নারীকে দমিয়ে রাখা যাবে না

সমকালীন প্রসঙ্গ

প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০১৯

নারীকে দমিয়ে রাখা যাবে না

  রাশেদা কে চৌধুরী

বাংলাদেশে ২০১৮ সালে ২০ লাখের বেশি ছাত্রছাত্রী মাধ্যমিক বা এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। ছাত্রছাত্রীর অনুপাত ছিল প্রায় সমান। গত বছরেই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে প্রায় ১৩ লাখ শিক্ষার্থী। এদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয় ৮ লাখ ৫৮ হাজারের বেশি। ছাত্র প্রায় চার লাখ ৩৫ হাজার এবং ছাত্রী প্রায় চার লাখ ২৪ হাজার। বাংলাদেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে ৪০ লাখের বেশি ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে পড়ছে এক কোটি ৭২ লাখের বেশি শিক্ষার্থী। পরিসংখ্যান বলছে, প্রাথমিক পর্যায়ে ছাত্রের তুলনায় ছাত্রী কিছুটা বেশি। কেউ যদি বলেন, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কিংবা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব মেয়ে পড়ছে, তাদের কালবিলম্ব না করে ঘরে ফিরিয়ে নিতে  হবে? কারণ তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হলে বেপর্দা হয়ে যাবে, পুরুষকে মানবে না এবং তাদের নিয়ে পুরুষরা কাড়াকাড়ি করবে? এসব কি মেনে নেওয়া যায়?

অথচ শুক্রবার এক ধর্মীয় নেতার মুখে এমন সব কথা শুনতে হয়েছে, যা আমাদের ক্ষুব্ধ করে, বেদনাহত করে। আমাদের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করার বিষয়ে প্রবল শঙ্কা জেগে ওঠে। শনিবার সমকালের একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল- 'এ কী কথা বললেন আহমদ শফী'। আরেকটি পত্রিকা শিরোনাম দিয়েছে- 'মেয়েদের স্কুল-কলেজে পাঠাতে না করলেন আহমদ শফী'। এসব প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ আহমদ শফী বলেছেন- মেয়েদের স্কুল-কলেজে পড়তে দেবেন না। সর্বোচ্চ ক্লাস ফোর-ফাইভ পর্যন্ত পড়াবেন। বেশি পড়ালে আপনার মেয়েকে টানাটানি করে অন্য পুরুষরা নিয়ে যাবে। নারী আন্দোলনের একজন কর্মী হিসেবে, মানবাধিকার রক্ষায় আন্তরিকভাবে কাজ করে যাওয়া একজন মানুষ হিসেবে আমি বলতে চাই, এ বক্তব্য একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত। বাংলাদেশে নারীনেতৃত্ব স্বীকৃত। প্রায় তিন দশক ধরে দেশ পরিচালনার নেতৃত্বে রয়েছেন নারী। এর প্রায় পুরো সময়েই সংসদে বিরোধী দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন নারী। জাতীয় সংসদে স্পিকার পদে রয়েছেন নারী। সমাজের সর্বত্র নারীর দৃপ্ত পদচারণা আমরা দেখি এবং তা সবাইকে মুগ্ধ করে। তাহলে কেন আমাদের পেছনের দিকে ঠেলে দেওয়ার অপচেষ্টা? ৩০ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই দেশে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা পাঁচ কোটি ছাড়িয়েছে। আমি আশা করব, ধর্মের নাম দিয়ে যারা নারীকে ফের গৃহকোণে ঠেলে দিতে চায়, অন্ধকার যুগ ফিরিয়ে আনতে চায়; তাদের বিষয়ে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা সোচ্চার হবেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বদা নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলেন। ২০০৯ সালে মন্ত্রিসভা গঠনের সময় তিনিই পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীদের দায়িত্ব দিয়েছেন। এবারও শিক্ষা মন্ত্রণালয় তুলে দিয়েছেন একজন নারীর হাতে, যিনি নিজেও উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গণ্ডি অতিক্রম করেছেন কৃতিত্বের সঙ্গে। এমন প্রেক্ষাপটে নারী শিক্ষাকে এভাবে অবজ্ঞা করা এবং তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে দূরে রাখার কথা কীভাবে বলা হতে পারে? বাংলাদেশের গৌরবময় স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় আমরা দেখেছি, ধর্মের নামে একটি মহল এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। তারা শুধু পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পক্ষ নেয়নি; নিজেরাও হত্যা-ধর্ষণ-লুটে শরিক হয়ে যায়। মানবতাবিরোধী অপরাধের যখন বিচার হয়, তখনও আমরা দেখি ধর্মের অপব্যবহার। কাউকে মুরতাদ বলা হচ্ছে, কাউকে নাস্তিক বলা হচ্ছে। এসব গ্রহণযোগ্য ছিল না, এখনও হতে পারে না।

আওয়ামী লীগ সরকার বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। তাদের ইশতেহারে নারীর ক্ষমতায়ন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত হয়েছে। এর অপরিহার্য বিষয় হচ্ছে নারী শিক্ষা। বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন যেভাবে হচ্ছে, তার স্বীকৃতি রয়েছে জাতিসংঘের অনেক প্রতিবেদনে। অনেকে মানছেন বাংলাদেশকে মডেল হিসেবে। আমরা শুধু শিক্ষার প্রতি নজর দিইনি, সন্তান প্রসবের সময় মাতৃমৃত্যুর হারও অনেক কমিয়ে আনতে পেরেছি। অনেক স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ বাংলাদেশকে অনুসরণের কথা বলছে। তথ্যপ্রযুক্তিকে নারী-পুরুষ সবাই হাতিয়ার করছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ সবার কল্যাণের জন্য। এমন একটি দেশে কীভাবে নারী শিক্ষার পথ রুদ্ধ করতে প্রকাশ্য সমাবেশে ওয়াদা করানো হয়! এর প্রতিবাদ হতেই হবে।

আহমদ শফী কয়েকটি বিষয়ে কথা বলেছেন। এক. মেয়েদের পড়ানো যাবে না; দুই. যদি পড়ানো হয় তাহলে অন্য পুরুষ টানাটানি করে নিয়ে যাবে। আমার প্রশ্ন, নারী কি পণ্য? তারা কি ঘটিবাটি? অন্য পুরুষ টানাটানি করে নিয়ে যাবে- এমন কল্পিত শঙ্কা থেকে তাদের কি ঘরে বন্দি করে রাখতে হবে? এসব ধর্মের অপব্যাখ্যা ছাড়া কিছুই নয়। আমরা হজরত মুহাম্মদের (সা.) অমর বাণী কতবারই না শুনেছি! পড়াশোনার জন্য প্রয়োজনে চীন দেশে যাওয়ার জন্য তিনি উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি কখনও বলেননি যে, শুধু পুরুষের জন্য এ সুবিধা নির্দিষ্ট। আমরা তো এটাও জানি, তিনি এমনকি তার স্ত্রীকেও রণাঙ্গনে যুদ্ধ করার অনুমতি দিয়েছেন।

এখন স্বভাবতই প্রশ্ন উঠবে- আহমদ শফী কি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও ঘরে ফিরে যেতে বলছেন? তার ফতোয়া-নির্দেশনা অনুযায়ী তো সব নারী সংসদ সদস্যকেও ঘরে ফিরে যেতে হবে। থাকতে হবে চার দেয়ালের ভেতরে। এটা কি মেনে নেওয়া হবে? তিনি কি এখন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যে অন্তত দুই কোটি ছাত্রী পড়ছে, তাদের শিক্ষার পাট চুকিয়ে রান্নাঘরের চুলায় লাকড়ি ধরিয়ে দিতে চান? খেলাধুলার ক্ষেত্রে যেসব নারী সাফল্য ছিনিয়ে এনে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরছে, তাদের ঘরে ফিরে যেতে বলবেন? আমাদের যেসব কিশোরী-তরুণী সাম্প্রতিক সময়ে ফুটবল ও ক্রিকেটে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য পেয়েছে, তাদের বলবেন আর মাঠে না নামতে? তিনি কি পুলিশ-বিজিবি-সশস্ত্র বাহিনীতে যেসব নারী রয়েছেন, প্রশাসনের উচ্চ পদে যেসব নারী সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন, যারা ডিসি-এসপি পদে কাজ করছেন; তাদের ঘরে ফিরে যেতে বলছেন? বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতি নিয়ে এখন দেশ-বিদেশে সংশয় কম লোকই প্রকাশ করে। এর পেছনে নারীর অবদান সর্বমহলে স্বীকৃত। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান খাত দশকের পর দশক ধরেই পোশাক শিল্প। এ খাতের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ কর্মীই নারী। ধর্মের দোহাই দিয়ে, পুরুষে টানাটানি করে নিয়ে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে তাদের কি কারখানায় যাওয়া বন্ধের হুকুম জারি হবে? তারা কি চাইছেন, এ শিল্প মুখ থুবড়ে পড়ূক? বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা থেমে যাক? ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কেউ অনেক কিছুই বলতে পারেন। কিন্তু বিভ্রান্তি সৃষ্টির অধিকার কারও নেই। এ অপচেষ্টা কেউ করলে রাষ্ট্রের উচিত হবে তার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা। আমাদের সমাজ এখন অনেক সচেতন। নারী তার অধিকার বজায় রাখতে দৃঢ়পণ। তাকে রোখা যাবে না।

নারীর অগ্রযাত্রা যারা রুখতে চায়, তাদের দুর্বল ভাবা ঠিক হবে না। তারা নানা কৌশলে অগ্রসর হয়। পরিবার ও সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়। পরলোকের ভয় দেখিয়ে অন্ধকারের রাজত্ব কায়েম করতে চায়। এদের বিরুদ্ধে অবশ্যই সংগঠিত প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য সমাজের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষভাবে আমি আহ্বান জানাব শিক্ষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত সবাইকে। এ জন্য ব্যক্তিগত উদ্যোগ চাই; সম্মিলিত উদ্যোগ চাই; অসাম্প্রদায়িক শক্তির নব উত্থান চাই। আমাদের অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে উন্নত-গর্বিত বাংলাদেশ গঠনের জন্য। নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রয়াসেই এটা সম্ভব। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নারীর অগ্রযাত্রায় সবসময় উৎসাহ দিয়েছেন। গত তিন দশকে যেসব সরকার বাংলাদেশে এসেছে, তারা নারী শিক্ষার প্রসারে সক্রিয় অবদান রেখেছে। শেখ হাসিনার সরকার নারীর শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের প্রতি বিশেষভাবে মনোযোগী। এ সরকারের নারী নীতির কিছু বিষয় নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও সার্বিকভাবে তা উদার ও আধুনিক। নারীর উন্নয়নের সহায়ক। তাহলে কে আমাদের রুখবে?

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা


মন্তব্য যোগ করুণ

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ