দায়িত্বের পরিধি বেড়ে গেল

সমকালীন প্রসঙ্গ

প্রকাশ : ০৩ জানুয়ারি ২০১৯

দায়িত্বের পরিধি বেড়ে গেল

  হাসান আজিজুল হক

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও স্বচ্ছ হোক- এই প্রত্যাশাটা দেশ-বিদেশের নানা মহলেরই ছিল। কিন্তু এই প্রত্যাশার বিপরীতে নানারকম অনিশ্চয়তাও ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পূর্বাপর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রায় প্রত্যেকটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংলাপ পর্বে সেই অনিশ্চয়তার মেঘ কেটে যায়। ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হলো প্রত্যাশিত সেই নির্বাচন। নির্বাচনোত্তর দেখা গেল, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী নিবন্ধিত ৩৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ভোটের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত টিকল নয়টি দল। গাইবান্ধার একটি আসনে একজন প্রার্থীর নির্বাচনের আগে মৃত্যুজনিত কারণে ওই আসনে ভোট গ্রহণ করা হয়নি। কয়েকটি কেন্দ্রে গোলযোগের কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি আসনের নির্বাচনের ফল ঘোষিত হয়নি। ওই কেন্দ্রগুলোতে পুনরায় নির্বাচন হবে।

পরিস্থিতি বিশ্নেষণে দেখা যায়, ২৯৮টি আসনের বেসরকারি ফলাফলে ক্ষমতাসীন জোটের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় পেয়েছে। এই নির্বাচন নিয়ে বহু রকম কথাবার্তা ইতিমধ্যে হয়েছে। নির্বাচন কমিশনমতে, ভোট পড়েছে ৮০ শতাংশ। জানা গেছে, ভোটের এই হার দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। যতদূর জানি, এর আগে ২০০৮ সালে ৮৭ শতাংশ ভোট পড়েছিল এবং সেই বছরও জয়ী হয়েছিল আওয়ামী লীগ। নির্বাচনোত্তর সংবাদ সম্মেলনে বিদেশি পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন, নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত-প্রচারিত সংবাদে ভোট নিয়ে কিছু অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের, বিশেষ করে নারী ও তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি বাড়তি নজর কেড়েছে। প্রধান বিরোধী পক্ষ বিএনপি নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টের নেতারা ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং তারা পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন। সিইসিও সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, নতুন করে নির্বাচন দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এসব নানাবিধ তর্ক-বিতর্কের মধ্যে বাস্তবতা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইইউ বাংলাদেশের পাশে থাকবে- নির্বাচনোত্তর বিবৃতি দিয়ে তারা তা জানিয়েছে। এর আগে ভারত এবং চীনও শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়েছে।

দেশের ইতিহাসে টানা তৃতীয়বারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ অর্জন করেছে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা অর্থাৎ মহাজোট। ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮- এই তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা জয়ী হয়। এর মধ্যে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। বাকি দুটি নির্বাচন হয়েছে বিশ্বের অন্যসব গণতান্ত্রিক দেশের মতো দলীয় সরকারের অধীনে। দেশে নানা রকম মানুষ আছে। যেমন- শিক্ষিত, অশিক্ষিত, সচেতন, অসচেতন, ধনী, গরিব। তাদের মতামতের প্রতিফলন ঘটেছে নির্বাচনে। নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মহলের কর্মীদের অনিয়ম-জবরদস্তির অভিযোগ থাকলেও এ বিজয়কে অস্বীকার করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, বড় জয় কিংবা অর্জন দায়িত্বের পরিধিও বাড়িয়ে দেয়। অধিকতর কর্তব্যপরায়ণ হওয়ার জোর তাগিদও দেয়।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট বিগত এক দশকে দেশে অনেক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড সম্পাদন করেছে, এই সত্য অস্বীকার করা যাবে না। বহির্বিশ্বেও দেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটকে ভোটাররা এ কারণে বিপুলভাবে জয়ী করেছেন- তাদের নেতাদের এমন দাবিও অবজ্ঞা করা যাবে না। তবে নির্বাচন চলাকালে ক্ষমতাসীন মহলের লোকজন কিছু বাড়াবাড়ি যে করেছে, এই অভিযোগও উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। এসব করার কোনো প্রয়োজন ছিল না। কারণ নানা রকম সমীকরণে ভোটের হাওয়া সঙ্গত কারণেই তাদের অনুকূলে ছিল। বাংলাদেশে এর আগে যে ১০টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে, সেই নির্বাচনগুলো হয়েছিল একেক রকমের। আসলে নির্বাচনী ব্যবস্থায় আমাদের দেশে কোনো ধারাবাহিকতা ছিল না বিধায়ই নির্বাচন বিতর্কমুক্ত করা যায়নি।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের নির্বাচিতদের দায় এবং দায়িত্ব দুটিই অতীতের চেয়ে অনেকগুণ বেড়ে গেছে। শেখ হাসিনাই পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। সরকারও হবে ঐকমত্যের, তাও অনেকটাই স্পষ্ট। শেখ হাসিনা নিঃসন্দেহে অনেক ক্ষেত্রেই দূরদর্শিতা ও সাহসিকতার বহু দৃষ্টান্ত ইতিমধ্যে দাঁড় করিয়েছেন। এবার তাকে আরও বেশি সতর্ক ও সজাগ থেকে এগোতে হবে। আমাদের প্রত্যাশা, বাংলাদেশ হবে সত্যিকার অর্থেই অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক দেশ। এ প্রত্যাশার পূর্ণতার জন্য তাকে অনেক কাজ করতে হবে। এবার নির্বাচনে যে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে এবং নির্বাচন-পরবর্তী এখন পর্যন্ত যেসব সহিংসতা ক্ষত সৃষ্টি করেছে, এর প্রতিকারে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। কোন দলের সমর্থক কিংবা কর্মী হতাহত হলেন, এটা ভাবনায় না এনে তাদের ভাবতে হবে দেশের নাগরিক হিসেবে। ১ জানুয়ারি সমকালে একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়েছে শেখ হাসিনার বক্তব্যের একটি লাইন দিয়ে। তিনি বলেছেন, 'আমি সবার প্রধানমন্ত্রী'। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, তার এই বক্তব্যে কোনো খাদ নেই। এ রকম মনোভাব নিয়ে যদি তিনি দৃঢ়চিত্তে দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠ থাকেন, তাহলে অকল্যাণের পথ রুদ্ধ হতে বাধ্য।

আওয়ামী লীগ তথা মহাজোটের বিজয়ীদের সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক। দুর্নীতি নির্মূলে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। যে বা যারাই দুর্নীতি করুক তাদের কঠোর আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে। অনস্বীকার্য যে, দুর্নীতি আমাদের অনেক অর্জনের বিসর্জন ঘটিয়েছে। ইতিপূর্বে বিশ্বের দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে আমাদের অবস্থান গিয়ে ঠেকেছিল শীর্ষে। সেই অবস্থা থেকে আমাদের উত্তরণ ঘটেছে বটে; কিন্তু দুর্নীতি নির্মূল হয়ে গেছে- এ কথা বলার অবকাশ নেই। তাই এ ব্যাপারে চাই সরকারের কঠোর, নির্মোহ অবস্থান। সমাজে নানারকম বিভাজন-বৈষম্য আছে। সুশাসনের ঘাটতি আছে। ন্যায়বিচারের পথটা এখনও মসৃণ করা সম্ভব হয়নি।

দেশের সব নাগরিক সরকারের দৃষ্টিতে যেন সমান থাকে, এও প্রত্যাশা। নির্বাচনের আগে অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ইশতেহার প্রকাশ করে থাকে। ইশতেহারের ওপর অনেকেই আস্থা রাখতে পারেন না। কারণ এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা প্রীতিকর নয়। তবে আওয়ামী লীগ এবার যে ইশতেহার দিয়েছে এর যদি বাস্তবায়ন হয়, তাহলে সামগ্রিক চিত্র পাল্টে যাওয়ার কথা। গত দু'বারের নির্বাচনে তারা যে ইশতেহার প্রকাশ করেছিল এর কিছু দফা বাস্তবায়নে তারা সফলতার স্বাক্ষর রেখেছে, এ সত্যও অস্বীকার করা যাবে না। তাই প্রত্যাশা করব, এ ব্যাপারে এবার তাদের মনোযোগ আরও গভীর হবে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র বিস্তৃত করার পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রে আরও দূরদৃষ্টি দরকার। সাম্প্রদায়িকতার ছায়া বিস্তৃত হতে পারে, এমন যা আছে সেসবই বর্জন করতে হবে।

আরও একটা কথা তাদের মনে রাখতে হবে। মানুষের আস্থার প্রতিদান দিতে হবে। তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা। তাদের গত মেয়াদে সুশাসন নিয়ে কিছু প্রশ্ন উঠেছিল। এই মেয়াদে তারা সেই বিষয়টা আমলে নিয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় হতে হবে। শক্তিশালী বিরোধী দল গণতন্ত্রের জন্য খুবই দরকার। যেহেতু এবার কোনো শক্তিশালী বিরোধী দল নেই, সেহেতু ভুলত্রুটির ব্যাপারে তাদের নিজেদেরই সজাগ থাকতে হবে। অর্থাৎ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুব্যবস্থাপনার বিষয়টি বিশেষভাবে আমলে রাখতে হবে। জবাবদিহি-দায়বদ্ধতার পাট আরও পুষ্ট করতে হবে। রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনেও তাদের বিশেষভাবে দৃষ্টি দিতে হবে। গণতন্ত্রে সমঝোতা, পরমতসহিষ্ণুতা ইত্যাদি অত্যন্ত জরুরি। আবারও বলতে হচ্ছে, নতুন যে সরকার গঠিত হবে তাদের সামনে বড় দায়িত্বের চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে বড় জয়। এই চ্যালেঞ্জে তারা জয়ী হতে না পারলে জনআস্থা হারাবে। মন্ত্রিসভা গঠনে খেয়াল রাখতে হবে, যেন বিতর্কিত কেউ স্থান না পান। দুর্নীতি নির্মূলের ব্যাপারে গণমাধ্যমের সহায়তার বিষয়টি আমলে নেওয়া যেতে পারে। আমাদের রাজনীতিতে সহিষ্ণুতার বড় অভাব। সরকার গণতন্ত্রমনা, প্রগতিশীল সবাইকে নিয়ে একটা বিকশিত গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ূক, যেখানে ক্ষমতা নয়- মেধা, দক্ষতা, যোগ্যতার কদর হবে কিংবা বাড়বে। কেন মহাজোট এত বিপুল জয় পেল, কেন বিএনপি নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট ভোটের লড়াইয়ে প্রায় অস্তিত্বহীন হয়ে গেল- এর রাজনৈতিক সমীকরণ তারা নিজেরাই করুক।

আগামী জাতীয় সংসদ শক্তিশালী বিরোধী পক্ষহীন হবে, এটা বলা যায়। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার যে বহুবিধ শঙ্কা থাকে, এ ব্যাপারে শেখ হাসিনাকে সর্বদা সজাগ থাকতে হবে। তবে আশার কথা হলো, তিনি ন্যায়নীতির প্রতি এ যাবৎ অনুগত থাকার দৃষ্টান্তই স্থাপন করেছেন। দূরদর্শী ও সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণে পিছপা হননি। বাংলাদেশের সমাজ কাঠামোতে অনেক দুর্বলতা রয়ে গেছে এবং এগুলো অচিহ্নিত নয়। নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের নেতাদের আরও উদার হওয়ার প্রয়োজনীতার বিষয়টি সঙ্গতই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। স্বাধীনতা অর্জনের পর ইতিমধ্যে আমরা সাড়ে চার দশকেরও বেশি সময় পার করে এসেছি। আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে এখনও আমরা পৌঁছতে পারিনি। এ জন্য করণীয় রয়ে গেছে আরও অনেক কিছু।

নতুন সরকার জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় থাকবে সংকল্পবদ্ধ, এ প্রত্যাশাও রইল। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষিসহ গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোয় গুণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি সাম্যবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে হবে। আমরা চাই বৈষম্যহীন সমাজ। কোনো ধরনের অপসংস্কৃতির ছায়ার যেন আর বিস্তার না ঘটে। এ কারণেও কিন্তু সমাজে ইতিমধ্যে বিরূপ প্রভাব কম পড়েনি। আমাদের সম্ভাবনাময় তরুণ-যুব সমাজকে নিয়ে পরিকল্পিত পরিকল্পনার ভিত্তিতে দূরদর্শী উদ্যোগ নিতে হবে। এই জনগোষ্ঠীই দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার। সাম্য-ন্যায়বিচার-মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল। আমরা যেন সেই অঙ্গীকার ভুলে না যাই। ঋণখেলাপি, ব্যাংক খাতে অনিয়ম-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীসহ অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত- এমন অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে রয়েছে সে ক্ষেত্রে যথাযথ প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেও নিতে হবে কঠোর অবস্থান। সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ, এটা মনে রাখতে হবে।

কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ


মন্তব্য যোগ করুণ

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ