ডাকসু নির্বাচন

বিশ্ববিদ্যালয় হোক নেতৃত্বের তীর্থালয়

প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০১৯

বিশ্ববিদ্যালয় হোক নেতৃত্বের তীর্থালয়

   ড. মেসবাহউদ্দিন আহমেদ

২৮ বছরের প্রতিবন্ধকতা সরে যাচ্ছে। ১১ মার্চ দিনটি ইতিহাসে জায়গা করে নিল। তবে চার জোট ভোট বর্জন করেছে। ছাত্র ধর্মঘট, উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও, ক্লাস বর্জনের ডাক দিয়েছে নির্বাচনে অংশ নেওয়া অন্য ছাত্র সংগঠনগুলো। এ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে কম বেগ পেতে হচ্ছে না! আমি একটু অন্য প্রসঙ্গে বলতে চাই। আজকের এই মাহেন্দ্রক্ষণে একজন মানুষের নাম না বললেই নয়, তিনি হলেন আমাদের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী। তিনি ডাকসু নির্বাচনের জন্য সবচেয়ে যুগোপযোগী পন্থা ও সাহস করেছিলেন। ছাত্রনেতা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী সবাইকে নিয়ে দিনের পর দিন মিটিং, ক্যাম্পাসে অবাধ বিচরণ ও হলে সহাবস্থান নিশ্চিত করেছিলেন। কিন্তু গায়েবি শিবিবের কুপ্রবঞ্চনায় ছাত্রদল বিভ্রান্ত হয়ে নির্বাচন হতে দেয়নি। তফসিলও ঘোষণা করা হয়েছিল সেবার। ১৯৯৮ সালে ডাকসুর কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। ওই সময় ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। আজ আর একটি ছেলের নাম মনে পড়ে গেল। ডাকসু নির্বাচনের জন্য দিনের পর দিন অনশনকারী সাবেক শিক্ষার্থী ওয়ালিদ আশরাফকে। সে সবাইকে নাড়া দিতে পেরেছিল।

দিনের পর দিন ডাকসু নির্বাচন না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মাঝে আমি কোনো দেশ সম্পর্কিত সচেতনতাবোধ দেখিনি তেমন একটা। রোবটিক মনে হচ্ছিল তাদের। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর নিলক্ষেত থেকে বিসিএস গাইড এনে চাকরির প্রস্তুতি নেয় তারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কী, বাংলাদেশের ইতিহাস কী, আত্মপরিচয় সম্পর্কে বেমালুম ভুলে যায়। চেতনায় দিনের পর দিন মরিচা পড়ে তাদের। শিক্ষার্থীদের মাঝে পিছুটান বা চাকরির আবশ্যকতা সবসময়ই ছিল, থাকবে। তাই বলে নিজের সত্তাকে ভুলে গিয়ে নয়। গত এক মাস ধরে ক্যাম্পাসের রবরব পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের মাঝে রাজনৈতিক সচেতনতাবোধ দেখে আমার বুকটা ভরে গেছে। ১৯৭০-৮০র ক্যাম্পাস মনে হয়েছে আমার কাছে। ১৯৯৭ সালে আমি যখন কবি জসিম উদদ্‌ীন হলের প্রভোস্ট ও পরবর্তীকালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলাম তখনই উপলব্ধি করেছি, ঢাবিসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে ডাকসুর আবশ্যকতা কতটুকু। প্রশাসন থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি, রাজনীতি, শিক্ষার্থীদের অধিকার, হলের সিট বণ্টনসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অপরিসীম।

আমি তো রীতিমতো ঘাবড়ে গিয়েছিলাম, শিক্ষাদানের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট, বিধিবিধান, বাণিজ্যিক ধারার ইভিনিং শিফট, নিয়মিত ও অনিয়মিত শিক্ষার্থী চিহ্নিত করে প্রহণযোগ্য ভোটার তালিকা করা বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দক্ষতার পরিচয় দিয়ে তাও সমাধান করতে পেরেছে। অবশ্য কিছু ভুলভ্রান্তি হয়েছে; তবে তা বড় ব্যাপার নয়। পত্রিকায় দেখেছিলাম, ডাকসুর সাবেক নেতারা বলেছিলেন, ২৮ বছর আগের প্রেক্ষাপট আর ২০১৯-এর প্রেক্ষাপট এক নয়। রক্তের গঙ্গা বয়ে যাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে। এমন হতে পারে- হল, ক্যাম্পাস ভ্যাকেন্ট করতে হতে পারে। যাক, সে রকম কিছু শুনতে হয়নি। এ সরকারের কল্যাণে গত এক দশকে তেমন কোনো কিছুই হয়নি এ বিশ্ববিদ্যালয়ে।

আমার বক্তব্যের মূল বিষয়টি হলো, গত এক মাসে আমার প্রাণের বিশ্ববিদ্যালয়টির যে রূপ দেখলাম, সত্যিই তা আমার স্বপ্নের মতো মনে হয়েছে। শিক্ষার্থীরা কতটা সচেতন নিজেদের দাবি-দাওয়া, অধিকার সম্পর্কে। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও মমত্ব-ভালোবাসা দেখে আমি অবাক। সবাই ঠিক করছে নিজেদের জয়ী করতে স্ট্র্যাটেজি প্ল্যান। সঙ্গে দিয়েছেন প্রতিশ্রুতি। সবচেয়ে বড় কথা, ঝিমিয়ে পড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আপন প্রাণে স্পন্দিত হয়েছে। সত্যিকার অর্থে, শিক্ষার্থীরা আত্মপরিচয় দিতে শিখেছে। ফলাফল নিয়ে মত-দ্বিমত থাকবে। ভুলত্রুটিও থাকতে পারে। তবে যে প্রাণের স্পন্দন দেখলাম সবার মাঝে, তা বহমান থাকুক। বিশ্ববিদ্যালয় হোক সব ক্ষেত্রে নেতৃত্বের তীর্থালয়। শান্তি বজায় রাখতেই হবে। এই এক মাসের যে শিক্ষা তারা অর্জন করল, তার প্রভাব রাখবে জীবনের সব ক্ষেত্রে।

শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক বিশ্নেষক ও সাবেক উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য যোগ করুণ