উন্নয়নে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

রূপপুর

প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০১৯

উন্নয়নে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

  রুশো তাহের

বিজ্ঞানাচার্য স্যার জগদীশচন্দ্র বসু কৃতী এক বাঙালি। তিনি এই অঞ্চলে আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার পুরোহিত। এই মনীষী গ্যালিলিও গ্যালিলি ও স্যার আইজ্যাক নিউটনের সমকক্ষ বিজ্ঞানী। নভেম্বর মাসে এই বিজ্ঞানীর জন্ম ও প্রয়াণ। জগদীশচন্দ্রের বিজ্ঞানচর্চার অভিনবত্ব হলো, তিনি একাধারে তাত্ত্বিক বিজ্ঞানী আবার এই তত্ত্ব প্রমাণে পরীক্ষণ সম্পন্ন করেছেন এবং পরীক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি প্রস্তুত করেছেন। এই প্রস্তুতযজ্ঞে কাজে লাগিয়েছেন দেশীয় দক্ষ-অর্ধদক্ষ কারিগরদের। উত্তর প্রজন্মের বিজ্ঞানচর্চার আয়োজনে প্রতিষ্ঠা করেছেন বসু বিজ্ঞান মন্দির। তাই তো এই মাটি থেকে পরবর্তী সময়ে সত্যেন বোস ও মেঘনাদ সাহার মতো খ্যাতিমান বিজ্ঞানী আমরা পেয়েছি। মোদ্দাকথা, বিজ্ঞানে আমাদের শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। কিন্তু এ রকম চমৎকার ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও আমাদের উন্নয়নে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যথাযথভাবে গৃহীত হয়নি। দৃষ্টিভঙ্গিতেও বিজ্ঞানমনস্কতার প্রতিফলন ততটা হয়নি। এমনটি কেন হলো? আমরা যদি স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় দেখি, সেখানে মাত্র সাড়ে তিন বছর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশ পরিচালনা করেছেন। তার নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর সত্যিই দেশ পরিচালনায় কোনো যোগ্য নেতৃত্ব আসেনি। বরং দীর্ঘ সময় উন্নয়নে অন্ধ অনুসরণ ও পশ্চাৎমুখিতাই পরীলক্ষিত হয়।

২১ বছর পর বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যার নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ২০০১ সালে আবার ছন্দপতন। উন্নয়নের গতি থমকে যায়। এভাবে কেটে যায় আরও সাত বছর। আবার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসীন হয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার। জাতি উন্নয়নে নতুন দিশা খুঁজে পায়। বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বাধীন সরকারের সবচেয়ে স্বপ্নদর্শী উদ্যোগ হলো, উন্নয়নে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার। এর অন্যতম দৃষ্টান্ত, পারমাণবিক উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন। এ উদ্যোগটি অর্ধশতাব্দী ধরে ঝুলে ছিল। অথচ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অধিকারী দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য বাঙালি জাতি অপেক্ষার প্রহর গুনছিল, যা পরিণতি পায় বঙ্গবন্ধুকন্যার স্বপ্নদর্শী নেতৃত্বে। উল্লেখ্য, দুই রিঅ্যাক্টরবিশিষ্ট রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন এবং সেখান থেকে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় রিঅ্যাক্টর থেকে এক হাজার ২০০ করে মোট দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো রুটিন ও সাধারণ ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না বাঙালির এই স্বপ্নের বাস্তবায়ন। বরং এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে পারমাণবিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল কাজে লাগানোর বৃহৎ আকারে অভিষেক ঘটতে যাচ্ছে। বস্তুত পারমাণবিক বিজ্ঞানকে আমাদের উন্নয়নে প্রয়োগ করতে প্রয়োজন উচ্চতর বুদ্ধিগত ক্ষমতা এবং একই সঙ্গে এটা চ্যালেঞ্জও বটে। কারণ এতে সামান্য বিচ্যুতি সমূহ বিপদ ডেকে আনতে পারে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকন্যার সাহসী ও দূরদর্শী নেতৃত্ব বাঙালি জাতিকে সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ ও মুনশিয়ানায় সম্পাদনের সাহস জুগিয়েছে আর সৃষ্টি করেছে আস্থা।

আমরা দ্বিধাহীন যে, আমাদের প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীরা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দক্ষতর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে রুশ ফেডারেশনের সহযোগীদের সঙ্গে আশাতীত সাফল্য দেখাতে সক্ষম হবে। আশা করা যায়, আমাদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শুধু নিউক্লিয়ার প্রকৌশল নয়, একই সঙ্গে নিউক্লিয়ার ফিজিক্স ও রিঅ্যাক্টর ফিজিক্স অধ্যয়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে। এর ফলে দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় দক্ষ জনবলের ঘাটতি দূর হবে। আবার এই জনবলকে ধরে রাখার জন্য আরও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রয়োজন হবে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কাজও দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এএফএম মিজানুর রহমানকে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগও দেওয়া হয়েছে। বস্তুত দেশের পরমাণু যাত্রায় আরও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের কাজটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্পন্ন করা সময়ের দাবি। প্রশ্ন আসতে পারে, কেন পরমাণু বিদ্যুৎ? মিশ্র জ্বালানি উৎস নীতি অনুযায়ী, দেশের উৎপাদিত মোট বিদ্যুতের উল্লেখযোগ্য অংশ পারমাণবিক উৎস থেকে উৎপাদন হবে বাস্তবসম্মত। কারণ নিরবচ্ছিন্ন ও সস্তায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারমাণবিক বিদ্যুৎই একমাত্র ভরসা। আর উন্নয়ন ত্বরান্বিত ও টেকসই করতে বিদ্যুতের কোনো বিকল্প নেই।

উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা তাদের তত্ত্বে একসময় বলতেন- যার যত বেশি ভূমি আছে, তার বা সেই দেশের উন্নয়ন সম্ভাবনা তত বেশি। সময়ের পরিক্রমায় এ ধারণা বদলে গিয়ে ভূমির পরিবর্তে ভূ-অভ্যন্তরের খনিজসম্পদ উন্নয়নের নিয়ামক হয়ে যায়। এরপর আসে মেধার যুগ। মানে ভূমি বা ভূমির নিচে সঞ্চিত সম্পদ নয়, বরং উন্নয়নের নিয়ামক হয়ে যায় মানুষের বুদ্ধিমত্তা। অর্থাৎ এ সময় যে দেশের যত বেশি আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষ মানবসম্পদ রয়েছে, ওই দেশের উন্নয়ন সম্ভাবনা তত বেশি। আর উন্নয়ন সম্ভাবনাকে অনিবার্য করতে প্রয়োজন স্বপ্নদর্শী রাজনৈতিক নেতৃত্ব। বাঙালির সৌভাগ্য যে, এই নেতৃত্বই ধারাবাহিকভাবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উঠে এসেছে। যার হাল ধরে আছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষ জনবল তৈরি আমাদের জন্য সহজসাধ্য এই কারণে যে, আমাদের রয়েছে বিশালসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী। তাহলে বিষয়টি কী দাঁড়াল- আমাদের রয়েছে শেখ হাসিনার মতো নেতৃত্ব আর বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী, যাদের আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুললে বাংলাদেশের উন্নয়নের গতি হবে দ্রুততর। উন্নয়নের এই যাত্রায় প্রগতি ও বিজ্ঞানমনস্কতা হতে পারে অনুঘটক। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামনে মডেল হতে পারে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন ব্যবস্থাপত্র বাস্তবায়ন করে ভূমি ও খনিজসম্পদে পিছিয়ে থাকা দেশ দুটি তরতর করে উন্নয়নের শিখরে উঠে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন তথা পারমাণবিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশকে কোথায় নিয়ে গেছে, তা কি ভাবা যায়? বস্তুত জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বাংলাদেশ এক ধাপ এগিয়ে আছে। যেমনটি আগে উল্লেখ করেছি, বিজ্ঞানে আমাদের ঐতিহ্য রয়েছে। মোদ্দাকথা, এই ব-দ্বীপের অনেক গভীরে বিজ্ঞানের শিকড় প্রোথিত। তাই সবকিছুর মেলবন্ধনে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতির দিকে।

বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক


মন্তব্য

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ