৩৬৫ ও পরবর্তী দিনগুলো

রাজনীতি

প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

  শেখ রোকন

তার আইনজীবীরা বলেছিলেন, মাত্র 'দুই দিনের' ব্যাপার। এখনও স্পষ্ট মনে আছে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ৮ তারিখ ছিল বৃহস্পতিবার। ওই দিন পুরান ঢাকার বকশীবাজারে স্থাপিত বিশেষ আদালতে খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায়। পরের দুই দিন সাপ্তাহিক ছুটি; তাই নিয়মিত আদালত বন্ধ। আইনজীবীদের দৃশ্যত দৃঢ়বিশ্বাস ছিল, রোববার সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসেই উচ্চ আদালতে গিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের জামিন মিলবে। কিন্তু রায়ের সার্টিফায়েড কপি পেতে দেরি হওয়ায় রোববার তো বটেই, পুরো সপ্তাহ চলে যাচ্ছিল। খালেদা জিয়ার জামিনের সম্ভাবনা নিয়ে বুধবার সংবাদপত্রে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। তবে শিরোনামে প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে- 'খালেদার আপিল রোববার?' অর্থাৎ আরেকটি শুক্র ও শনিবার কেটে গিয়ে পরবর্তী কর্মদিবসে।

বিবাদীপক্ষের আইনজীবীদের একজন বলেন- 'তাঁর সামাজিক অবস্থা, একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী তিনি। এ ছাড়া একজন নারী, তাঁর বয়স ও স্বাস্থ্যগত বিষয়টি জামিন পাওয়ার ক্ষেত্রে আদালতের বিবেচনার বিষয় হবে। ফলে এই মামলায় জামিন পাওয়া নিয়ে তাঁরা চিন্তিত নন' (প্রথম আলো, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮)।

পরের রোববারও দ্বিতীয় সপ্তাহের মতো কারাগারে কাটে খালেদা জিয়ার। কিন্তু তার আইনজীবীরা যে তখনও 'চিন্তিত' ছিলেন না, তার প্রমাণ মেলে ২৩ ফেব্রুয়ারি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঝানু আইনজীবী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের কথায়। ওই দিন ছিল শুক্রবার। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে 'খালেদা জিয়া মুক্তি পরিষদ' আয়োজিত এক সমাবেশে তিনি জোর দিয়ে বলেন- 'রোববারই খালেদা জিয়ার জামিন মঞ্জুর হবে' (যুগান্তর অনলাইন সংস্করণ, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮)।

বলা বাহুল্য, তারপর আরও অর্ধশতাধিক রোববার কেটে গেছে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জামিন পাননি। আইনজীবীরা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা নিয়ে উচ্চ আদালতে আপিল প্রক্রিয়ার দিকে আশা নিয়ে তাকিয়ে ছিলেন। গত ৩০ অক্টোবর আপিলের রায়ে তার সাজা পাঁচ বছর থেকে বেড়ে বরং দশ বছর হয়েছে। আগের দিনই জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় তাকে আরও সাত বছর সাজা দেওয়া হয়েছিল।

অনেকে মনে করেছিলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে একটি 'সমঝোতা' হতে পারে। বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিনিময়ে আইনগত প্রক্রিয়াতেই খালেদা জিয়া জামিন বা প্যারোলে মুক্তি পেতে পারেন। বিএনপি নেতাদেরও অনেকে এ আশায় বুক বেঁধেছিলেন। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে আগে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, বিএনপি চাইলে খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তি নিয়ে আলোচনা হতে পারে (সমকাল, ৪ নভেম্বর, ২০১৮)। কিন্তু একদিন পরেই বিএনপির এক জনসভায় দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন- প্যারোলে নয়, খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে (এনটিভি অনলাইন, ৬ নভেম্বর, ২০১৮)।

শেষ পর্যন্ত বিএনপি নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। খালেদা জিয়াকে কারান্তরীণ রেখেই। তিনটি আসনে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মনোনয়ন ফরম তোলা হয়। জেল থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া এবং বিজয়ী হওয়ার নজির বাংলাদেশে কম নেই। কিন্তু খালেদা জিয়ার মনোনয়ন শেষ পর্যন্ত বাতিল করে নির্বাচন কমিশন। এর পরও খালেদা জিয়ার মুক্তির আশা বিএনপি ও দলটির জোটশরিক কিংবা শুভানুধ্যায়ীদের মনে ছিল। নির্বাচনের সপ্তাহ দুয়েক আগেও বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল এবং ঐক্যফ্রন্ট নেতা ডা. জাফরুল্লাহ জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সভায় বলেন- 'খালেদা জিয়া ২ জানুয়ারি মুক্তি পাবেন' (সমকাল, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৮)। তারও সপ্তাহখানেক পর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টভুক্ত কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী বীরোত্তম এক জনসভায় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন- 'নতুন বছরের প্রথম দিন খালেদা জিয়াকে মুক্ত করব' (যুগান্তর, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৮)।

খালেদা জিয়া জামিন বা মুক্তি পাননি। আজ আরেক ৮ ফেব্রুয়ারি। তার কারাবাসের এক বছর পূর্ণ হচ্ছে। নতুন প্রকাশিত একটি দৈনিক তাদের বৃহস্পতিবারের শীর্ষ খবরে বলছে- 'শিগগিরই তার মুক্তি নিয়ে তেমন কোনো আশা দেখছেন না আইনজীবীরা' (দেশ রূপান্তর, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯)। তারা 'মাত্র দুই দিনের' কারাবাসের পর জামিন বা মুক্তির যে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন, নিভে যেতে ৩৬৫ দিন লেগে গেল, এই যা! আর বিএনপি নেতারা কতটা আশা-নিরাশায়, দলটির নেতাকর্মী ও সমর্থকরাই ভালো বলতে পারবেন। অযাচিত পর্যবেক্ষণ থেকে বলা যায়, খালেদা জিয়ার সাজা, কারাবাস, জামিন, মুক্তি- কোনো কিছুই তার দলের নেতারা সিরিয়াসলি নেননি। খালেদা জিয়া অন্তরীণ হওয়ার পর কিছু বক্তব্য তারা হয়তো সিরিয়াসলি দিয়েছিলেন। যেমন স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেছিলেন, খালেদা জিয়ার জেলে যাওয়া বিএনপির জন্য 'প্লাস পয়েন্ট'। উত্তরাঞ্চলীয় একজন সাংগঠনিক সম্পাদক বলেছিলেন, মুক্ত খালেদা জিয়ার চেয়ে জেলে বন্দি খালেদা জিয়া বেশি শক্তিশালী। এক বছর পর এসব বক্তব্য পর্যালোচনা করলে কেউ যদি প্রহসনের উপাদান খুঁজে পায়, দোষ দেওয়া যায় না।

প্রশ্ন হচ্ছে, খালেদা জিয়ার আগামী দিনগুলো কেমন যাবে। তার জন্য কারাবাস নতুন নয়, স্বীকার করতে হবে। আশির দশকে জেনারেল এইচএম এরশাদের শাসনামলে তিনি তিন তিনবার অন্তরীণ ছিলেন। কথিত ওয়ান-ইলেভেনের পর আধা-সামরিক সরকারের শাসনামলেও এক বছরের কয়েক দিন বেশি সংসদ ভবন এলাকায় সাবজেলে বন্দি ছিলেন। বস্তুত রাজনীতিকদের জীবনে কারাবাস অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাও এরশাদের শাসনামলে অন্তরীণ হয়েছেন। ওয়ান-ইলেভেন সরকার তাকেও সংসদ ভবনের একই এলাকায় সাবজেলে রেখেছিল। বরং খালেদা জিয়ার চেয়ে কিছুদিন বেশি। খোদ এইচএম এরশাদও জেল খেটেছেন। জীবিত শীর্ষ নেতাদের মধ্যে তিনি এখনও 'রেকর্ড'। ছয় বছর কারাগারে ছিলেন। কিন্তু শেখ হাসিনা কিংবা এইচএম এরশাদের, এমনকি খালেদা জিয়ার আগের কারাবাসগুলোর সঙ্গে চলতি কারাবাসের পার্থক্য বিস্তর। তিনজনই অন্তরীণ থাকলেও বাইরের রাজপথে আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা জাতীয় পার্টির 'ভাইব্রেন্ট' আন্দোলন ছিল। এরশাদ কারাগারে থেকেই দুই দফা পাঁচ পাঁচটি আসনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছিলেন। খালেদা জিয়ার বর্তমান কারাবাসের পর তার দল বিএনপি কি মুক্তির জন্য জোরালো কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পেরেছে? এক বছর পূর্তিতে দলটির এই আত্মবিশ্নেষণ জরুরি।

বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিএনপি এখন সবচেয়ে নাজুক অবস্থায়। এটা ঠিক, অনেকের আশঙ্কা অনুযায়ী খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর বিএনপিতে ভাঙন দেখা দেয়নি। দলটি বরং আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে বলে কেউ কেউ যে দাবি করেন, তারও সারবত্তা রয়েছে। কথা হচ্ছে, কাদের ঐক্য, কারা ঐক্যবদ্ধ? দলীয় প্রধানের মুক্তির দাবিতে রাজনীতিতে বা রাজপথে কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারলে এই ঐক্য দিয়ে আদতে কী হবে? প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম বিএনপি সবচেয়ে বেশি সময়ের জন্য ক্ষমতার বাইরে। চলতি মেয়াদের শেষে তা ১৭ বছরে গড়াবে। দুই দফা সামরিক শাসন হিসাব না করেই আওয়ামী লীগের 'একুশ বছর' ক্ষমতার বাইরে থাকার রাজনৈতিক বক্তব্য বিএনপি অনেক দিয়েছে। যদি আরেক মেয়াদ দলটি ক্ষমতার বাইরে থাকে, তাহলে আওয়ামী লীগের সেই 'রেকর্ড' ভেঙে ফেলার সুযোগ বিএনপির সামনে উপস্থিত। ২২ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকতে হতে পারে। এতদিন ক্ষমতার বাইরে থাকলে কোনো রাজনৈতিক দলের মধ্য বা মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা কতটা সক্রিয় থাকবেন, দেখার বিষয়।

খালেদা জিয়ার নিজের পরিস্থিতিও কি অতীতের তুলনায় যথেষ্ট ভিন্ন নয়? প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিপর্যস্ত ও ক্ষমতাচ্যুত দলকে তিনি যেভাবে মাত্র আট বছরের মাথায় ফের ক্ষমতায় এনেছিলেন, সেটাকে অনেকে ফিনিক্স পাখির ফিরে আসার সঙ্গে তুলনা করেন। কিন্তু তার পেছনে ছিল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা পরিস্থিতি। গত এক দশকে সেই পরিস্থিতি আর নেই।

চারদলীয় জোট শাসনামলে খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রিত্বকালে জঙ্গিবাদের বাড়বাড়ন্ত, আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা, বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা বাড়িয়ে সর্বসম্মত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্বাভাবিকতা বিনষ্ট এবং সর্বশেষ 'ইয়াজউদ্দিনকাণ্ড' সত্ত্বেও খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি উজ্জ্বলই ছিল। মনে আছে, অগ্রজ সাংবাদিক হাসান মামুন এই ভাবমূর্তিকে আখ্যা দিতেন 'টেফলন' হিসেবে। ময়লা আটকায় না। এখন সেখানে অনেক ময়লা জমেছে। বয়সের দায়ও কি অস্বীকার করা যায়?

চ্যানেল আই অনলাইন খালেদা জিয়ার কারাবাসের বর্ষপূর্তি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর কাছে প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হয়েছে। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন যে, খালেদা জিয়া যে কারাগারে, তা তিনি ভুলেই গেছেন! সঙ্গে যোগ করেছেন, দেশের মানুষ এখন নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। বিলিয়ন ডলার প্রশ্ন, বিএনপিও কি মনে রেখেছে যে তাদের নেত্রী কারাগারে?

এই লেখা যখন লিখছি, তখন তেজগাঁও এলাকায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। অফিসের ঝুল বারান্দায় দাঁড়ালে দিনের সূর্য অস্ত যাওয়ার সমস্ত আয়োজন প্রকৃতিতে স্পষ্ট। কিন্তু পাশের ট্রাকস্ট্যান্ডে খুটখাট শব্দের বিরাম নেই। বিশাল সৌরজগতের কেন্দ্রবিন্দুর অস্ত যাওয়ায় তাদের কী আসে যায়? তারা জানে, আকাশ খালি থাকবে না। আগামীকাল সকালে ঘটবে নতুন সূর্যোদয়। এটাই নিয়ম, যেমন প্রকৃতিতে, তেমনই রাজনীতিতে।

লেখক ও গবেষক
skrokon@gmail.com


মন্তব্য যোগ করুণ

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ