মেঘনা যেন তিতাস না হয়

পরিবেশ-প্রতিবেশ

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৯

মেঘনা যেন তিতাস না হয়

  মোহাম্মদ মহসীন

নদীঘেঁষা বাড়ি ছিল বলে নদীর কথা এখনও ভুলিনি। মেঘনা নদী শান্ত প্রকৃতির। এ জন্য ভ্রমণপ্রিয় মানুষজনের নয়নাভিরাম দৃশ্যকাব্য দেখার অনুভূতিও কম নয়। ওই দলের আমিও একজন। নদীর বুকে ছিল প্রকাণ্ড এক চর। এই চরে কয়েকটি গ্রাম ছিল। ওই চরের নাম রাখা হয়েছিল দেবতার নামানুসারে কালীরচর। ওপরের ঠিকানায় আমাদের বসতবাড়ি ছিল। রাক্ষসী মেঘনার করাল স্রোতে বাড়িঘর বিলীন হয়ে যায় নদীতে। আবার কয়েক হাজার লোকের চোখেমুখে স্বপ্নের চরটি জেগে ওঠে। এতে মানুষজন আনন্দে পুলকিত হয়। তাও চরটি প্রভাবশালীর লোলুপ দৃষ্টিতে পড়ে। বৈদ্যেরবাজার থেকে কুমিল্লা জেলার চন্দনপুর যেতে দৃষ্টিতে পড়ে নদীর বুকে জেগে ওঠা এক জনপদের নাম নুনেরটেক। নদীবেষ্টিত নুনেরটেক দ্বীপের অপরূপ সৌন্দর্যে অনেকেই মুগ্ধ হয়ে নিঝুম দ্বীপ বলেও আখ্যায়িত করে। এ দ্বীপের ইতিহাস সঠিক কেউ বলতে না পারলেও ধারণা করা হয়, এটি প্রায় তিনশ' বছরের পুরনো। অনেকের ধারণা, বালুদস্যুদের লোলুপ দৃষ্টি ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ দ্বীপটি একসময় নদীতে তলিয়ে যেতে পারে। দ্বীপের চারদিকে মেঘনা নদী। এতে কোল ভরা জল দেখতে স্বচ্ছ, অপূর্ব লাগে।

এ দ্বীপের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার। পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, দ্বীপটির আয়তন ৫৪৭ দশমিক ৮৪ একর। ওই দ্বীপের অধিকাংশ পরিবারের লোকজন হতদরিদ্র, কষ্টে দিন কাটায়। পেশায় জেলে, দিনমজুর ও সাধারণ কৃষক। বলা বাহুল্য, এখানে বিদ্যুতের গ্রিড নেই। যখন দিন গিয়ে সন্ধ্যা নামে, তখন দ্বীপজুড়ে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। অন্ধকার নেমে আসতেই অধিকাংশ ঘরে কেরোসিনের কুপি, হারিকেন ও সৌরবিদ্যুতের বদৌলতে দ্বীপবাসী তাদের ঘরবাড়ি আলোকিত করে। তখন মাঝ নদী থেকে নুনেরটেক নামক দ্বীপটিকে জ্যোৎস্না রাতের তারার মতো দেখা যায়। সেই সময়ের দৃশ্য সত্যিই দারুণ। সোনারগাঁয়ে যত প্রসিদ্ধ অলি-এ কামেলের মাজার আছে, তার মধ্যে শাহ্‌ সুফি হজরত মাওলানা নূরুল ইসলাম লালপুরীর (রহ.) মাজারটিও অতি পরিচিত, যা নুনেরটেক দ্বীপকে আলোকিত করে রেখেছে। দ্বীপটিতে ভরদুপুরে নৌকা দিয়ে মেঘনা নদীর শান্ত সুনিবিড় ঢেউয়ে দোল খেতে খেতে পৌঁছানো যায়। চারদিকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবলোকন করে যে কেউ মুগ্ধ হবেন।

দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন চাহিদা মেটাতে নুনেরটেক দ্বীপবাসীকে অনেক নদীপথ পাড়ি জমিয়ে শহরকেন্দ্রিক এলাকায় আসতে হয়। এ জন্য অবশ্য তাদের সময়-সুযোগ করে চলতে হয়। অন্যথায় সব সুযোগ-সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত। কেননা, নৌকাই তাদের একমাত্র বাহন। তবে কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের কুদৃষ্টির কারণে নয়নাভিরাম এ দ্বীপটি যেন নদীতে বিলীন না হয়ে যায়, সেদিকে আমাদের দৃষ্টি রাখা উচিত। এই দ্বীপের মাঝেই লুকিয়ে আছে মেঘনার রূপবতী, একই সঙ্গে অপরূপ সৌন্দর্যের একখণ্ড লীলাভূমি; নদীর কলকল শব্দে মন মাতানো এক প্রকৃতি। এদিকে-ওদিকে নদীর পাড়ঘেঁষে লস্থি

গ্রাম ও মাছের ঘের। এই ঘেরে চোরাবালু পড়ে কোনো কোনো স্থানে নদী হারাতে বসেছে নব্য। সোনারগাঁয়ে একসময় কুশিয়ারা নদী থেকে প্রচুর মুলিবাঁশ লরি হয়ে আসত নদীপথে। বর্তমানে মুলিবাঁশ আসা বড় দুস্কর। কারণ নদীর দু'কূলে মাছের ঘেরে আবৃত। মেঘনা নদী মরে না গেলেও ব্রহ্মপুত্র, ধলেশ্বরী, শীতলক্ষ্যা নাব্য হারাতে বসেছে। পাশাপাশি খাল, বিল, ঝিলও বাদ পড়ছে না। কিছুকাল আগে নদী-নালা, খাল-বিল-ঝিলে মিঠা পানির প্রচুর সুস্বাদু দেশি প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এখন তেমন মাছ মিলছে না।

মেঘনা নদীতে শিল্পবর্জ্য, কীটনাশক, ভারী ধাতু, তেল- এসব দ্বারা টলমলে পানি দূষিত। পাশাপাশি এসব বর্জ্য নদী কিংবা জলাশয় বা স্রোতধারায় অপসারণ করা হচ্ছে দিনের পর দিন। এই নদীর বুকচিরে স্টিমার, লঞ্চ, ছোট-বড় পালতোলা নৌকা চলত। এখনও চলে; তবে আগের মতো নয়। জলদস্যুদের আক্রমণ একসময় ছিল। এখন নেই। মেঘনা নদীতে প্রচুর ইলিশ মাছ পাওয়া যায় বলে নদীটি বেশ জনপ্রিয়। এখনও টিকে আছে। একসময় হয়তো একদিন তিতাস নদীর মতো ইতিহাসে নামটি থাকবে 'মেঘনা নদী'।

প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক


মন্তব্য

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ