সময়ের প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জ

সমকালীন প্রসঙ্গ

প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

সময়ের প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জ

  ড. এস এম ইমামুল হক

টানা তৃতীয়বার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এলো স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। এ নিয়ে চতুর্থবার ও পরপর তিনবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি বিরল দৃষ্টান্ত। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর '৭৫-পরবর্তী দিনগুলোতে কঠিন সময় পার করেছি আমরা। একাত্তরে যারা বাংলাদেশ নামক স্বাধীন ভূখণ্ড চায়নি, এ সময়টাতে তাদের হাতে ছিল জাতীয় পতাকা!

পৃথিবীর এমন কোনো দেশ আছে, যেখানে স্বাধীনতাবিরোধীরা দেশের আইন প্রণয়ন করে? এই নির্বাচনের আগেও তারা বারবার বলেছে, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড মানে কি তাদের ক্ষমতায় বসিয়ে দেওয়া? ওরা আরও বলে, দেশে গণতন্ত্র নেই। গণতন্ত্র না থাকলে তারা কীভাবে এই কথাগুলো বলার সুযোগ পায়? এরপরও যারা বলে গণতন্ত্র নেই, তারা মূর্খের দেশে বাস করে।

নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে। অথচ ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে নিয়ে, যে দলটির নিবন্ধনও বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন। তারা এমন কথাও বলেছে, ক্ষমতায় গেলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করে দেবে, সাঈদীকে ছাড়িয়ে আনবে। স্বাধীন বাংলাদেশে এটা কী করে সম্ভব? আমরা কেন জামায়াতকে প্রশ্রয় দেব? আমি কোনো অনুষ্ঠানে জামায়াতের কেউ অতিথি থাকলে সেই মঞ্চে কখনও উঠিনি। বিএনপি আমলে কৃষিমন্ত্রী ছিলেন মতিউর রহমান নিজামী। তিনি প্রধান অতিথি থাকায় অনুষ্ঠান বর্জন করেছি। এভাবে সর্বক্ষেত্রে স্বাধীনতাবিরোধীদের বয়কট করতে হবে। যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারেনি, আমি তাদের উদ্দেশে বলতে চাই- পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধ করার সময় এসেছে। সময় এসেছে স্বাধীনতাবিরোধীদের চিরতরে এ দেশ থেকে বিলুপ্ত করার এবং তারা তা করে দেখিয়েছে। শাবাশ!

গত ১০ বছর আমরা যে অবস্থানে এসেছি, তা কল্পনাতীত। ২০১৮ সালে ঘোষণা এসেছে বাংলাদেশ ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবে। ২০৪১ সালে উন্নীত হবে উন্নয়নশীল দেশে। নবগঠিত মন্ত্রিসভায় তরুণদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, এটি একটি বিশেষ দিক। আমি অত্যন্ত আশাবাদী। সিনিয়র নেতাদের নির্দেশনা মেনে তারুণ্যনির্ভর মন্ত্রিসভা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, এটা আমার দৃঢ়বিশ্বাস।

আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া দল। তাই এই সরকারের প্রতি প্রত্যাশা অনেক। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত দুর্নীতি বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়া। শুধু তাই নয়, নীতিবিরোধী কাজও বন্ধ করতে হবে। অনৈতিক কোনো কাজকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। প্রধানমন্ত্রীর সততা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ নেই। কিন্তু তিনি যাদের নিয়ে দেশ চালাবেন, তার মন্ত্রিপরিষদকেও ততটাই সৎ থাকতে হবে। পাশাপাশি সচিবালয় দুর্নীতিমুক্ত রাখতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়তে আইনের প্রয়োগ আরও বাড়াতে হবে। 'অর্থ সংঘাত প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনা' নামে একটা আইন করা হচ্ছে। এটি খুব ভালো উদ্যোগ। কিছু দুষ্টলোক আছে, তাদের আইনের আওতায় আনতে পারলে দেশ আরও উন্নত হবে। আর্থিক অব্যবস্থাপনা, বিশেষ করে ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে আরও সচেতন হতে হবে। সেবা খাতগুলোতে দুর্নীতি কমেছে। আরও কমাতে হবে। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়ে দুর্নীতিকে জিরো টলারেন্সে নিয়ে আসবেন। সে জন্য সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, সবাইকে সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে।

নারীর ক্ষমতায়নে সরকার অনেক যুগোপযোগী পদক্ষেপ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে আরও জোর দিতে হবে। সেবা খাতগুলো ডিজিটালাইজেশনের আওতায় এসেছে। বাকি খাতগুলোও আনতে হবে। ডিজিটালাইজেশনের কারণে কেবল সেবা পাওয়া সহজ হয়নি, দুর্নীতিও অনেক হ্রাস পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী গত মেয়াদেই মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। সব চাকরির ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা হবে, এটা অনেক কার্যকরী ও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। এতে সফলতা আসবে। আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়েও এটি চালু করব। ইতিমধ্যে আমরা ধূমপায়ীদের চাকরিতে আবেদনে অনুৎসাহিত করে আসছি।

শিক্ষাক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তনের জন্য প্রাইমারি থেকে টারশিয়ারি লেভেল পর্যন্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। কোমলমতি শিশুদের নীতি-নৈতিকতা ও শুদ্ধাচার শেখাতে হবে। স্কুলে বাচ্চাদের যা শেখানো হয়, তা তারা সারাজীবন মনে রাখে। কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। শিক্ষার কাণ্ডারি হিসেবে আমরা একজন শিক্ষাবান্ধব ও শিক্ষানুরাগী শিক্ষামন্ত্রীকে পেয়েছি। আমার দৃঢ়বিশ্বাস, তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও কার্যকরী পদক্ষেপে শিক্ষা খাতে গুণগত পরিবর্তন আসবে।

বাস্তবায়নাধীন মেগা প্রকল্প দ্রুত কাজ শেষ করতে হবে। দেশে পদ্মা সেতুর মতো বড় বড় প্রকল্প হচ্ছে। মেট্রোরেল হচ্ছে। এখন পর্যন্ত শুনিনি, এসব কাজে দুর্নীতি হচ্ছে। আমি বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করছি। আশা ছিল, পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হলে এই সেতু দিয়ে সড়কপথে ঢাকায় আসব। আমার টার্মে মনে হয়, কাজ শেষ হবে না। তারপরও দ্রুত কাজ শেষ হোক, এটাই আমার প্রত্যাশা। মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজও দ্রুত শেষ করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন অঞ্চলে অর্থনৈতিক জোন তৈরি করছেন। পায়রা সমুদ্রবন্দর হচ্ছে। নতুন নতুন পাওয়ার প্ল্যান্ট করছেন। এতে দেশের অনেক উন্নতি হবে। অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে। কৃষিবান্ধব শিল্প কারখানা তৈরি করতে হবে। আমাদের মাটিকে রক্ষা করতে আরও কঠোর ভূমি নিয়ন্ত্রণ আইন করতে হবে। ইটভাটা মাটি ও পরিবেশের অনেক ক্ষতি করে। ইটভাটা নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। রি-ইনফোর্সড কংক্রিট দিয়ে আমরা কনস্ট্রাকশন ম্যাটেরিয়াল বানাতে পারি। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের একটি সিদ্ধান্তও আছে, সরকারি অবকাঠামো এটি দিয়ে করা হবে। জমির মালিক হলেই কেউ এর যথেচ্ছ ব্যবহার করতে পারে না। এটি দেশের সম্পদ।

জিও-পলিটিক্যাল কারণে আমরা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছি। রোহিঙ্গারা আমাদের পরিবেশ নষ্ট করছে, স্থানীয় মানুষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাদের জন্য একটা দ্বীপ দেখা হয়েছিল। কিন্তু নেওয়া গেল না। এনজিওগুলো এ বিষয়ে ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর থেকে বড় পরিবেশবিদ আর কেউ নেই। তিনি সবকিছু বুঝে-শুনেই সিদ্ধান্ত নেন। মিয়ানমার যাতে তাদের ফিরিয়ে নেয়, সে জন্য চাপ সৃষ্টি করতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

ঢাকাকে আরও বাসযোগ্য করার জন্য চাই প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ। প্রয়োজনীয় সব সেবা খাতকে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। স্বাস্থ্য খাত, শিক্ষা খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো জেলা-উপজেলায় স্থানান্তর করতে হবে। শিক্ষার জন্য ছেলেমেয়েকে ঢাকায় আসার বিষয়ে উৎসাহ জোগানো যাবে না। প্রতি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয়, উপজেলাগুলোতে আরও সরকারি স্কুল-কলেজ স্থাপন করতে হবে। প্রয়োজনে আইন করে জেলা-উপজেলায় থাকা বাধ্যতামূলক করতে হবে। তাহলে ঢাকার ওপর চাপ কমবে। সেই সঙ্গে ঢাকা শহর থেকে ২০০ বছরের পুরনো বাহন রিকশা তুলে দিতে হবে। এতে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে গ্রামে দিনমজুর পাওয়া যায় না। সব স্কুলে স্কুলবাস চালু করতে হবে। এতে প্রাইভেটকারের ব্যবহার কমবে, যানজটও অনেক হ্রাস পাবে।

একাত্তরের দিনগুলোতে মুক্তিকামী মানুষের শক্তি জোগাত 'জয় বাংলা' স্লোগান। তাই এটি আমাদের মুক্তির স্লোগান। আমার প্রস্তাব, এই স্লোগান জাতীয় স্লোগান হিসেবে সংসদে পাস করা হোক। সেই সঙ্গে সব প্রতিষ্ঠানে 'জয় বাংলা' স্লোগানটি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হোক। আর একটি বিষয়, বাংলাদেশ একটি জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র। এখানে যারা বাংলায় কথা বলে তাদেরকে সংখ্যালঘু বলা যাবে না। এর জন্য একটা আইন হওয়া দরকার। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান- ধর্মের ভিত্তিতে কেউই সংখ্যালঘু নয়। সবাই বাংলায় কথা বলে, এদেরকে সংখ্যালঘু বলা যাবে না। বাংলা ভাষায় কথা না বলা গোষ্ঠীকেই কেবল সংখ্যালঘু হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। আমার লেখাটি যদি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর হয়, অনুরোধ থাকবে, তিনি যেন এই বিষয়টি ভেবে দেখেন।

২০২০ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করা হবে। এটা অনেক আনন্দের। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থেকে এটা পালন করবেন। এটি জনগণের রায়ের কারণেই সম্ভব হচ্ছে। তাই বাংলার জনগণকে আমি ধন্যবাদ জানাই। তারা কখনও ভুল করেনি, সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখন তারই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাঁধে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে যাবে- এটাই প্রত্যাশা।
imamhuq@hotmail.com

শিক্ষাবিদ ও উপাচার্য

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য যোগ করুণ

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ