ভারতের নির্বাচনে 'বাংলাদেশ কার্ড'

প্রতিবেশী

প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০১৯

ভারতের নির্বাচনে 'বাংলাদেশ কার্ড'

  শেখ রোকন

ভারতের সপ্তদশতম সাধারণ নির্বাচনেও কি তাহলে 'বাংলাদেশ কার্ড' খেলা হচ্ছে না? দিন কয়েক আগে প্রকাশিত দেশটির প্রধান দুই রাজনৈতিক দল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস ও ভারতীয় জনতা পার্টির নির্বাচনী ইশতেহার দেখে অন্তত তেমন প্রশ্ন জাগতেই পারে। প্রশ্নটির উত্তর যদিও এক কথায় দেওয়া কঠিন।

গত ডিসেম্বরে সমকালেই লিখেছিলাম, বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো 'ভারত কার্ড' খেলা হয়নি। নির্বাচন সামনে রেখে লিখিত ইশতেহার থেকে প্রচারণার অলিখিত বক্তৃতা, কোথাও সরকার বা বিরোধী দলের কেউই অতীতের মতো ভারতবিরোধিতা করে জনসমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেনি। বলা বাহুল্য, নির্বাচনের আগে জাতীয়তাবাদী জোশ তৈরি করতে প্রতিবেশী দেশবিরোধী জিগির তোলার রেওয়াজ কেবল বাংলাদেশেই নেই, ভারতেও নির্বাচন সামনে রেখে একই কৌশল অবলম্বন করে রাজনৈতিক দলগুলো। আমাদের প্রতিবেশী দেশটিতে সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ছাড়াও পাকিস্তান ও চীন কার্ড খেলা হয়। বস্তুত এটা বৈশ্বিক নির্বাচনী কৌশল।

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনেও প্রত্যেকবার রাশিয়া কার্ড খেলা হয়ে থাকে।

গত লোকসভা নির্বাচনেও, ২০১৪ সালে খোদ নরেন্দ্র মোদি আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের মতো বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে এসে জনসমাবেশে বলেছিলেন, তারা সরকার গঠন করতে পারলে 'বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী' এসব রাজ্য থেকে বহিস্কৃত হবে। ওই নির্বাচনে বিজেপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। কিন্তু তাতে করে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় কোনো ছেদ পড়েনি। বরং সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাবে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের সময় আটকে থাকা স্থল সীমান্ত চুক্তি পাস করেছিল বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার। এই অনুসিদ্ধান্তও অমূলক হবে না যে, কংগ্রেস জমানার তুলনায় বিজেপি জমানায় দুই 'বন্ধু রাষ্ট্রের' আর্থসামাজিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। কিন্তু কূটনীতি ও রাজনীতির চশমা যে ভিন্ন, লোকসভা নির্বাচনের দুই বছর পর আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনেই তা হাতে-কলমে প্রমাণ হয়েছিল। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারকালে দেশের প্রধানমন্ত্রী পদে থাকার কারণে নরেন্দ্র মোদি নিজে সরাসরি বলেননি; কিন্তু বিজেপির প্রথম সারির নেতারা ফের 'অবৈধ বাংলাদেশি' বহিস্কার ইস্যু সামনে রেখে মাঠে নেমেছিল। বলা বাহুল্য, সেখানকার বাংলাভাষী জনগোষ্ঠী, বিশেষত বাংলাভাষী মুসলিম সম্প্রদায়কেই তারা বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে থাকে। অথচ এটা ঐতিহাসিকভাবেই সত্য ও প্রমাণিত যে, ওইসব বাঙালি বা বাংলাভাষী দেশবিভাগের অনেক আগে থেকেই আসাম বা পশ্চিমবঙ্গের অবিচ্ছেদ্য অধিবাসী।

অতীতের এসব নির্বাচনী বাকওয়াজির ক্ষেত্রে এবার খানিকটা গুণগত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছে, উত্তর-পূর্ব ভারতীয় রাজ্যগুলোতে অবৈধ অভিবাসী ঠেকাতে দলটি কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। তাদের মতে, কথিত অবৈধ অভিবাসনের কারণে রাজ্যগুলোর কোনো কোনো অংশে সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত পরিচয়ের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে আসছে। এর ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা ও কর্মসংস্থানে বিরূপ প্রভাব তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে কংগ্রেস বলছে, উত্তর-পূর্ব ভারতের সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় বিশেষ সাংবিধানিক সুরক্ষা দরকার। সেখানকার অবৈধ অভিবাসী ইস্যুটি সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সাংবিধানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাধান করা হবে।

লক্ষণীয়, বিজেপির এবারের ইশতেহারে কথিত অবৈধ অভিবাসী বা অনুপ্রবেশকারী ইস্যুতে সরাসরি বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হয়নি। কংগ্রেস ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশের বন্ধু রাজনৈতিক দল। এখানে যেমন আওয়ামী লীগ ঐতিহাসিকভাবেই ভারতের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন রাজনৈতিক দল হিসেবে চিহ্নিত। বিজেপিই বরং বরাবর নির্বাচনী মৌসুমে 'বাংলাদেশ কার্ড' খেলে এসেছে। এখানে যেমন 'ভারত কার্ড' একাদশ নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ছিল বিএনপির দখলে।

প্রসঙ্গত, সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচন সামনে রেখে ভারতের প্রধান দুই রাজনৈতিক পক্ষ বহুল আলোচিত জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস (এনআরসি) প্রসঙ্গে সরাসরি বিপরীত অবস্থান নিয়েছে। বিজেপি বলছে, এনআরসি প্রক্রিয়া অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উত্তর-পূর্ব ভারতে এগিয়ে নেওয়া হবে। ভবিষ্যতে পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য অংশেও বাস্তবায়ন হবে। বাংলাদেশের দিক থেকে দেখলে, বিজেপির অবস্থান আগের তুলনায় ইতিবাচক। নির্বাচনের হাটে যা-ই বলুক না কেন, বাস্তবে অবৈধ অভিবাসন ইস্যু যে তাদের জন্য বুমেরাং হতে পারে, আসামে এনআরসি করতে গিয়ে দলটি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। খোদ আসামেই এনআরসির বিরোধিতা ক্রমে প্রবল হচ্ছে। আর পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যাগুরু রাজনৈতিক দল তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বাংলায় এসব চলবে না।

কথিত অবৈধ অনুপ্রবেশ বা অভিবাসী ইস্যুতে না হোক, বিজেপির ইশতেহারে বাংলাদেশের নাম কি একেবারেই নেই? আছে এবং এই একটি বিষয়ই ঢাকার কপালে ভাঁজ ফেলতে পারে। সেটা হচ্ছে, ঝুলে থাকা নাগরিক সংশোধনী বিল। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ভারতে গেলে তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। এই বিল ভারতের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীলতা তো তৈরি করবেই, বাংলাদেশসহ যে দেশগুলোর নাম উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানেও তৈরি হবে অস্থিরতা। আশার কথা, কংগ্রেস তাদের ইশতেহারে বলছে, সরকার গঠন করতে পারলে 'কুখ্যাত' নাগরিক সংশোধনী বিল প্রত্যাহার করা হবে।

ভারতের আসন্ন নির্বাচনে সরাসরি 'বাংলাদেশ কার্ড' না থাকার কৃতিত্ব খানিকটা বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার নিতে পারে। টানা তিন মেয়াদে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে ঢাকার সুদৃঢ় ও ধারাবাহিক অবস্থান বিজেপির মতো রাজনৈতিক দলেও নতুন উপলব্ধির জন্ম দিয়েছে। দেশটির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বাংলাদেশ হয়ে উঠছে আদর্শ প্রতিবেশীর উদাহরণ। কিছুদিন আগে একজনকে বলতে শুনেছি 'পড়শি হো তো অ্যায়সা'। প্রতিবেশী এমনই হওয়া উচিত। চীন যখন প্রধান প্রতিপক্ষ, পাকিস্তান যখন বরাবরের বৈরী, শ্রীলংকা ও মালদ্বীপ যখন চীনের পকেটে, নেপাল যখন দোদুল্যমান, ভুটান যখন ক্রমে বেইজিংয়ের দিকে হেলছে; তখন বাংলাদেশ হচ্ছে ভারতের একমাত্র নির্ভরযোগ্য প্রতিবেশী। নাগরিক সংশোধনী বিল সেই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কেও সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি করবে বৈকি।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিজেপি শুধু নয়, কংগ্রেস ও বামফ্রন্টও যে অবস্থান নিয়েছে, তা বাংলাদেশের অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। বিজেপি ও কংগ্রেস উভয় রাজনৈতিক দলের ইশতেহারেই 'প্রতিবেশী প্রথম' নীতি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। বিজেপি বাড়তি বলেছে বিমসটেকের মতো আঞ্চলিক উদ্যোগ আরও জোরদার করার কথা। আরও যে বিষয়টি লক্ষণীয়, এবারের নির্বাচনে ভারতের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহল বাংলাদেশকে তাদের অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশীদার হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছে। নিছক ক্ষুদ্র প্রতিবেশী হিসেবে নয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, এবারের লোকসভা নির্বাচনে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরাসরি বাংলাদেশ কার্ড খেলেনি এবং অস্বস্তিকর ইস্যুগুলোতে কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে বলে ঢাকা কি আত্মতুষ্টিতে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবে? বাংলাদেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে 'ভারত কার্ড' খেলা হয়নি বলে নয়াদিল্লি কিন্তু পুরনো অবস্থান থেকে সরে গিয়ে বসে ছিল না। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার নির্বাচন নিয়ে একেবারে নিশ্চুপ থাকার অবস্থান নিলেও ওয়াকিবহাল মহল জানে, তার নীরব দূতিয়ালি কতটা তৎপর ও কার্যকর ছিল।

আমি বলছি না যে, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার যেমন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের মাধ্যমে তার দেশের অবস্থান প্রতিফলিত করতে চেয়েছেন, ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনারকেও সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনের আগে তেমন ভূমিকা নিতে হবে। তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব হলেও প্রায়োগিক ক্ষেত্রে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো বাংলাদেশের প্রত্যাশামতো চলবে, এটা বাস্তবানুগ নয়। কিন্তু প্রভাব যে মাত্রারই হোক, সেখানকার রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে ঢাকার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার বিকল্প নেই। এতে করে আর কিছু না হোক, ভোটের জন্য হলেও 'বাংলাদেশ কার্ড' নামে বা বেনামে খেলার প্রবণতা নিঃসন্দেহে হ্রাস পাবে।

এটা অস্বীকারের অবকাশ নেই যে, লোকসভা নির্বাচনের ফল বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও কূটনৈতিক অবস্থানে প্রভাব ফেলতে বাধ্য। সে ক্ষেত্রে দিল্লির মসনদে কারা আসছেন, তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ও কর্মসূচি কী- এসব ব্যাপারে ঢাকা নির্লিপ্ত থাকতে পারে না।

লেখক ও গবেষক
skrokon@gmail.com



মন্তব্য