স্বপ্নের দিনে দুঃস্বপ্নের হানা

প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০১৯

স্বপ্নের দিনে দুঃস্বপ্নের হানা

  এমাজউদ্দীন আহমদ

দীর্ঘ ২৮ বছর ১০ মাসের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ১১ মার্চ ডাকসুর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। 'মিনি পার্লামেন্ট' হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ক্যাম্পাসে যে জাগরণ ঘটেছিল, তা অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া আর ব্যবস্থাপনায় এবং আধিপত্য বিস্তারের কারণে মলিন হলো। ফলাফল যাই হোক না কেন, এখন এর চেয়েও বড় কথা হলো, ১১ মার্চ ডাকসুর ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু থেকেই সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ফুটে উঠতে থাকল বহুবিধ নেতিবাচক চিত্র। এই নির্বাচন ঘিরে যেমন প্রত্যাশা ছিল ব্যাপক এবং স্বপ্ন ক্রমেই পুষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু এও সত্য যে, এর পাশাপাশি নানাবিধ শঙ্কাও ছিল। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার দরজা খোলার প্রক্রিয়াটা হবে স্বচ্ছ ও প্রশ্নমুক্ত- এই প্রত্যাশাটা শেষ পর্যন্ত জয়ী হতে পারেনি। ১১ মার্চ টেলিভিশন ও অনলাইন নিউজ পোর্টালের খবর- পর্যবেক্ষকরাও এই নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নানারকম অসঙ্গতি-অস্বচ্ছতা লক্ষ্য করেছেন। এই অনিয়মের প্রতিবাদে দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার্থীরাও সরব। ওই দিন সকাল ৮টায় ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল সংসদের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা অস্বচ্ছ ব্যালট বাক্স খুলে দেখানোর দাবি জানায়। কিন্তু তাদের এই দাবি মানেননি হল প্রাধ্যক্ষ। শিক্ষার্থীরা ভোট দানে অসম্মতি জানালে এক পর্যায়ে কর্তৃপক্ষ ব্যালট বক্সগুলো ভোটকেন্দ্রের পাশে পাঠকক্ষে নিয়ে যায় এবং বাক্সভর্তি সিলমারা ব্যালটের অস্তিত্ব মেলে!

এটা হলো প্রাথমিক পর্যায়ে দৃষ্টিগ্রাহ্য বড় রকমের অনিয়ম। ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে যেসব অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে, তা নিয়ে বিব্রত বলে জানিয়েছেন প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান। একই সঙ্গে তিনি নির্বাচনে বিশৃঙ্খলার কারণে ব্যক্তিগতভাবে দুঃখও প্রকাশ করেছেন। ১২ মার্চ পত্রপত্রিকায় তার এসব বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। অনিয়ম-অস্বচ্ছতার কারণে একপর্যায়ে ছাত্রলীগ বাদে প্রায় সব প্যানেল নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়। ফল ঘোষণায়ও অনেক বিলম্ব ঘটে। প্রায় শেষ রাতে ঘোষিত ফলে দেখা যায়, ভোট বর্জন করেও ভিপি পদে নির্বাচিত হয়েছে নুরুল হক। সে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের প্রার্থী। জিএস-এজিএসসহ ২৩টি পদে জিতেছে ছাত্রীগ। ১৮টি হল সংসদের মধ্যে ১২টিতে ভিপি পদে জয়ী হয়েছে ছাত্রলীগের প্রার্থীরা। বাকি ৬টি হলে ভিপি পদে জয়ী হয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। ছাত্রদের হলে ছাত্রলীগ বলতে গেলে প্রায় একচেটিয়া জয় পেলেও ছাত্রীদের ৫টি হলের মধ্যে ৪টিতেই তারা হেরেছে। নির্বাচনে জয়-পরাজয় থাকবেই। কিন্তু অনিয়ম-অস্বচ্ছতার ছায়া

যদি গাঢ় হয়, তাহলে তা অবশ্যই দুঃখজনক এবং নিন্দনীয়।

ভিপি পদে জয়ী প্রার্থী নুরুল হক নুর ১১ মার্চ দুপুরে ছাত্রলীগের নারী কর্মীদের হামলায় আহত হওয়ার সংবাদ গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়। পরে জানা গেছে, নুরুল হকসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় মামলা হয়েছে রোকেয়া হলের প্রভোস্টকে লাঞ্ছিত ও ভাংচুরের অভিযোগে। ডাকসু নির্বাচন নিয়ে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেই নয়, সারাদেশের শিক্ষার্থীসহ রাজনীতিক ও সচেতন মানুষের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ এবং আশার সঞ্চার ঘটেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনেক রাজনীতিবিদ তৈরি করেছে। জাতীয় পর্যায়ে তাদের অবদান ব্যাপক। '৫২ থেকে '৭১ এবং স্বাধীন বাংলাদেশেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভূমিকা গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের আলোকিত অধ্যায়। এবারও এই নির্বাচন ঘিরে সঙ্গতই প্রত্যাশা জেগেছিল, ভবিষ্যতের জন্য নতুন রাজনীতিবিদ তৈরির পথ করে দেবে এই নির্বাচন। ছাত্র সংসদ নির্বাচন দীর্ঘদিন ধরে পুরনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েই হয়নি। নতুনগুলোর কথা তো আর এ ব্যাপারে বলারই নয়। তৃণমূল থেকে যদি দেশের রাজনীতিবিদ তৈরির পথটা সংকুচিত হয়ে পড়ে, তাহলে এর নেতিবাচক প্রভাব বহুমুখী হতে বাধ্য এবং এমন নজির আমাদের সামনে আছেও। তরুণরা যে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় আসার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার মুখে রয়েছে এর কারণ বহুবিধ এবং তা দেশ-জাতির জন্য মঙ্গলজনক কোনো বার্তা নয়। যতই বলা হোক ডাকসু নির্বাচন উৎসবমুখর হয়েছে, বাস্তবতা কিন্তু এর বিপরীত চিত্র ধারণ করে আছে।

পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়েই নানারকম নেতিবাচক কথা আগে থেকেই শোনা যাচ্ছিল। বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে নানারকম আপত্তিও জানানো হয়েছিল প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ত্রুটির বিষয়গুলো তুলে ধরে। কিন্তু এই আপত্তি-অভিযোগ কর্তৃপক্ষ যথাযথভাবে আমলে নেয়নি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক যাতে হয় এই দাবি-প্রত্যাশা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মহলের ছিল। ওই নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হলেও শেষ পর্যন্ত কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার কারণে কীভাবে কলুষিত হয়েছে, এর ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ নতুন করে নিষ্প্রয়োজন। ডাকসু নির্বাচন ঘিরেও বিভিন্ন মহলের প্রত্যাশা-দাবি এ রকমই ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশা হোঁচট খেল। যেসব অনিয়ম-অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠেছে, সেসব ঠেকানো মোটেও দুরূহ ছিল না, যদি সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলরা নির্মোহ অবস্থান নিয়ে দায়বদ্ধ থেকে দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠ থাকতেন। দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা-প্রক্রিয়া প্রশ্নের মুখে রয়েছে। এখন ডাকসু নির্বাচন ঘিরে সৃষ্ট পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়, এ নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। কারণ যে উৎসব অনিয়ম-অস্বচ্ছতায় মাটি হয়ে যায়, এর ফল বহুমুখী বিরূপ হওয়ার শঙ্কাটাই প্রকট থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক,

সামাজিক আন্দোলনের সূতিকাগার। ডাকসু নির্বাচনে অনিয়ম-অস্বচ্ছতার অভিযোগে অনির্দিষ্টকালের জন্য ছাত্র ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে ছাত্রদল, বাম সংগঠন, কোটা

সংস্কার সংগঠনসহ স্বতন্ত্র প্যানেলের প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা।

কুয়েত মৈত্রী ও রোকেয়া হলে দফায় দফায় ভোট স্থগিত, হলে হলে ডামি লাইন, ব্যালটে ক্রমিক নম্বর না থাকা, অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের নগণ্য উপস্থিতি, মুহসীন হলে ভোটদানে বাধা ইত্যাদি বিষয়ের নানারকম ব্যাখ্যাচিত্র গণমাধ্যমে প্রকাশিত-প্রচারিত হয়েছে। ডাকসু নির্বাচনের আগে অর্থাৎ ১০ মার্চ পর্যন্ত ক্যাম্পাসে যে প্রাণের স্পন্দন লক্ষ্য করা গেছে, ১১ মার্চ তা ক্ষোভে পরিণত হয়। এমনটি তো কাঙ্ক্ষিত ছিল না। কিন্তু কেন এমন হলো- এর ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণও নিষ্প্রয়োজন। কারণ গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইত্যাদির ব্যাপক প্রসারের কারণে এখন আর কোনো কিছুই গোপন রাখা সম্ভব নয়। ডাকসুর প্রতি যে আস্থা ছিল তাও ব্যর্থতায় পর্ববসিত হলো। এই যে নির্বাচন ক্রমেই অর্থহীন হয়ে পড়ছে এর ফল তো গণতন্ত্রের জন্য ভালো নয়, ভালো হতে পারে না। কেন কলঙ্কের খতিয়ান বিস্তৃত হওয়ার পথ ধাপে ধাপে সৃষ্টি করা হচ্ছে? কাঙ্ক্ষিত ডাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন করে সৃষ্টি করা হলো জটিলতার। একই সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ করা হলো। এবার ডাকসু নির্বাচনে যা ঘটল, তা আমাদের জাতীয় নির্বাচন ও রাজনীতি বিচ্ছিন্ন কিছু কি? ২৮ বছর ১০ মাস পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন যে উদ্যোগ নিয়ে একটি ভালো দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছিল, তা সফল হলো না। আমাদের গোটা নির্বাচন ব্যবস্থাই বিতর্কিত। এর মধ্যে ডাকসুর ঘটনা তা আরও পুষ্ট করল। স্বপ্নের দিনটিতে দুঃস্বপ্ন হানা দিল। এর ক্ষতিটা কীভাবে পোষানো যাবে কিংবা কারও কারও স্বেচ্ছাচারিতার প্রতিকার কী হবে- এসব প্রশ্নের উত্তরের জন্য তাকিয়ে আছি ভবিষ্যতের দিকে। যে কোনো উপায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ডাকসুর হূত ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করার ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তা না হলে এর অপচ্ছায়া অন্যত্রও বিস্তৃত হবে।

যে জনপদে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, স্বচ্ছ নির্বাচন ব্যবস্থাটা সেখানে অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হয়। নির্বাচন ব্যবস্থার প্রধান ভিত্তি হলো, স্বাধীনভাবে একজন ভোটার হিসেবে প্রতিনিধি কে হবেন, তা নিশ্চিত করার জন্য ভোটাধিকার প্রয়োগ করা। এটা একজন ভোটারের অন্তরের চাহিদা এবং এটাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল স্তম্ভও। এই দুই অংশই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভোটদাতা যাকে খুশি ভোট দিতে পারবে আর ভোট প্রার্থনাকারী একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ভোট প্রার্থনা করবে। এই ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হলে সর্বপ্রথম কার্যকর করতে হবে ভোট বা রায় দান করার স্বচ্ছ প্রক্রিয়াগত দিকটি। এর কোনো বিকল্প নেই। ভোটদান কিংবা প্রার্থীর পক্ষে রায় ভোটদাতার বিবেকের বন্ধন। কোনো হালকা সম্পর্কের বিষয় এটি নয়। এই প্রক্রিয়াকে যে সমাজ যথার্থ মূল্য দিতে শেখেনি, সেই সমাজ এখনও গণতন্ত্রের জন্য যোগ্য হয়ে ওঠেনি। ভোটদান এবং ভোট গ্রহণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নৈতিক আহ্বান। এর যথার্থ সম্মান দিতে শিখেই গণতন্ত্রকে সম্মান দিতে পারি আমরা। আমি ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। ১৯৫৩-৫৪ সেশনে ফজলুল হক হলের ভিপি নির্বাচিত হই। ১৯৫৪ সালের ৩১ মে ছাত্র আন্দোলন করতে গিয়ে আমাকে কারাবরণ করতে হয়। দীর্ঘদিন কাটে কারাগারে। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রজীবন শেষ করে এক পর্যায়ে যোগ দেই শিক্ষকতায়। পরবর্তীকালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্বও পালন করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আমার মতো অসংখ্যজনের গর্বের অন্ত নেই। কিন্তু যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো নেতিবাচক ঘটনা ঘটে, তখন সঙ্গতই আমরা পীড়িতও হই। তখনকার রাজনীতি আর এখনকার রাজনীতির মধ্যে পার্থক্য বিস্তর। ছাত্র রাজনীতি ছিল লেজুড়বৃত্তিমুক্ত। বরং ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্তদের অন্যভাবে মূল্যায়ন করা হতো। ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্তদের হীনস্বার্থে কিংবা কোনো কৌশলে ব্যবহার করা হতো না। সব শেষে বলতে চাই, যতক্ষণ ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে নির্বাচন প্রক্রিয়া যুক্ত থাকবে (আমাদের বাস্তবতায়), ততদিন পর্যন্ত ভোটের কার্যকারিতা থাকবে না। নিশ্চয়ই এর প্রমাণ আমরা ইতিমধ্যে বহুবার পেয়েছিও।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য