়েছেন। তাই দুই জোটের দুই শীর্ষ নেতা শেখ হাসিনা সংসদের ১৮০ আসনে এবং বেগম খালেদা জিয়া ১২০ আসনে প্রতীকী নির্বাচন করবেন। এভাবে রাজনৈতিক অঙ্গনে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের অগ্রণী অবস্থান স্বীকার করে নেওয়া হয়। এইচএম এরশাদ বিরোধীদের এ রাজনৈতিক কৌশলের কাছে প্রমাদ গোনেন এবং সামরিক শাসকের কর্তৃত্বের বলে কোনো ব্যক্তির একসঙ্গে পাঁচটির বেশি সংসদীয় আসনে প্রার্থী হওয়া নিষিদ্ধ করেন। বিএনপি ১৯৮৬ সালের ৭ মের সংসদ নির্বাচন বর্জন করে। কিন্তু শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্র কয়েকটি দল অংশ নেয়। নির্বাচনে ফল প্রকাশ হতে শুরু করলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ জোটের জয়জয়কার। তারা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে চলেছে, বেতার-টিভির ফলে এমন আভাস পাওয়া যেতে থাকে। তখন এইচএম এরশাদের ভয়ঙ্কর খেলা আমরা দেখি- নির্বাচনের ফল ঘোষণা হঠাৎ বন্ধ করা হয়। এর পর নির্বাচন কমিশন থেকে যে ফল ঘোষণা করা হয়, তাতে মাত্র চার মাস ৭ দিন আগে ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি গঠিত জাতীয় পার্টি দখল করে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসন।

বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে। এ জয় ছিল রাজনৈতিক বিশ্নেষকদের কাছে অভাবনীয়। তারা দেখেছেন, রাজপথের প্রবল শক্তি আওয়ামী লীগ, বিএনপির তুলনায় কর্মী-সমর্থক ও জনসমর্থনে তারা এগিয়ে। শেখ হাসিনা এ ফলকে 'সূক্ষ্ণ কারচুপি' বলায় অনেকে নাখোশ হয়েছেন, 'অদূরদর্শিতা' মনে করেছেন। কিন্তু পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ তার অভিযোগের যথার্থতা প্রমাণ করেছে। ওই নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যার প্রত্যক্ষ দোসর জামায়াতে ইসলামীর মৈত্রী ছিল পর্দার আড়ালে, যা প্রত্যক্ষ রূপ নেয় ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের সংসদ নির্বাচনে। এ প্রত্যক্ষ গাঁটছড়ার পেছনে প্রত্যক্ষ অবদান বেগম খালেদা জিয়া এবং দলে ক্রমে শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকা তারেক রহমানের। এ আঁতাতের কারণে বাংলাদেশের রাজনীতি নতুন করে কলুষিত হয়েছে। হিংসার পথে চলেছে। সুপরিকল্পিতভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুছে ফেলার চক্রান্ত বাস্তবায়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

বিএনপি ফের রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি-না, এ প্রশ্ন যারা করেন তাদের উদ্দেশে বলি- ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং তার মৌল আদর্শ বিসর্জন দিয়ে বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দল জনমনে স্থায়ী আসন করতে পারবে না। বিএনপি তার জন্মলগ্ন থেকে ভ্রান্ত পথ অনুসরণ করেছে। তারা এ পথ থেকে সরে আসুক, এ প্রত্যাশা অনেকের। কিন্তু আমার ধারণা- এ পথ থেকে সরে আসার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপি নামের দলটির অস্তিত্বও বিপন্ন হয়ে পড়বে। দলটি যে একাত্তরের চেতনার বিরুদ্ধেই গড়ে ওঠা! তা বিসর্জন করে এগিয়ে যাবে কীভাবে!

বেগম খালেদা জিয়া ১৫ মাস জেলে। তার বন্দিদশাতে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করেছে। ৫ বছর আগে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনেও তারা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারার কারণে বিপর্যয়ে পড়েছিল। আওয়ামী লীগ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর এর চেয়েও বড় বিপর্যয়ে পড়েছিল। কিন্তু দলটি রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুযায়ী চলতে পেরেছে সব সময়। কঠিনেরে ভাল বাসিলাম, সে কখনো করে না বঞ্চনা- এটা তারা মনে রেখেছে। বিএনপি তা পারেনি। সামনের দিনগুলোতে পারবে, সে ভরসাও অনেকে রাখেন না। জিয়াউর রহমানের মৃত্যু হয়েছে ৩৮ বছর আগে। বেগম খালেদা জিয়া দলের প্রথমে ভাইস চেয়ারপারসন ও পরে চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে পা রেখেছেন তিন যুগ আগে। তিনি ফের ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন? এ প্রশ্ন অনেকে করেন। তার শেষের শুরু কি-না, এ প্রশ্নও উঠছে। দলের মধ্যে বিভেদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। তিনি পুত্র তারেক রহমানকে উত্তরাধিকার হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন, যাকে নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে হাজারো প্রশ্ন। তার ন্যায়নীতি-নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ। দুর্নীতির দায়ে কেউ সাজা পেলে তাকে দলের কোনো পদে রাখা হবে না- গঠনতন্ত্র থেকে এ ধারা বাদ দেওয়া হয়েছে অতি গোপনে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- বাংলাদেশের গৌরবের মুক্তিযুদ্ধ যাদের কাছে গুরুত্বহীন, একাত্তরের ঘাতকরা যাদের কাছে খুব ঘনিষ্ঠ মিত্র, উন্নতি-অগ্রগতির পথে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা যাদের কাছে অগ্রাধিকার নয়- এমন একটি দল কি ৩০ লাখ শহীদের রক্তে অর্জিত বাংলাদেশে দীর্ঘদিন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে কি?

সাংবাদিক
ajoydg@gmail.com


মন্তব্য

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ