ছাত্র সংসদ নির্বাচন

প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

  আনোয়ার হোসেন

হঠাৎ করেই আমাদের যেন সংবিৎ ফিরে এলো- বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি উঠেছে। কেন এতদিন এটা মনে এলো না- সে প্রশ্ন সঙ্গত। তবে বেটার লেট দ্যান নেভার!

আমরা উচ্চতর শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকাতে পারি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি অংশ সরকারের নিয়ন্ত্রণে, যা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিত। অন্যগুলো প্রাইভেট। কলেজের একটি অংশ সরকারের নিয়ন্ত্রণে, বাকিগুলো বেসরকারি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য পদ এখন সরকার সমর্থকদের জন্য সংরক্ষিত। সরকারি কলেজের প্রিন্সিপাল পদ পেতে তদবির হয়। যে এলাকায় কলেজ, সে এলাকার সংসদ সদস্যের সুপারিশের প্রয়োজন পড়ে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, স্থানীয় সংসদ সদস্য মনে করেন, তার 'এলাকার' প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিদ্যালয়-মহাবিদ্যালয়-বিশ্ববিদ্যালয় (যদি থাকে) সব চলবে তার কথায়। একবার উত্তরাঞ্চলের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুসংখ্যক পিয়ন-দারোয়ান পদে নিয়োগের ঘোষণা আসে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিয়োগের জন্য কমিটি গঠন করে। সাক্ষাৎকার নেওয়ার ব্যবস্থা হয়। কিন্তু বেঁকে বসেন স্থানীয় সংসদ সদস্য। তার সোজা কথা- আমার এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ হবে আর আমি জানব না- এটা হতেই পারে না। তিনি তার পছন্দের প্রার্থী তালিকা তুলে দেন উপাচার্যের হাতে। উপাচার্য তাতে আপত্তি করলে নিয়োগের আয়োজনই ভণ্ডুল করে দেওয়া হয় দলের ছাত্র সংগঠনের কর্মীদের দিয়ে। এমন ঘটনা বাংলাদেশের নানা প্রান্তে গত প্রায় তিন দশক ধরে ঘটছে। কারও কি তা নজরে পড়েনি? এ ধরনের ঘটনা যারা ঘটায়, তারা ছাত্র সংসদ নির্বাচনের জন্য আদৌ উৎসাহী নয়। আর যদি ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়ও, তাহলেও সংসদ সদস্য কিংবা ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতারা চাইবেন, তাদের পছন্দের নেতারা যেন নির্বাচিত হয়ে আসতে পারে। যদি তাতে সংশয় থাকে, নির্বাচন না হওয়াই ভালো। এ ক্ষেত্রে আরেকটি সমস্যা আছে। ছাত্র সংসদে নির্বাচিত হওয়ার কথা নিয়মিত ছাত্রদের মধ্য থেকে। যারা ছাত্রদের মধ্য থেকে ভবিষ্যৎ জাতীয় নেতৃত্ব বের হয়ে আসার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, তারা এটাই চান। অন্যদিকে যারা নিয়মিত ছাত্র না, নানা কৌশলে ছাত্রত্ব টিকিয়ে রাখতে চাইছেন, তাদের জন্য নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ রাখার যুক্তি নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন হচ্ছে বলেই মনে হয়। এখানেও নিয়মিত ছাত্রছাত্রীদের মধ্য থেকে ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার কথা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, প্রায় সব ছাত্র সংগঠনের মধ্য থেকে দাবি এসেছে, যারা বারবার ড্রপ দিচ্ছে কিংবা কোনো কৌশলে ছাত্রত্ব টিকিয়ে রাখছে, তাদেরও প্রার্থী হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। যুক্তি স্পষ্ট- অনেক দিন নির্বাচন হয় না। তাই সুযোগ দেওয়া হোক 'সাবেকদের'। আরেকটি যুক্তি- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে নির্বাচিতরা জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ কারণে একটু বেশি বয়স হলে ক্ষতি নেই। বরং তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশ ও দশের উপকার হবে। কিন্তু যে সুবিধা কেবল নিয়মিত ছাত্রছাত্রীদের থাকা উচিত, সেটা কেন অছাত্রদের দেওয়া হবে? অতীতে নিয়মিত ছাত্রছাত্রীরাই বড় বড় আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে। এখন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। যারা নিয়মিত ছাত্র নয়, তাদের নেতৃত্বের যোগ্যতা থাকলে সমাজের বহু ক্ষেত্র রয়েছে, যেখানে তারা ভূমিকা রাখতে পারে। নেতৃত্ব বিকাশের জন্য কেবল ছাত্র সংসদেই নির্বাচিত হতে হবে কেন? বিশেষভাবে এটাও মনে রাখা দরকার যে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের প্রতিষ্ঠানকে 'রাজনীতিমুক্ত' ঘোষণা দিয়েছে সগৌরবে। আমরা কেন ওই সব প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের কথা ভাবি না?


মন্তব্য

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ