আমাদের ভাষাপ্রীতি ও বাস্তবতা

ভাষার মাস

প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

আমাদের ভাষাপ্রীতি ও বাস্তবতা

  ফাতিহুল কাদির সম্রাট

আমরা মাতৃভাষাপ্রিয় জাতি হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি। ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে একুশের চেতনা নামে গ্রহণ করে আমরা আমাদের ভাষা-ভালোবাসার একটি আবেগময় রূপকল্প তৈরি করে নিয়েছি। একুশের চেতনার ধারকরূপে আমরা গর্বিত, পরিণত ও জাতি হিসেবে পরিশ্রুত। জাতীয় ঐক্যের ভাষিক সূত্রটিও এই চেতনাশাসিত। একুশের চেতনাই হচ্ছে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণাসূত্র, সাহসের অফুরান উৎস। ভাষা আন্দোলন সংঘটিত না হলে বাঙালি জাতি আত্মদানের পথে হাঁটতে শিখত কি-না সন্দেহ। আত্মদানের অনুপ্রেরণায় স্বাধীনতা লাভের মহত্তম প্রত্যাশা জাতির মনে জেগে উঠত কি-না তাও নিশ্চিত করে বলা যায় না। তাই বলা যায়, আমাদের ভাষাপ্রেম জাতিসত্তার মূল সংলগ্ন এক মহান অভিব্যক্তি। ভাষাপ্রীতির প্রমাণ দিতে গিয়ে আমরা সাড়ম্বর আনুষ্ঠানিকতায় মেতে উঠি। মহান একুশে ও মাতৃভাষাকে ঘিরে আমাদের উৎসাহ-উদ্দীপনা, আয়োজন ও আনুষ্ঠানিকতার বহর দেখে বোঝার উপায় থাকে না যে, আমাদের বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসার কোনো কমতি আছে, একুশের চেতনায় কোনো খাদ আছে, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে আত্মদানকারীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে কোনো কৃত্রিমতা আছে।

তবে বাস্তবতা পুরোপুরি ভিন্ন। চেতনা চেতনা করে অচেতন হওয়া, সাড়ম্বরে বইমেলায় যাওয়া কিংবা শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্যের মধ্য দিয়ে কি আমাদের মাতৃভাষাপ্রীতির যথার্থতা ও অকৃত্রিমতা প্রমাণিত হচ্ছে? আমরা কি সত্যিকার অর্থে আমাদের ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাবনত? বাস্তবতার আলোকে আমরা বলতে পারি না। আমাদের মাতৃভাষাপ্রীতি অনেকখানি অন্তঃসারশূন্য আনুষ্ঠানিকতা মাত্র এবং একুশের চেতনা আমাদের কেবল মুখের বুলি, অন্তরের সত্য নয়। আসলে একুশের চেতনা কিংবা ভাষা আন্দোলনের মহান শহীদদের চেতনার স্বরূপ সম্পর্কেই আমাদের ধারণা অস্পষ্ট কিংবা বিভ্রান্তিকর। আমরা ভাষা আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও আদর্শ সম্পর্কে আমাদের ধারণা স্পষ্ট করতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছি। ফলে আমাদের শ্রদ্ধা নিবেদন কেবলই আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। কীভাবে মাতৃভাষাপ্রীতির যথার্থ প্রমাণ দেওয়া যায়, সে ব্যাপারে ধারণাগত একটা বিভ্রান্তি সক্রিয়। চেতনাকে অন্তরে ধারণ করার সঙ্গে সঙ্গে কার্যক্ষেত্রে রূপায়িত করতে হয়, তেমনি ভালোবাসার বিষয়টিও সক্রিয় কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হয়। অন্যথায় বাংলা ভাষাকে ভালোবাসার কথা বলে বলে মুখে ফেনা তুললেও তা কোনো তাৎপর্য বহন করে না। ব্যবহারিক ক্ষেত্রে সার্বজনীনভাবে মাতৃভাষার কার্যকর ও পরিশুদ্ধ ব্যবহার নিশ্চিত করা কিংবা করার চেষ্টা ছাড়া ভাষাশহীদদের প্রতি সম্মান দেখানোর অন্য কোনো উপায় নেই। আমরা যদি আমাদের মাতৃভাষা বাংলার সর্বস্তরে ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারি, যদি সবাই শুদ্ধরূপে এ ভাষা ব্যবহারে সক্ষম হতে পারি, তবেই প্রমাণিত হবে আমাদের ভাষাপ্রীতির যৌক্তিকতা। বাংলা ভাষার যথেচ্ছ ব্যবহার করে, ভাষিক অনাচার মেনে নিয়ে, বিদেশি ভাষার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে নিজ ভাষাকে উপেক্ষা করে আর যাই হোক, মাতৃভাষাপ্রেমী হওয়া যায় না।

বাংলা ভাষার সার্বজনীন ও প্রমিত ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের অনীহা রীতিমতো অমার্জনীয়। ভাষার মৌলিক ব্যবহারিক ক্ষেত্রে বলা ও লেখায় যথেচ্ছাচার অনাচারের পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই ভাষা-অনাচার দেখে আমাদের ভাষাশহীদদের আত্মা নিঃসন্দেহে শান্তি পাচ্ছে না। মাতৃভাষার অপপ্রয়োগ ও অনাচারে তাদের আত্মদানকে অবমাননা করে চলেছি অবলীলায়। বাংলা ভাষায় শুদ্ধ প্রয়োগে আমাদের মাঝে যারপরনাই উদাসীনতা লক্ষ্য করা যায়। শিক্ষিত ও তথাকথিত সুসভ্য মানুষের মাঝে এই উদাসীনতা সবচেয়ে বেশি। বাচনিক ব্যবহারে অশুদ্ধ উচ্চারণ, লৈখিক প্রক্রিয়ায় ভুল বানান, শব্দের অপপ্রয়োগ ও অসঙ্গতিপূর্ণ বাক্য গঠন অনেক ক্ষেত্রে পীড়াদায়ক হলেও আমাদের মাঝে এ নিয়ে নূ্যনতম দ্বিধা কিংবা অস্বস্তিবোধ কাজ করে না। আমাদের উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিগত হেঁয়ালির সুরে বলে থাকেন, 'ওফ! বাংলা ভাষা, বেজায় কঠিন। বাংলা বানান বড়ই গোলমেলে।' তারা প্রায়ই অভিযোগ করেন যে, বাংলা বানানের গতিপ্রকৃতি বুঝে ওঠা মুশকিল। আমরা বুঝতে চাই না যে, মাতৃভাষাপ্রীতির মধ্য দিয়েই ব্যক্তি, সমাজ ও জাতির সামগ্রিক সুরুচি ও শুদ্ধ চেতনায় পরিচয় ফুটে ওঠে। ভাষার প্রতি দরদ থাকাটা দেশপ্রেমেরই অঙ্গ। স্বদেশ চেতনায় ঋদ্ধ হতে গেলে মাতৃভাষাপ্রীতির সোপান বেয়েই এগোতে হয়। আমাদের অনেকের ঘরে অনেক বই আছে। বইয়ের সমাহারে অনুপস্থিত শুধু বাংলা অভিধান। ভাষাশহীদদের আত্মদানকে আমরা কী নির্বিচারে আবমাননা করে চলেছি। অথচ ইংরেজি ভাষায় কোনো কিছু লিখতে গেলে বানান ও বাক্যের শুদ্ধতা সম্পর্কে আমাদের সচেতনতার শেষ নেই। অভিধান ঘেঁটে আমরা শুদ্ধতা নিশ্চিত করতে কতই না যত্নশীল। এ ক্ষেত্রে আমাদের মাঝে এতটুকু আলস্য নেই। প্রয়োজনে ইন্টারনেটে ঢুকে ই-ডিকশনারি ঘাঁটতেও আমরা ক্লান্তবোধ করি না।

ভাষা নদীর মতো বহমান। বয়ে চলায় বাঁকে বাঁকে এটি রূপ পাল্টায়। যুগান্তরের হাত ধরে রূপান্তর ঘটে ভাষার। এ বিচিত্র পরিবর্তন ব্যাকরণ-অভিধান ধারণ করে। তাই ভাষা ও ব্যাকরণের নিয়মবিধির সর্বশেষ রূপ-প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা না রাখলে চলে না। ভাষার বিবর্তনের ধারায় রূপান্তরের প্রক্রিয়াটি বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে অনেক বেশি সক্রিয়। কারণ এটি পৃথিবীর নবীন ভাষাগুলোর অন্যতম। নবীন বলে এর বাড় দ্রুত, আর বাড় দ্রুত বলেই এর পরিবর্তনশীলতা অবশ্যম্ভাবী। বিশ্বায়নের এই যুগে সাংস্কৃতিক মিশ্রণ এবং যোগাযোগ-ঘনিষ্ঠতার কারণে বাংলা ভাষার গতিশীলতা বেড়েছে। বাংলা ভাষা আত্মস্থ করছে অপরাপর ভাষার শব্দ ও প্রভাব। এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা একাডেমিসহ অন্যান্য ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে বাংলা ভাষার বানান নির্ধারণ, পরিভাষা নির্মাণ, শব্দার্থ অর্থাৎ ভাষা সংস্কারের কাজ চলছে। এ কারণেই বাংলা ভাষার অনেক বানান ও নিয়মকে সম্পূর্ণ নতুন আর পরিবর্তনশীল মনে হয়। এই পরিবর্তনের খোঁজ না রাখার কারণেই অনেকে দোষ চাপান ভাষার ওপর, ভাষাসংশ্নিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর। বলা হয়, আজকাল আমরা বড়ই যুগসচেতন। সবকিছুর হালনাগাদকৃত বা আপডেটেড না হলে আমরা নিজেদের যুগ-অচল ভাবি। পোশাক-আশাকের হালফ্যাশন, প্রযুক্তির সর্বশেষ উদ্ভাবন, হালের চালচলন সবকিছুর খোঁজ রাখি, কেবল খোঁজ রাখি না মাতৃভাষার সর্বশেষ রূপ-প্রকৃতির।

বাংলা ভাষা বিকৃত ও ভুল ব্যবহারের ক্ষেত্রে এক দল আছে অতি মাত্রায় রক্ষণশীল, বলা যায় প্রাচীনপন্থি গোঁড়া; আর এক দল আছে যারা নিজেদের অতি আধুনিক জাহির করতে তৎপর। তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লবক্ষণে গণমাধ্যম বা মিডিয়ার প্রভাব সর্বব্যাপী। মিডিয়ার কাজ শুধু তথ্য পরিবেশন নয়, জাতির মনন ও স্বদেশ চেতনা পরিশুদ্ধ করা। বাংলা ভাষার সম্মান বৃদ্ধি ও সার্বজনীন ভাষিক মানোন্নয়নে মিডিয়ার দায়িত্ব অপরিসীম। কিন্তু কোনো কোনো প্রিন্ট মিডিয়া এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বাংলা ভাষার নিদারুণ অপপ্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। সাম্প্রতিককালে মিডিয়ায় এসেছে বিস্ময়কর বিস্তৃতি ও রূপগত বৈচিত্র্য। একসময় গণমাধ্যম বলতে ছিল হাতেগোনা কয়েকটি সংবাদপত্র। এখন সংবাদপত্র, টেলিভিশন চ্যানেল, রেডিও, প্রিন্ট মিডিয়ার অনলাইন সংস্করণ, অনলাইন সংবাদপত্র ও বার্তা সংস্থা রয়েছে। গণমাধ্যমের মধ্যে সবচেয়ে পুরনো ও প্রভাবশালী হচ্ছে সংবাদপত্র। সংবাদপত্রের জন্য কোনো অভিন্ন ভাষানীতি, বানানরীতি ও পরিভাষা কোষ তৈরি হয়নি। বর্তমানে জনপ্রিয়তা পাওয়া এফএম রেডিওতে রেডিও জকিরা (আরজে) বাংলা ভাষার সঙ্গে অন্য ভাষা মেশান, না অন্য ভাষার মাঝে বাংলা ভাষা প্রবিষ্ট করান, তা বোঝা মুশকিল। তারা প্রমিত বাংলাকে সামনে নিয়ে আসছেন কোনো কোনো নাটক রচয়িতায়। ঘরোয়া ভাষাকে ঢালাওভাবে নাটকে ব্যবহারের ব্যাপারে সচেতন মহল বেশ উদ্বিগ্ন। হিন্দি কার্টুনের প্রভাবে আমাদের ছোট ছেলেমেয়েদের মাতৃভাষার চেয়ে যখন হিন্দির ওপর দক্ষতা বেশি লক্ষ্য করা যায়, তখন বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে বৈকি!

সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ

লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজ


মন্তব্য

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ