খেলাপি ঋণ: কার্পেটে লুকানো অনৈতিকতা

সমকালীন প্রসঙ্গ

প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০১৯

খেলাপি ঋণ: কার্পেটে লুকানো অনৈতিকতা

  ড. মইনুল ইসলাম

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) 'ব্যাংকিংয়ে নৈতিকতা' (এথিকস্‌ ইন ব্যাংকিং) শীর্ষক ১৮তম নুরুল মতিন স্মারক বক্তৃতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এবারের নুরুল মতিন স্মারক বক্তৃৃতাটি উপস্থাপন করেছেন ভারতে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর বাংলাদেশের সন্তান ড. কামাল জুনায়েদ আহমাদ। ওইদিন সন্ধ্যার টেলিভিশন খবরে এবং পরদিন ২৭ ফেব্রুয়ারি তারিখের পত্রপত্রিকায় ড. কামাল জুনায়েদের নিচের মন্তব্যটি সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে- 'সাংসদরা ব্যাংক খাতে জড়িয়ে পড়েছেন এবং ব্যাংক খাতে নৈতিকতাকে উপেক্ষা করছেন। গিভ মি অ্যান এথিক্যাল পার্লামেন্ট, আই উইল গিভ ইউ অ্যান এথিক্যাল ব্যাংকিং সিস্টেম (আমাকে একটি নৈতিক পার্লামেন্ট দিন, আমি আপনাকে একটি নৈতিক ব্যাংকিং খাত দেবো)'। তিনি অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেছেন, খেলাপি ঋণ সমস্যা একটি পলিটিক্যাল ইকোনমি সমস্যা, এটি টেকনিক্যাল সমস্যা নয়। ২০১০ সালে প্রকাশিত খেলাপি ঋণের ওপর আমার ও মহিউদ্দিন সিদ্দিকীর গবেষণা-পুস্তক 'এ প্রোফাইল অব ব্যাংক লোন ডিফল্ট ইন দ্য প্রাইভেট সেক্টর ইন বাংলাদেশ'-এর মূল বক্তব্যও এটাই :দেশের অনৈতিক রাজনীতির কারণেই খেলাপি ঋণ সমস্যা সংকটে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতাসীন সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের ঐকান্তিক সদিচ্ছা ব্যতিরেকে রাঘববোয়াল ঋণখেলাপিদের কেশাগ্রও স্পর্শ করা যাবে না।

১৯৯৮-২০০১ সাল- এই তিন বছরে ডেপুটেশনে আমি বিআইবিএমের মহাপরিচালক থাকার সময় ১৯৯৮ সালে প্রথম নুরুল মতিন স্মারক বক্তৃতা অনুষ্ঠানটির আয়োজন শুরু হয়েছিল এবং প্রথম বক্তৃতাটি উপস্থাপন করেছিলেন বাংলাদেশের তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। ওই বক্তৃতায় তিনিই প্রথম দেশের খেলাপি ঋণ সমস্যাকে 'অনৈতিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির শিকার' চিহ্নিত করে বিচার ব্যবস্থার অকার্যকারিতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে বড় বড় 'ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির' শাস্তি প্রদানের ব্যর্থতা থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে প্রতিটি ব্যাংকের শীর্ষ ১০ জন ঋণখেলাপির দ্রুত বিচার ও শাস্তি প্রদানের জন্য 'ঋণখেলাপি ট্রাইব্যুনাল' গঠনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতির ট্রাইব্যুনাল গঠনের ওই আহ্বানসহ স্মারক বক্তৃতাটির বিস্তৃত বিবরণ দেশের সব পত্রপত্রিকায় পরদিন প্রথম হেডলাইন হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল এবং জনগণের মধ্যে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। পরের বছর ১৯৯৯ সালে দ্বিতীয় নুরুল মতিন স্মারক বক্তৃতা প্রদান করেছিলেন দেশের আরেকজন প্রধান বিচারপতি ও ১৯৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা সর্বজনশ্রদ্ধেয় জ্ঞানতাপস বিচারপতি হাবিবুর রহমান। তিনিও তার বক্তৃতায় ঋণখেলাপি ট্রাইব্যুনাল গঠনের আহ্বানের পুনরুক্তি করেছিলেন। কিন্তু দেশের একজন রাষ্ট্রপতি এবং দু-দু'জন প্রধান বিচারপতির ওই আহ্বান তদানীন্তন সরকার কিংবা পরবর্তী ১৯ বছর ধরে ক্ষমতাসীন কোনো সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়নি। ফলে, এখনও দেশের ব্যাংকিং খাতের প্রধান সমস্যা রয়ে গেছে রাঘববোয়াল ঋণখেলাপিদের কাছে আটকে থাকা বিপুল খেলাপি ঋণ। এই ঋণখেলাপিদের প্রায় সবাই 'ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি'। মানে যারা সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছেন- তারা তাদের ঋণ ফেরত দেবেন না। কারণ, তাদের রাজনৈতিক প্রতিপত্তি ও আর্থিক প্রতাপ দিয়ে তারা শুধু ব্যাংকিং খাত নয়; দেশের সংসদকেও দখল করে ফেলেছেন। (গত ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখের নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদের নির্বাচিত সদস্যদের ৬১.৭ শতাংশই ব্যবসায়ী। তাদের সিংহভাগই ব্যাংকের মালিক/পরিচালক।) অতএব, এই ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের যথোপযুক্ত বিচার যদি দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করা না যায়, এবং অর্থঋণ আদালতে তাদের বিরুদ্ধে প্রদত্ত রায় যদি উচ্চতর আদালতে আপিল করে বছরের পর বছর আপিল মামলাকে অর্থশক্তি ও রাজনৈতিক শক্তির জোরে ঘুম পাড়িয়ে রাখা যায়, তাহলে রাঘববোয়াল ঋণখেলাপিদের বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে শায়েস্তা করে খেলাপি ঋণ আদায় অসম্ভব থেকে যাবে। অনেক 'রাইট-অফ' করা মন্দঋণ ২০০২ সালে 'রাইট-অফ' করা চালু হওয়ার পর গত ১৬ বছরেও আদায় করা যায়নি। শত শত কোটি টাকা মন্দঋণ অনাদায়ী রেখে বেশ কয়েকজন 'রাঘববোয়াল ঋণখেলাপি' মারাও গেছেন; অন্যরা হয়তো বিদেশে ভেগেছেন। তবে, তাদের অধিকাংশই উচ্চ আদালতের মামলাগুলো বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রেখে বহাল তবিয়তে দেশের ব্যবসা ও রাজনীতির ক্ষেত্রে দাবড়ে বেড়াচ্ছেন। তাদের অনেকেই ব্যাংকের মালিক বনে গেছেন, পরিচালক হিসেবে বছরের পর বছর দোর্দণ্ড প্রতাপে ব্যাংকিং খাতকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আমার জানামতে, বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের পিতা/পরিবারের সদস্য এই 'রাঘববোয়াল ঋণখেলাপি'র কাতারে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এফবিসিসিআইর বেশ কয়েকজন সভাপতিও এই 'রাঘববোয়াল ঋণখেলাপি' হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিলেন। এর মানে দাঁড়াচ্ছে, এ দেশের রাজনীতি 'ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি কালচার'কে সযতনে লালন করে চলেছে। অতএব, সংশোধনও শুরু করতে হবে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকেই। এ জন্য জরুরি প্রয়োজন হলো তিন বছরের জন্য একটি খেলাপি ঋণ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করে প্রত্যেক ব্যাংকের শীর্ষ ১০ জন ঋণখেলাপিকে চূড়ান্ত বিচারে দ্রুত শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা। ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার ব্যবস্থা হয় রদ করতে হবে, নয়তো আপিলের ক্ষেত্রে রায়ে উল্লিখিত ঋণের অর্থের কমপক্ষে ৫০ শতাংশ ব্যাংককে ফেরত দিলে আপিলের সুযোগ দেওয়া যাবে মর্মে শর্ত আরোপ করতে হবে।

৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনপরবর্তী নতুন মন্ত্রিসভা দায়িত্ব গ্রহণের পর আমরা কিন্তু খেলাপি ঋণের পরিমাণ লুকানোর প্রয়াস জোরদার করার নানা কসরত দেখলেও এখনও ঋণখেলাপিদের প্রতি 'জিরো টলারেন্স' নীতির কোনো প্রতিফলন দেখলাম না। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি তারিখের দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত আরেকটি খবর অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা, যা ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকার তুলনায় ৫৪৫৯ কোটি টাকা কমে গেছে বলে ধারণা জন্মাতে পারে। কিন্তু এ ধারণা সঠিক অবস্থানের প্রতিফলন নয়। এ খবরেই বলা হয়েছে, 'ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, ডিসেম্বরের চূড়ান্ত হিসাব তৈরির আগে ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের বিভিন্ন নিয়মে ছাড় দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করেছে। এ ছাড়া জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেও অনেকে ঋণ পুনঃতফসিল করেছে।' জাতীয় নির্বাচনের আগে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা বড় ঋণখেলাপিদের পুরনো অভ্যাস, যা প্রধানত নব্বইয়ের দশকের শেষে শুরু হয়েছিল। এর ফলে যদি সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর মেয়াদে খেলাপি ঋণ কমে যায় সেটাকে অস্বাভাবিক বলা যাবে না। তবে, এর মধ্যে খুশি হওয়ার কোনো যুক্তি নেই। এটা সমস্যার প্রধান লক্ষণকেই তুলে ধরছে, যেটাকে বলা হয় 'ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি' সমস্যা। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যেসব রাঘববোয়াল ঋণখেলাপি দীর্ঘদিন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ফেরত দেন না, সেসব জ্ঞানপাপী রাজনীতিক-ব্যবসায়ী এই মহাজনী পন্থাটির অপব্যবহার করে প্রতিবারই নির্বাচনে শামিল হয়ে সংসদের আসনে আসীন হয়ে চলেছেন; এ ব্যাপারে দেশের প্রধান দুই জোটের শীর্ষ নেতৃত্বের কোনো মাথাব্যথা নেই। বলতে গেলে প্রধানত এ কারণেই 'ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি' কালচারটা ক্রমেই ক্যান্সারে রূপান্তরিত হয়েছে এদেশে। আবার এই রাজনীতিক-ব্যবসায়ীরা তাদের খেলাপি ঋণের সিংহভাগ যে দেশের বাইরে পাচার করে দিয়েছেন- সেটাও ক্ষমতাসীন মহলের অজানা নয়। আর, ওই পাচার হওয়া অর্থ যে কস্মিনকালেও ব্যাংকে ফেরত আসবে না- তাও সরকার ও উচ্চপদে সমাসীন ব্যাংকারদের না জানার কোনো কারণ নেই। আসলে এটাকে ব্যাংক ঋণ নিয়ে একটা 'পাতানো খেলা' বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না। সমস্যার প্রকৃত রূপটি সরকার, ব্যাংকার ও ঋণখেলাপি সবারই জানা। সমস্যা সমাধানের উপায় সম্পর্কেও এই তিন পক্ষের সবার স্পষ্ট ধারণা আছে। কিন্তু জেনেশুনেই সরকার সমাধানের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করছে না এই ঋণখেলাপিরা ক্ষমতাসীন মহলের 'আপনজন' হওয়ায়।

বর্তমান অর্থমন্ত্রী নিজেই দেশের একজন নেতৃস্থানীয় ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। অতএব, রাঘববোয়াল ঋণখেলাপিদের হাঁড়ির খবর তার নখদর্পণে থাকার কথা। কিন্তু তার গত দু'মাসের এতদ্‌সম্পর্কিত কথাবার্তা ও কার্যকলাপের ফলে অনেকের ধারণা জন্মাতে পারে- তিনি তার 'চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান' ব্যবহার করে খেলাপি ঋণ সমস্যাকে কার্পেটের তলায় লুকিয়ে ফেলতেই বেশি আগ্রহী। ঋণ আদায়ের জন্য তার একাগ্রতার অভাব দৃশ্যমান হয়ে যাচ্ছে দৃষ্টিকটুভাবে। সন্দেহটা ভুল হলে আমি খুবই খুশি হবো। কিন্তু লুকানোর অভিযোগটি কেন উত্থাপন করছি, সেটাই ব্যাখ্যা করছি।

নতুন মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণের মাত্র কয়েক দিন অতিবাহিত হওয়ার পরই হঠাৎ অর্থমন্ত্রী চ্যালেঞ্জ দিয়ে বসলেন- ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণ আর এক টাকাও বাড়বে না। এর কয়েক দিনের মধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংক মন্দঋণ 'রাইট অফ' বা অবলোপন করার নিয়ম-নীতি অনেকখানি শিথিল করে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করল :আগের নিয়মে যেখানে পাঁচ বছরের খেলাপি মন্দঋণ 'রাইট অফ' করার যোগ্য বিবেচিত হতো, সে ক্ষেত্রে নতুন নিয়মে দুই বা তিন বছরের মন্দঋণও কোনো ব্যাংক চাইলে 'রাইট-অফ' করায় কোনো বাধা থাকবে না। পাঠকদের অবগতির জন্য জানাচ্ছি, মন্দঋণ 'রাইট-অফ' বা অবলোপন করার মানে হলো, ওই অবলোপনকৃত মন্দঋণের হিসাবটা ব্যাংকের মূল ব্যালান্স শিট থেকে অপসারণ করে আরেকটি লেজারে হিসাবটা সংরক্ষণ করা। 'রাইট-অফ' করার মূল দুটো শর্ত হলো :১. ওই ঋণ সুদাসলে আদায়ের জন্য ব্যাংক মামলা দায়ের করবে, ২. যে পরিমাণ ঋণ 'রাইট-অফ' করা হয় তার সমপরিমাণ অর্থ 'প্রভিশনিং' বা 'সঞ্চিতি' করতেই হবে। প্রভিশনিং মানে হলো, ওই পরিমাণ অর্থ ব্যাংক কর্তৃক অন্য কাউকে ঋণ দেওয়া যাবে না। রাইট-অফ করার ফলে ব্যাংকের শ্রেণীকরণকৃত (ক্লাসিফায়েড) নন-পারফর্মিং লোনের (খেলাপি ঋণের) পরিমাণ ঠিক অতটুকু কম দেখানো যাবে। অতএব, এই নতুন নিয়ম চালু হওয়ার পর ক্লাসিফায়েড লোনের যে ক্রমবর্ধমান (cumulative) পরিমাণ বাংলাদেশ ব্যাংক তিন মাস পরপর প্রকাশ করে, সে পরিমাণটা কমানোর হাতিয়ার ব্যাংকগুলোর হাতে তুলে দেওয়া হলো। আর একটা সুবিধা, মামলা করার বাধ্যবাধকতার কারণে আগে যে সর্বনিম্ন সীমা (ফ্লোর) ছিল, ওটাকে অনেকখানি বাড়িয়ে দেওয়া হলো। এই নতুন নিয়মগুলোর আসল মরতবা হলো, অর্থমন্ত্রীর ছুড়ে দেওয়া চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন করার বেশ কয়েকটি অস্ত্র ব্যাংকগুলোকে প্রদান করা হলো। কিন্তু এর ফলে কি 'রাইট-অফ' করা মন্দঋণ আদায় করার ব্যবস্থাটা শক্তিশালী হলো? বলা হচ্ছে, ২০০২ সালে পাঁচ বছরের বেশি সময়ের অনাদায়ী মন্দঋণের 'রাইট-অফ' ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৪৯ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা মন্দঋণ 'রাইট-অফ' করা হয়েছে এবং ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ওই 'রাইট-অফ' করা মন্দঋণের ১১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। যে ১১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা 'রাইট-অফ' করা মন্দঋণ আদায় হয়েছে, ওগুলো 'সুদাসলে আদায়কৃত মন্দঋণ'। অতএব, ওই অঙ্কটিকে ৪৯ হাজার ৭৪৫ দিয়ে ভাগ করে যদি কেউ খুশি হয়ে যান যে প্রায় ২৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ 'রাইট-অফ' করা মন্দঋণ আদায় করে ব্যাংকগুলো বেশ সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে, তাহলে তারা মারাত্মক ভুল করবেন। আসলে, এই দুটো অঙ্ক মোটেও অনুপাত নির্ধারণের জন্য উপযোগী নয়।

গত ১৬ বছর ধরে মোট ৪৯ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা মন্দঋণ হিসেবে ক্রমাগতভাবে 'রাইট-অফ' করার পর ওই মন্দঋণের ওপর নিয়মিতভাবে চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ ধার্য হয়ে চলেছে। কিন্তু যখন 'রাইট-অফ' করা মন্দঋণের পরিমাণ বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রকাশ করা হয়, তখন যে সুদ ধার্য হচ্ছে তার পরিমাণ যোগ করে 'রাইট-অফ' করা মন্দঋণ ৪৯ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা সর্বশেষ হিসাব প্রকাশের সময় সুদাসলে কত দাঁড়িয়েছে, তা বাংলাদেশ ব্যাংক জনগণকে জানাচ্ছে না। ২৭ ফেব্রুয়ারির প্রথম আলোর সংবাদটির প্রতিবেদক আদায়কৃত ১১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা ৪৯ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা থেকে বিয়োগ করে অবলোপনকৃত ঋণের স্থিতি ৩৭ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা হয়েছে বলে যে হিসাব দিয়েছেন, সেটাও ভুল তথ্য। প্রতিবেদকের এই ভুলের ফলে ১ লাখ ৩১ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা মোট খেলাপি ঋণের হিসাবটাও ভুল হয়ে গেছে। আসল খেলাপি ঋণের পরিমাণ অনেক গুণ।

আমার মূল বক্তব্য হলো, খেলাপি ঋণের সমস্যাকে নানা কসরত করে গৌণ করে দেখানো কিংবা ওটাকে কার্পেটের তলায় লুকানোর জন্য নিয়ম-নীতি শিথিল করা আমার দৃষ্টিতে চরম অনৈতিক। এখন সময়ের দাবি হলো, খেলাপি ঋণ আদায়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সত্যিকার সদিচ্ছা এবং ঋণখেলাপিদের প্রতি তার 'জিরো টলারেন্স'। ব্যাংকিং কমিশনের পরিবর্তে কমিটি গঠন সদিচ্ছার পরিচায়ক নয়।

একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য যোগ করুণ

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ