নতুন সরকার ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি

সমকালীন প্রসঙ্গ

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৯

নতুন সরকার ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি

  এম হাফিজ উদ্দিন খান

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে। এবারের মন্ত্রিসভায় চমক থাকবে- এ কথাটি গত ক'দিন ধরেই গণমাধ্যমে আলোচনায় অগ্রাধিকার পেয়ে আসছিল। বাস্তবিকই মন্ত্রিসভায় আমরা শেষ পর্যন্ত বিরাট চমক দেখতে পেলাম। তবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন  নিয়ে যেসব অভিযোগ রয়েছে, তাও তুড়ি মেরে  উড়িয়ে দেওয়ার নয়।

এবারের মন্ত্রিসভায় মহাজোটের শরিকদের কাউকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এই প্রথম শরিকদের বাদ দিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরবর্তী সময় জোটের অন্যান্য দল থেকে কাউকে মন্ত্রী হিসেবে দেখা যাবে কি-না, এর উত্তর নিহিত রয়েছে ভবিষ্যতের হাতে। নতুনরা কঠোর নজরদারিত্বে থাকবেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ৮ জানুয়ারি সন্ধ্যায় গণভবনে নবনির্বাচিত মন্ত্রিসভা ও দলের কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময়ে তিনি আরও জানিয়েছেন, পুরনোরা ব্যর্থ ছিলেন না। তারা সফল হয়েছেন বলেই দেশ অনেক দূর এগিয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রস্তুত করার জন্য তিনি নতুনদের নিয়ে আসার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এ ব্যাপারে আমার ব্যক্তিগত মতামত, একই ব্যক্তির বারবার মন্ত্রী ও দলের নেতা হওয়া ঠিক নয়। মানুষ নতুন মুখ দেখতে চায়। তাই আমার মনে হয়, মানুষের চাহিদার বিষয় বিবেচনায় নিয়েই হয়তো প্রধানমন্ত্রী এই উদ্যোগ নিয়েছেন। সরকারকে অনিয়ম-দুর্নীতির ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিতেই হবে। দুর্নীতি আমাদের সমাজে অন্যতম ব্যাধি। ৭ জানুয়ারি একটি পত্রিকায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ ক'জন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নেতার বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'প্রধানমন্ত্রী চান শরিক দলগুলো বিরোধী রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখুক।' মহাজোটের অন্যতম প্রধান শরিক জাতীয় পার্টি মন্ত্রিসভা গঠনের আগেই বিরোধী দলের ভূমিকায় অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা আসে। ৮ জানুয়ারি পত্রিকায় দেখলাম, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, মন্ত্রিসভার আকার ভবিষ্যতে বড় হতে পারে। এ হলো অন্য আরেক সমীকরণ। যে সমীকরণের হিসাব এখনই মেলানো যাবে না।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই মেরুকরণের রাজনীতির নানারকম সমীকরণ চলছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ মেরুকরণ নানারকম জটিলতা সৃষ্টি করলেও শেষ পর্যন্ত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হওয়ার পথ সুগম হয়। তবে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন কেন্দ্র করে স্বচ্ছতার যে প্রত্যাশা ছিল এর ব্যাঘাত অনেক ক্ষেত্রেই ঘটেছে, এই অভিযোগও কম পুষ্ট নয়। এই কলামেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এসব বিষয়ে একাধিকবার লিখেছি। এও লিখেছিলাম, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেশ-বিদেশে নানা মহলের প্রত্যাশা বটে; কিন্তু এটাই শেষ কথা নয়। নির্বাচনটি যাতে প্রশ্নমুক্ত হয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সবাই যাতে সমান সুযোগ পান, এসব বিষয় বারবারই বিশিষ্টজনের আলোচনা-পর্যালোচনায় মুখ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল। ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায়ও এর প্রতিফলন ঘটেছিল।

অতীতের এসব বিষয় ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য কতটা কিংবা কী প্রতিফল নিয়ে আসে, এই প্রশ্নের উত্তরও নিহিত রয়েছে ভবিষ্যতের হাতেই। যেভাবেই হোক নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে গেছে, নতুন সরকারও এর মধ্যে যাত্রা শুরু করেছে। এবারের মন্ত্রিসভায় সবচেয়ে বড় চমক হলো নতুনদের আধিক্য। আওয়ামী লীগের অনেক জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্যের স্থান হয়নি মন্ত্রিসভায়। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সাংগঠনিকভাবে যাদের অবস্থান অতীতে অনেকটাই দৃঢ় লক্ষ্য করেছি এবং বিগত এক দশকে দল ও সরকারে (এর আগেও দলের রাজনীতিতে তাদের ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রেই ছিল উল্লেখযোগ্য) যাদের অবস্থান ছিল মজবুত, তাদের সিংহভাগই মন্ত্রিসভায় অনুপস্থিত। তাদের মধ্যে মন্ত্রী হিসেবে কেউ কেউ দক্ষতার পরিচয় দিলেও কারো কারোর বিরুদ্ধে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযোগও ছিল।

এই মন্ত্রিসভায় এমন অনেককে মন্ত্রী করা হয়েছে, যারা এবারই প্রথম নির্বাচন করেছেন। আবার কোনো কোনো সংসদ সদস্য রাজনীতিতেও এবারই প্রথম যুক্ত হয়েছেন। সুজনের (সুশাসনের জন্য নাগরিক) পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-সংক্রান্ত কিছু কথা উপস্থাপন করা হয়েছে। তাতে দেখা যায়, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে ২৪৪ জন কোটিপতি। এর মধ্যে ব্যবসায়ীর সংখ্যাই বেশি। নির্বাচনের পরিবেশ প্রতিযোগিতার অনুকূলে ছিল না- এ তথ্যও উপস্থাপিত হয়েছে সুজনের প্রতিবেদনে। বিগত নির্বাচনে মহাজোটের মহাবিজয় এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মহাবিপর্যয়ের নানা কারণের মধ্যে অন্যতম একটি কারণ হলো ঐক্যফ্রন্টের সাংগঠনিক দুর্বলতা ও নির্বাচনী অনিয়ম। আমরা অবশ্যই প্রত্যাশা করি যে, অনিয়মের অভিযোগগুলো তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে নির্বাচন কমিশন। জাতীয় সংসদে ব্যবসায়ীদের প্রবেশ বাড়ছে, এটি আলোচনার বিষয়। এমতাবস্থায় প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে রাজনীতি কি ক্রমেই রাজনীতিকদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে? রাজনীতিতে রাজনীতিকদের ভূমিকার বিষয়টি নানা কারণেই খুব গুরুত্বপূর্ণ। এবারের সংসদেও প্রকৃতপক্ষে শক্তিশালী কোনো বিরোধী পক্ষ নেই। কার্যকর জাতীয় সংসদ ও গণতন্ত্রের জন্য শক্তিশালী বিরোধী পক্ষের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন মহলের গভীর উপলব্ধি দরকার।

গত মন্ত্রিসভায় যারা ঠিকমতো মন্ত্রণালয় চালাতে পারেননি, তাদের কথা না হয় বাদ দিলাম; কিন্তু যারা ভালো করেছেন তারা কেন বাদ পড়লেন, এটা ঠিক বুঝতে পারছি না। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীই ভালো জানবেন, কোন মন্ত্রী গত মন্ত্রিসভায় কেমন দক্ষতা দেখিয়েছেন। তবে আমাদের কথা হলো, নতুন মুখের আধিক্যই যেহেতু মন্ত্রিসভায় প্রাধান্য পেল এবং এই মন্ত্রিসভায় দায়িত্বপ্রাপ্তরা ইতিমধ্যে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছেন, তারা যেন সুশাসন, ন্যায়বিচার, দুর্নীতি দূরীকরণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে যথাযথ ভূমিকা রাখেন। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার ঘোষণাকালে বলেছিলেন, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণ এবং উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির বিষয়গুলো মুখ্য হয়ে সামনে থাকবে। 'সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় ২১ অঙ্গীকার' শিরোনামের ওই ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথাও বলা হয়েছে। এ ব্যাপারে সরকারের অবস্থান নির্মোহ ও কঠোর হবে- এ প্রত্যাশা আমরা করি। নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে সরকার যথাযথ উদ্যোগ নেবে এবং ইশতেহার শুধুই কাগুজে দলিল হয়ে থাকবে না, এর প্রমাণ সরকারকে দিতে হবে কাজের মধ্য দিয়ে। একই সঙ্গে এও মনে রাখা দরকার, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গণতন্ত্র। গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে যতই চিৎকার করা হোক না কেন, বাস্তবে আমাদের গণতন্ত্রের ভিত এখনও দুর্বল। গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণের জন্য যেসব বিষয় অপরিহার্য, সেসবই অনেক ক্ষেত্রে থেকে যাচ্ছে উপেক্ষিত।

সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে আইনের শাসন আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আইনের শাসনের ব্যাপারে বারবার কথা উঠেছে। এ ব্যাপারে নানারকম অনাকাঙ্ক্ষিত দৃষ্টান্ত আমাদের সামনেই রয়েছে। তারপরও আমরা চাইব, নতুন সরকারের মন্ত্রীরা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও আইনের শাসন নিশ্চিতকরণে প্রজ্ঞার পরিচয় দেবেন, কার্যকর ভূমিকা রাখবেন। স্মরণ করা দরকার যে, এর আগের ইশতেহারে বলা হয়েছিল, মন্ত্রী-সাংসদদের সম্পদের বিবরণ প্রকাশ করা হবে। কাজটি কিন্তু গত মেয়াদে হয়নি। কাজেই ইশতেহারের ব্যাপারেও আস্থার সংকট রয়েছেই। এই সংকট কাটাতে হবে নতুন সরকারকে জাতীয় স্বার্থের বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে। সুশাসন নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারের সামনের দিনের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো সুশাসন নিশ্চিত করা। দেশের আর্থিক খাতে নানা অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা ইতিমধ্যে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এসব নিরসনের দায় সরকার এড়াতে পারে না। আমাদের প্রবৃদ্ধির হার বাড়ছে বটে; কিন্তু এর বিপরীতে সামাজিক বৈষম্যচিত্রও কিন্তু স্ম্ফীত হচ্ছে। সরকারের দায়িত্বশীল সবার দক্ষতা-স্বচ্ছতা-দায়বদ্ধতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টিও ভুলে গেলে চলবে না। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ নিরাপদ জীবনযাপন ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।

প্রধান বিরোধী পক্ষ ঐক্যফ্রন্ট এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে কোন অবস্থান নেয়, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তাদের নির্বাচিত সাংসদরা শপথ নেননি। ৯ জানুয়ারি পত্রিকায় দেখলাম, ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড. কামাল হোসেন জাতীয় সংলাপের কথা জানিয়েছেন। রাজনীতিতে সুস্থ ধারার প্রতিযোগিতা থাকুক; কিন্তু প্রতিহিংসা নয়। প্রতিহিংসাপরায়ণই যদি রাজনীতির লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে শুধু যে গণতন্ত্রই ক্ষতিগ্রস্ত হবে তাই নয়, জনগণের প্রত্যাশাও হোঁচট খাবে। এসব ব্যাপারে আমাদের অভিজ্ঞতা অনেক ক্ষেত্রেই প্রীতিকর নয়। গায়েবি মামলায়, রাজনৈতিক হয়রানি-নিপীড়নের নানারকম চিত্র প্রায় প্রত্যেকটি রাজনৈতিক সরকারের শাসনামলেই কমবেশি পরিলক্ষিত হয়েছে। তবে এবার এই অভিযোগ অনেক বেশি পুষ্ট। এর নিরসন অত্যন্ত জরুরি। নির্বাচনের পূর্বাপর বেশ কিছু সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সুবর্ণচরের ঘটনাটি শুভবোধসম্পন্নদের ক্ষুব্ধ করেছে। দাঁড় করিয়েছে অনেক প্রশ্নও। সভ্যতা-মানবতার এমন পরাজয় মেনে নেওয়া যায় না। অনেক ক্ষতের মধ্যে সুবর্ণচরে যে নারী দুর্বৃত্তদের ছোবলাক্রান্ত হলেন, এদের দৃষ্টান্তমূলক দণ্ড নিশ্চিত করার জন্য সবরকম আইনি প্রক্রিয়ার পথ কণ্টকমুক্ত করতে হবে। যদি এর দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকার দ্রুত নতুন সরকার নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে এর বিরূপ ছায়া বিস্তৃত হবে, যা আমাদের কোনোভাবেই কাম্য নয়।

ভবিষ্যতে রাজনীতির চিত্র কী হবে- এ নিয়ে নানা রকম কথা আছে। রাজনৈতিক সমঝোতা গড়তে সরকার পক্ষকেই উদ্যোগী হতে হবে। রাজনৈতিক স্বার্থে আইনের ব্যবহারও এ যাবৎ আমরা কম লক্ষ্য করিনি। এমনটি আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের পরিপন্থী। শুধু তাই নয়, এর বহুবিধ ক্ষতিকর প্রভাব সমাজে সৃষ্টি করতে পারে ক্ষত। এ রকম দৃষ্টান্তও আমাদের সামনে রয়েছে অনেক। বাংলাদেশে আইন প্রয়োগের সংস্কৃতি নিয়েও এ পর্যন্ত কথাবার্তা কম হয়নি। এ বিষয়গুলো আমলে নিতে হবে। অনেকের মধ্যে এই জিজ্ঞাসা রয়েছে- নতুন মন্ত্রীরা কি জনপ্রত্যাশা পূরণে তাদের দূরদর্শিতা-দক্ষতা প্রদর্শনে সক্ষম হবেন? আমি মনে করি, সর্বাগ্রে তাদের স্বচ্ছতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। একই সঙ্গে জবাবদিহি-দায়বদ্ধতার বিষয়েও সমভাবে সজাগ থাকতে হবে। তাদের সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সভাপতি, সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন


মন্তব্য যোগ করুণ

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ