আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

রাজনীতি

প্রকাশ : ০৪ জানুয়ারি ২০১৯

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

  ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

অতীত ও ভবিষ্যতের আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে ত্রয়োদশ শতকের ডেনিশ দার্শনিক সোরেন কিয়ের্কেগার্ড বলেছিলেন,Life can only be understood backwards; but it must be lived forwards. অর্থাৎ পেছনে গেলে জীবনকে বোঝা যায়; কিন্তু আমাদের বাস করতে হয় সামনে। তাই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৮-এর বিশ্নেষণ করতে গিয়ে আমরা যতটা অতীত নিয়ে পড়ে আছি, ভবিষ্যৎ নিয়ে ততটা বিচলিত নই। এটা সত্য, অতীত চর্চা জরুরি বর্তমানকে যথাযথ উপলব্ধির জন্য আর বর্তমানের ক্রিটিক্যাল বিশ্নেষণ আবশ্যক ভবিষ্যতের কর্মপন্থা নির্ধারণের জন্য। কেননা, বর্তমানের যথাযথ উপলব্ধির ওপর ভবিষ্যৎ সাফল্য অনেকটা নির্ভর করে। সুতরাং নির্বাচনের ফলাফলকে 'কার্য' ধরে এ ফলাফলের 'কারণ' উপলব্ধির চেষ্টা স্বাস্থ্যকর; যদিও এ 'কারণ উপলব্ধির চেষ্টা' অনেক ক্ষেত্রেই দ্বিদলীয় রাজেনৈতিক চিন্তা-কাঠামোর দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে হয় বলে, বস্তুনিষ্ঠ  কোনো ফলাফলে আমরা পৌঁছাতে পারি না। জাতিগতভাবে এটা আমাদের দুর্ভাগ্য। এ লেখায় আমি নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী, সেদিকে খানিকটা নজর দেওয়ার চেষ্টা করছি।

আওয়ামী লীগের প্রধান চ্যালেঞ্জ :এক. আওয়ামী লীগের এখন একটা প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, দেশব্যাপী আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করা এবং এর অঙ্গ সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের 'বেপরোয়া' হওয়া থেকে রক্ষা করা। গত ১০ বছরে আওয়ামী লীগের শাসনামলের নানা সমালোচনা থাকলেও সমালোচকরাও এ কথা স্বীকার করেন যে, এ সময় বেশ কিছু দৃশ্যমান উন্নয়ন দেশে হয়েছে। অনেকে মনে করেন, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা সবসময় তাদের দলের ও নেত্রীর কৃতিত্বের প্রতি যথাযথ সম্মান করেননি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংগঠনগুলোকে একটা শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে, যাতে তাদের কাজকর্মের ভেতর দিয়ে দলীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ না হয়। অনেকে বলেছেন, আওয়ামী লীগের এ বিজয় এর নেতাকর্মীদের আরও বেপরোয়া করে তুলবে। তাই আওয়ামী লীগই এখন আওয়ামী লীগের বড় চ্যালেঞ্জ।

দুই. আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধুকন্যা

শেখ হাসিনা নির্বাচনী প্রচারে ও নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতে অঙ্গীকার করেছেন, যদি তিনি পুনরায় নির্বাচিত হন, তাহলে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করবেন এবং বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প যথাসময়ে সমাপ্ত করবেন। তিনি

পুনরায় নির্বাচিত হয়েছেন এবং আওয়ামী লীগ একটা অভাবনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পুনরায় সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় আছে। এখন আওয়ামী লীগের বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, 'দেওয়া কথা' যথাযথভাবে রক্ষা করা এবং ম্যানিফেস্টোর নামে জনগণের সঙ্গে করা 'সামাজিক চুক্তি'র বরখেলাপ না করা।

তিন. অপ্রিয় হলেও সত্য, এ নির্বাচন নিয়ে দেশ-বিদেশে নানা ধরনের প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে ও হচ্ছে। বিশেষ করে ভোটের পরিসংখ্যান কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানুষের বিশ্বাসের সীমানাকে অতিক্রম করেছে। ফলে আওয়ামী লীগের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, নিজের কাজ, আচরণ ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে মানুষের মনে আস্থা এবং বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। পাশাপাশি বিরোধী দলের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা, নানা আইন-কানুন দিয়ে মানুষের মুক্তচিন্তা এবং স্বাধীন মতপ্রকাশের সুযোগগুলোকে সংকুচিত না করে আরও সম্প্রসারিত করা, যা প্রকারান্তরে গণতন্ত্রের বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। সবচেয়ে কথা হচ্ছে, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশে সব অন্ধকার দূর করতে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া। কেননা,  Democracy dies in darkness অর্থাৎ অন্ধকার গণতন্ত্রের মৃত্যু ঘটায়।

বিএনপির প্রধান চ্যালেঞ্জ :এক. নির্বাচন নিয়ে বিএনপির নানা অভিযোগ থাকলেও এ কথা অনেকেই স্বীকার করবেন, ২০০৮ সালের পর থেকে বিএনপি ক্রমান্বয়ে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে আর সঙ্গে ছিল নানামুখী রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন। ২০০৮ সালে একটা বড় ধরনের পরাজয় সত্ত্বেও বিএনপি নিজের ঘর যথাযথভাবে গোছাতে পারেনি। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে নানা ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক কর্মসূচি সাধারণ মানুষের মনে বিএনপির প্রতি সহানুভূতির পরিবর্তে ভীতি সঞ্চার করেছিল। ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন ছিল বিএনপির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভুল। কিন্তু এরপরও বিএনপি বাংলাদেশের একটি প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে, নিজেদের যথাযথভাবে জনপ্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন হিসেবে, আওয়ামী লীগের একটি যোগ্য বিকল্প হিসেবে দাঁড় করাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ঐক্যফ্রন্ট গঠন করা ছিল সে ব্যর্থতাকে ঢাকার একটা রাজনৈতিক কৌশল। কিন্তু যাদের নিয়ে বিএনপি নিজেদের রাজনৈতিক ব্যর্থতা খানিকটা লাঘব করার স্বপ্ন দেখেছিল, তারা নিজেরাই যে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকার জন্য বিএনপিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে, এটা বোঝার জন্য রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। অনেকে সারাজীবন ধানের শীষের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে এসে ধানের শীষকে ব্যবহার করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার চেষ্টা করেছে, যা বিভিন্ন জায়গায় স্থানীয় বিএনপির অনেক নেতাকর্মী ভালোমতো গ্রহণ করেনি; যা নির্বাচনী ফলাফলে খানিকটা প্রতিফলিত হয়েছে। তাছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়েও বিএনপির মধ্যে নানা মতভিন্নতা ও মতদ্বৈধতা বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতাকেই প্রকারান্তরে প্রতিভাত করেছে। ফলে বিএনপির প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, আগে নিজের সংগঠনকে মেরামত করা।

দুই. বিএনপির আরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা। অন্যের পায়ের ওপর ভর করে দাঁড়ানোর চেষ্টা এক ধরনের অক্ষমতার সাক্ষ্য বহন করে। কোনো কোনো সময় জামায়তের ওপর, কোনো কোনো সময় মিলিটারির ওপর আবার কোনো কোনো সময় নানা খুচরা-ভাঙা নাম-সর্বস্ব, ব্যক্তি-সর্বস্ব এবং সাইনবোর্ড-সর্বস্ব দলের ওপর ভর করে নানা জোট-ফোরাম-ফ্রন্ট প্রভৃতি গঠন করে। এ কথা অনস্বীকার্য যে, বিএনপি এখনও বাংলাদেশের একটি দ্বিতীয় বৃহত্তর রাজনৈতিক দল। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ফসল হিসেবে যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের কথা বাদ দিলেও বিএনপি দু'বার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিল। কিন্তু একটি গণমুখী রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি ক্রমান্বয়ে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এখন বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, একটি সত্যিকার গণমুখী রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে জনগণের স্বার্থ-সংশ্নিষ্ট বিষয়ে একটি সত্যিকার রাজনৈতিক দল হিসেবে জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা করা।

তিন. বিএনপির জন্য আরও একটা বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, তারেক রহমানের 'আছর' থেকে বিএনপিকে মুক্ত করা। এটা বিএনপির নেতৃবৃন্দের না বোঝার কথা নয় যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারেক রহমানকে আর খুব একটা 'সেল' করা যাবে না। তিনি নিজেই নিজের 'সেল ভ্যালু' এমন একটা জায়গায় এনে নামিয়েছেন যে, অন্তত 'তারেক রহমান' বড়ি দিয়ে বিএনপিকে আর ভিটামিন বা পুষ্টি জোগানো যাবে না। এখন যেহেতু খালেদা জিয়া জেলে, সেহেতু বিএনপির নেতৃবৃন্দকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে ও একটি গণতান্ত্রিক-নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন হিসেবে পুনরায় দাঁড়াতে হলে, বিএনপিকে তারেক রহমানের আছরমুক্ত করে তার হূত গৌরব পুনরুদ্ধার করতে হবে।

পরিশেষে বলব, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সুস্থ ও সুষ্ঠু বিকাশের জন্য একটি শক্তিশালী বিরোধী দল অতি জরুরি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সেটা অনুপস্থিত থাকার কারণে দেশের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিকভাবে কাজ করছে না। আওয়ামী লীগের এ অবিশ্বাস্য জয়ের কারণে সেটার প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি করে অনুভব করছে এ দেশের জনগণ। সুতরাং বিএনপির যৎকিঞ্চিৎ শক্তি-সামর্থ্য এখনও আছে, তা ব্লেম গেমে ব্যয় না করে, একটি সত্যিকার ও শক্তিশালী বিরোধী দলের যে জনআকাঙ্ক্ষা সেই জায়গাটা কীভাবে পূরণ করা যায়, সেদিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।

নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ